ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

সাবওয়ে সেভেন ট্রেনে চড়ে ৭৪ স্ট্রীটে নেমে মাত্র তিন ব্লক হাঁটা পথে ৭৭ ষ্ট্রীটের ৬৯ নম্বর পাবলিক স্কুলে বসেছে বাংলা বইয়ের মেলা। এই বসন্তের বিকেলে মৃদুমন্দ বাতাসে পতপত করে উড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তধারার বিশ্বজিৎ প্রতি বছর আয়োজন করেন এ মেলার। আয়োজক মুক্তধারা নিউইয়র্ক ফাউন্ডেশন। এরনাম আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা। ১৯৯২-তে এর শুরু। বই যারা পড়েন তারা জানেন- বই কেনা আসলে কত কঠিন কাজ! বাজারে সবকিছু বিকোয় খুব সহজে, কেবল পাঠযোগ্য বই ছাড়া। পাঠযোগ্য বই কিনতে পাঠককে ঘর্মাক্ত হতে হয়! এই বইমেলায় মনের সুখে দু-চারটে বই কিনতে আমি এসেছি অন্তত দেড়’শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে।

আমার চেনাজানা বন্ধুরা কষ্ট করে বই লেখেন, প্রকাশকরা দয়া করে ছাপান, সেসব জানা হয়ে যায় ফেইসবুকেই। কিন্তু ঢাকা ছাড়ার পর বই কিনেছি অল্প কয়েকটিই। ভেবেছিলাম নিউইয়র্কের বই মেলায় সেসব পাবো। হায় হতোস্মি! সম্ভবত একুশে বই মেলাতেই সেসব বইয়ের প্রকাশনা শেষ হয়ে পড়েছে। যারা বই মেলায় স্টল নিয়ে বসেছেন, লেখকের নাম বললেই যেন আকাশ থেকে পড়ছেন! অবশেষে লেখকের নাম বলা বাদ দিয়ে নিজের চর্ম চক্ষের উপরই ভরসা করতে লাগলাম। টেবিলের উপর সাজানো বইগুলোতে হাতড়াতে থাকলাম আমার প্রিয় লেখকদের।
মেলায় লক্ষ্য করলাম আমার দু’জন প্রতিবেশিনীও এসেছেন। বইয়ের পাশাপাশি কাপড়চোপরের বিপুল সম্ভার দেখে আশ্বস্ত হলাম এসবের প্রয়োজনেও ভীড়বাট্টা বাড়তে পারে। বাংলাদেশে বই মেলা উপলক্ষে লেখক প্রকাশকরা কত ছাড়া দেন! এখানে তার বিন্দুমাত্র নেই। বরং ডলারে আশি টাকার পরিবর্তে ২০ টাকার হিসাব। ১০০০ টাকার বইয়ের জন্য আপনাকে গুনতে হবে ৫০ ডলার! আমি নিশ্চিত এটা যুক্তিসঙ্গত হয়নি। তবে আয়োজকরাই এর উত্তম ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। মেলা উপলক্ষে তারা যে স্মারক গ্রন্থটি বের করেছেন সেটাও দৃষ্টিনন্দন। পড়ার মত অনেক প্রবন্ধ-গল্প-কবিতা তারা যুক্ত করেছেন ১২৮ পৃষ্ঠার এই স্মারক গ্রন্থে।

এক সময় দেখলাম মেলা প্রাঙ্গনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাইয়ীদ স্যার। তার সঙ্গে আরও জনা কয়েক। আমাকে কি স্যার এখন চিনবেন? আমাকে তো আমার বন্ধু সতীর্থ অনেকেই চেনে না, স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায়! স্যার, সে তো অনেক দূরের পথ! অপেক্ষা করছিলাম কামরুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার। সৈয়দ কামরুল ভাইয়ের সঙ্গে ফেবু’র মাধ্যমেই যোগাযোগ। এক সময় দেখা হয়ে যায় ২০০০ সাপ্তাহিকের টক শো সেলিব্রেটি গোলাম মর্তুজার সঙ্গে। দোতলায় দর্শকের সারিতে বসে আবৃত্তি শুনলাম কিছুক্ষণ। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনাও হয়েছে। আমার মনে হয়েছে বই মেলায় এ ধরনের আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। এতে মেলার প্রাণ নস্ট হয়।

অসংখ্য বই কেনার ইচ্ছা থাকলেও মাত্র তিনটে বই কিনে মেলা প্রাঙ্গন ত্যাগ করলাম। আরজ আলী মাতুব্বরের রচনা সমগ্র, আলবেয়র কামু’র তিনটি উপন্যাস, আর সিরাজ উদ্দীন সাথী ভাইয়ের ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণ কাহিনী। তিনটি বই’ই আয়তনে অনেক বড়। আমি গাড়ি নিয়ে যাইনি, তাই দীর্ঘ পথের ভার সইতে হবে হস্তযুগলকে, এই বিবেচনায় আর কোনো বই কিনিনি। মাতুব্বর সাহেবের সত্যের সন্ধানে বইটি বহু আগে পড়েছি। কিন্তু একসঙ্গে রচনা সমগ্র হাতে পাওয়া দুর্লভ। আমার বিবেচনায়- যারা বই লেখেন, বই ছাপান, তারা একসঙ্গে রচনা সমগ্র প্রকাশ করলে খুবই ভাল হয়। অবশ্য রচনা সমগ্র লেখকের প্রয়াণের পরই প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার ভাবনায় একটি বিষয় ঘোরপাক খায়- তা হল, লেখকের মূল্যায়ন কি জীবত কালে হয়? জীবত কালে লেখকের ভাগ্যে দু’ধরনের মানুষেরই সাক্ষাৎ মেলে। হয় তোষামোদকারী, নয় নিন্দুকের। এরা লেখার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলা অথবা বিশ্ব সাহিত্যে খ্যাতিমানরা মূল্যায়ন পেয়েছেন মৃত্যুর পরে। তাই বলে কি লেখকের জীবনকালে বই বেরোবে না? নিশ্চয় বেরোবে। তা নাহলে আমরা পড়ব কি করে? আর যারা পুরষ্কার দেয়, তারা কি কেবল মরণোত্তরদেরই পুরষ্কার দিয়ে যাবে? আসলে আমার চিন্তাটাই অর্বাচীনের! যারা বই প্রকাশের হিম্মত রাখে না, তারাই এতোটা নেতিবাচকভাবে ভাবতে পারে!

বইমেলা থেকে বেড়িয়ে প্রবেশ মুখেই দেখা পেলাম দর্পনের। অনুজ বন্ধু কবি দর্পণ কবির, সাংবাদিক এবং আমার কলেজ বন্ধু আনসারীর। আমাদের আলাপের মাঝেই জুটলেন এসে আমান ভাই, মন্ট্রিলের জসিম মল্লিক ভাই, আর সবশেষে ঢাকা থেকে আগত বন্ধু মোল্লাহ আমজাদ হোসেন। আমাদের ঠোঁটকাটা বন্ধু মোল্লাহ চীর সবুজ। আনসারী নিয়ে গেল সামনের স্টারবাক কাফেতে। আমার মনে হলো এই বন্ধু সংসর্গে আয়ু বেড়ে গেল আরও কয়েকটা দিন। ভাল লাগার দিনগুলো ক্রমেই পেছনে পড়ে থাকে। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই তাই হয় নাকি?
নিউইয়র্ক, ২৫ মে ২০১৫