ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সাপ মেরে ‘লেঞ্জে বিষ’ রাখতে নেই! আজ অনেকেই রাজাকারের ফাঁসিতে ইতিহাসের দায়মুক্তি ঘটাতে পেরে সন্তুষ্ট। কিন্তু আমরা কি আবার এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির পুনরুত্থান চাই? যদি না চাই, তাহলে লেঞ্জায় যাতে বিষ না থাকে সে ব্যাপারে সচেস্ট থাকতে হবে। এর একটাই পথ জামায়াতে ইসলামী সংগঠনকে আইনানুগ নিষিদ্ধ করে এদের সমুদয় সম্পত্তি বাজেয়াফত করা। এ গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই। তাদের বড় একটি সম্পত্তি বড় মগবাজারের কার্যালয়। দুর্গ সদৃশ এই কার্যালয়টি যে আয়তনে কত বড় বাইরে থেকে তা কারো উপলব্ধি করার সুযোগ নেই।

সাংবাদিকতার শুরু থেকে এ কার্যালয়ে বহুবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সভা-সমাবেশ কভার করার জন্য। চবি’তে শিবিরের নৃশংসতার নির্মম সাক্ষ্মী হয়েও কেবল পেশাকে সম্মান করতাম বলেই পত্রিকা সম্পাদকের নির্দেশে বিএনপি’র পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর খবরাদি সংগ্রহ করতাম। বছর খানেক পর এ দায়িত্বই পালন করেছিলেন আমাদের আরেক সহকর্মী মিলান ফারাবী।

কার্যালয়ের প্রবেশ মুখে টেবিল নিয়ে একজন বসে থাকতেন। তার অনুমতি ছাড়া কোনো নেতার সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ ছিল না। কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ প্রমুখের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয় এখানেই। বলতে দ্বিধা নেই- সামনা সামনি এদের ভদ্রতায় কোনো ত্রুটি নেই। কিন্তু জামাতে ইসলামীর রজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে এরা যে কতোটা নির্মম এবং নির্দয় তা তো যুদ্ধাপরাধী বিচারের পরতে-পরতে বেড়িয়ে আসছে! পাকিস্তানের অখণ্ডতা, তথা ইসলামের নামে দেশকে বধ্য ভূমিতে পরিণত করতেও এরা দ্বিধান্বিত ছিল না! অনেকের মত ইতিহাস পাঠে আমিও জেনেছি ব্রিটিশ ভারতে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ জন্মের সময় থেকে খোদ পাকিস্তানেও এরা কতোটা জাতিগত সহিংসতায় লিপ্ত থেকেছে! পাকিস্তানে সম্ভব হয়নি, ভারতেও নয়, আজ বাংলাদেশে এদের রাজনৈতিক স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে, এটাই তো আশার দিক। আর এজন্য যে রাজনৈতিক কমিটমেন্টের প্রয়োজন, তা দেখিয়েছেন শেখ হাসিনা। একক ভাবে সব কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য।

যা বলতে চাচ্ছিলাম- এদের ভদ্রতা সম্পর্কে। এক সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামী কার্যালয়ের দোতলায় আমি গিয়েছিলাম সভা কভার করতে। সেখানে নামাজের সময় খানিক বিরতিতে সাংবাদিকদের চা পরিবেশন করা হল। মতিউর রহমান নিজামী এসে আমার পাশের চেয়ারে বসে একটি পিরিচে খুলে দিচ্ছিলেন গ্লোকজ বিস্কুটের প্যাকেট। প্যকেটটি খোলার সময় যে কয়টি বিস্কুট ভেঙ্গে যাচ্ছিল সেগুলোই নিলেন নিজের চায়ের পেয়ালার পাশে। আনাম বিস্কুটগুলো পিরিচে রেখে ঠেলে দিচ্ছিলেন আমার সামনে। আমি বিস্মিত হইনি তার এই ভদ্রতায়। কারন আমি জানতাম- এই ভদ্রতার আড়ালে ইতিহাসের কত বীভৎস কাহিনী লুকিয়ে আছে!

বাংলাবাজার পত্রিকায় ফিরে এসে সন্ধ্যায় রিপোর্ট লেখার সময় জাসদ-ছাত্রলীগের একদা সংগঠক বন্ধু জালাল আহমেদকে (এখন বাংলা একাডেমীর পরিচালক) বলেছিলাম নিজামী কাহিনী। জালাল সেদিন বলেছিলেন- ‘তুমি এ ধরনের বদান্যতা জাসদ নেতা রব-ইনুর কাছে কোনদিন পাবে না। এ কারনেই তাদের রাজনীতির এই দশা’। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুজি করে জামায়াতে ইসলামী তার রাজনৈতিক ইতিহাসে যে নৃশংসতা এবং হিংস্রতার জন্ম দিয়েছে, সৌভাগ্য বশত তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জন্মলগ্নের ইতিহাসে অঙ্গীভূত। তা নাহলে আজ হয়ত পাকিস্তানের ভাগ্য বরণ করতে হত বাংলাদেশকেও। আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মত জামায়াত নেতাদের পেছনে দাঁড়িয়েই নামাজ পড়তে হত! কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম আন্দোলনে অন্তত তার শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে পেরেছে, এটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

জামায়াত নেতাদের বিচার হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী সংগঠনটিও নিষিদ্ধ হউক, এটাই এখন সময়ের দাবি। কারন সাপ মেরে লেঞ্জে বিষ রাখা যাবে না! আর জামায়াতের দুর্গ সদৃশ মগবাজার কার্যালয়টিকে করা হউক ‘রাজাকার যাদুঘরে’। অথবা যুতসই একটি নাম ঠিক করা হউক। সেগুন বাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর আছে, কিন্তু রাজাকার যাদুঘর নেই। দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ করলে, জনগণের মুক্তি আকংখার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে পরিণতি কী হয়, সে আলেখ্যই প্রতিফলিত হউক মগবাজার জামায়াত কার্যালয়ের দেয়ালে। আমাদের প্রজন্ম জানুক জামায়াত এবং ইসলামী ছাত্র সঙ্ঘের নৃশংসতা।

নিউইয়র্ক, ১৮ এপ্রিল ২০১৫