ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

এখন আমার ভাতের অভাব নেই, কিন্তু মানুষের মর্ম স্পর্শ করার অভাব অনুভব করি ভীষণভাবে। ভালবাসারও অভাব নেই, কিন্তু ভালবাসার মানুষ খুঁজে ফিরি যত্র-তত্র। যে ভাব এবং ভাষায় নিজেকে বদলে ফেলার পথ খুঁজে পেয়েছিলাম, সে ভাবও আজ নেই। আর ভাষা হারিয়েছে সেই পথের ক্লান্তিতে! অভাব আমাকে কুঁড়ে খায়! তাই তো আমি হিসাব মেলাতে পারিনা। যখন মানবতা ও উদারতার স্খলন দেখি, আমি এর উত্তর খুঁজে পাই না। এমনকি আমার কিসের অভাব তাও বুঝি না। কিন্তু অভাবের অস্তিত্ব অনুভব করি। এ অভাব মানুষের সঙ্গে মেল বন্ধনের। অভাব- আত্মীয়তা, পরার্থপরতা, আর মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলার!

একবার আবুধাবির কিং আবদুল্লাহ মসজিদ সফর করছিলাম। প্যারিসের নটরডেম চার্চে যেমনটা দেখেছিলাম, এখানেও তাই। দর্শনার্থী শত-শত, কিন্তু উপাসক নেই! এমনকি ইউরোপীয় মহিলারাও বোরকা পরে মসজিদের সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুনেছি সেখানেও জাঁকজমকের সঙ্গে উপাসনা হয়, কেবল শুক্রবারে। মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র আকাশচুম্বী অট্টালিকা, শপিং মল আর পানশালার ভিড়েও আমি খুঁজে ফিরি সেই মরুভূমিতে উটের রাখালকে। যার আহবানে একদা মানুষ খুঁজে পেয়েছিল সাম্য-মৈত্রী আর ভ্রাতৃত্বের দিশা, তার দেখাও পাইনা। কিছু বাঙালী, পাকিস্তানী আর ভারতীয়ের দেখা পাই, আর দেখা মেলে কিছু দাস প্রভুর!

দেখেছি ভারতের দিল্লিতেও, আকশারধাম- বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে মন্দির নির্মিত হয়েছে জাঁকজমকে। সেখানেও সারা ভারতের হাজার হাজার মানুষের ভীড়, মন্দিরের সৌকর্য দেখার জন্য। কিন্তু উপাসক? তারও দেখা পেলাম না। কিং আব্দুল্লাহ’র কবরের পাশে দিনেরাতে ২৪/৭ কোরানের আবৃত্তি চলছে, কিন্তু তার শ্রোতা পেলাম না একজনও। কিন্তু প্রতি ভোর বেলায় আমার বাবার কন্ঠে কোরানের তেলাওয়াত শোনার প্রতিক্ষায় থাকি এখনও প্রতিদিন! বাবার তেলাওয়াত শুনিনা, আমারও ঘুম ভাঙ্গে না!

গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে পিউ রিসার্চের জরিপ বেড়িয়েছে। তাতে দেখা গেছে ২০০৭ সালে যেখানে ৭৮ শতাংশ লোক নিজেদের খ্রিস্টান বলে মনে করতেন। ২০১৫ সালে এসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। তার মানে প্রতিবছর এক শতাংশ লোক খ্রীস্ট ধর্মের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে। প্রতি বছর উপাসকের অভাবে চার্চ ভেঙ্গে করা হচ্ছে শপিং মল। তাই বলে কি জাকজমকপূর্ণ চার্চ নির্মাণ বন্ধ আছে? মোটেই নয়। গতকালই গাড়ি চালাতে গিয়ে আমার পাশের একটি এলাকা ফিশকিলে ৮২ নম্বর সড়কের পাশে দেখলাম তাজমহলের আদলে বিশালকায় নতুন একটি চার্চ নির্মিত হয়েছে। বুঝতে বাকি রইল না মনের গহনে মসজিদ-মন্দির দিনে দিনে হারিয়ে গেলেও ইট-পাথরের মসজিদ-মন্দির নির্মিত হবেই, যতদিন পর্যন্ত রাজনীতির দুষ্ট গ্রহ আমাদের তাড়া করবে!

বাংলাদেশেও শুনছি এখন প্রতিগ্রামে ’রাজনীতির ইবাদতখানা’ নির্মিত হবে! হোক, তাতে কী? একদিন সবই হবে নটরডেম চার্চ! আর ওই যে পালমিরায় আইসিস যে পুরাকীর্তিগুলো ধ্বংস করছে, কয়েক হাজার বছর আগে সেগুলোও ছিল হারিয়ে যাওয়া কোনও ধর্মের ইবাদতখানা। তাইতো ইবাদত খানা নির্মানে আমি বিষাদ গ্রস্থ হই, এ কারনে যে একদিন, সময়ের বিবেচনায় মানুষ সে সবও ধ্বংস করবে। কিন্তু আমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে। সৃষ্টির পেছনে মানুষের যে ভালবাসা ও ত্যাগ সঞ্চারিত হয়, তার মহিমা বহন করে যাওয়াই তো সভ্যতা! অথচ আজ এরই অভাব সর্বত্র। ভালবাসার পরিবর্তে হত্যা-খুন-রাহাজানি, গলাগলির পরিবর্তে গালাগালি আর গোলাগুলিই যেন সভ্যতার অনুষঙ্গ!

এখনও কিছু মানুষ যে ব্যতিক্রম নেই, তা নয়। প্রতিদিন একটি মানুষকে দেখে আমি আশান্বিত হই, তিনি আমার প্রেসিডেন্ট ওবামা। আমার কাছে সাক্ষাৎ দেবতা। আমি জানি চাপাতির কোপ থেকে তিনিও আমাকে বাঁচাতে পারবেন না। কিন্তু তার কথা ও আশায় আমি অনুপ্রাণিত হই প্রতি সকালে। সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেছিল “জঙ্গী ইসলামী মৌলবাদের বিপদ” সম্পর্কে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন- এ বিপদ সহসাই কেটে যাবে। কিভাবে কাটবে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন- দু’শ বছর আগে আমেরিকাতেও “জিম ক্রো” নামে খ্রিস্ট ধর্মের এক মৌলানা দাসপ্রথাকে হালাল করেছিল ধর্মের দোহাই দিয়ে। এমনকি দাসের স্ত্রী-কন্যাও ছিল মালিকের জন্য বৈধ। আজ সে সবই ইতিহাস! বন্ধুত্ব, ভালবাসা, আর মানুষে মানুষে মর্ম স্পর্শ করার যে অভাব, একদিন তাও ঘুচবে, সে আশা নিয়েই বেঁচে আছি।

নিউইয়র্ক, ২৩ মে ২০১৫