ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

1

রফিউর রাব্বী ভাইকে আমি চিনি না। সরাসরি কোনদিন কথা হয়নি। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রতিবাদী মানুষ, একজন বাবা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মী, আমার কাছে এই তার পরিচয়। ফেইসবুকের জন্ম না হলে কোনদিন হয়ত তার সম্পর্কে কিছুই জানা হত না। তার মতো আমিও একজন বাবা। তার সন্তান ত্বকী যে বয়সে ঘাতকের নির্মম প্রহারে মৃত্যুবরণ করে, ঠিক সেই বয়সের একটি সন্তান আছে আমারও।

গতকাল চলতি পথে এক যুবকের সঙ্গে হঠাত পরিচয়। আনন্দের সঙ্গে জানালো তার বান্ধবী সন্তান সম্ভবা, এবং তাদের একটি পুত্র সন্তান হবে। আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম- পুত্র হবে বলেই কি তোমার এতো আনন্দ! সে বলল না, মেয়ে হলেও আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে পুত্র বলে বাড়তি আনন্দের কারন হল- আমার এই খেটে খাওয়া জীবনে আমি যা শিখেছি, আমার ছেলেটিকেও তা শেখাতে এবং সেভাবে গড়ে তুলতে পারব। মেয়ে হলে হয়ত সে দায়িত্বটা নিত তার মা।

রফিউর রাব্বী ভাই ব্যক্তিগত জীবনে যে আলোয় নিজেকে রাঙিয়েছেন, সে একই আলোয় হয়ত রাঙাতে চেয়েছিলেন তার সন্তান ত্বকীকে। একই ধ্যানে এবং জ্ঞানে বড় করতে চেয়েছিলেন সন্তানকে। সে কথাই উঠে এসেছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের লেখায়। তিনি জানিয়েছেন ত্বকীর অপ্রকাশিত সব কথা। সতের বছরের একটি তরুন সমাজ-সংসার, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সর্বোপরি দেশের মানুষকে নিয়ে কত বড় স্বপ্ন দেখত লেখায় উঠে এসেছে সে সব। স্যারের সেই দীর্ঘ লেখাটি পড়তে পড়তে চোখের কোণে জমে উঠে জল। মনে হচ্ছিল আমি ত্বকী নয়, যেন রাব্বী ভাইয়ের জীবন কথা পড়ছিলাম। কারন সন্তানের মানস গঠনে তিনিই রেখেছেন সবচেয়ে বড় ভূমিকা। সন্তানকে প্রতিবাদী আর সাহসী, এবং একই সঙ্গে মানুষ হওয়ার দীক্ষাও দিয়েছিলেন।

বাবা হিসেবে রফিউর রাব্বী যদি সন্তানকে আপন আলোয় পথ না দেখাতেন, তাহলে হয়ত সমাজের আর দশটি তরুনের মত ত্বকীও বেঁচে যেত। এসএসসি পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে পাড়ি জমাত। কিংবা গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিবাদী সমাবেশ শাহবাগে এসে যোগ দেয়ার উৎসাহও পেত না। আমরা সন্তানদের বড় করি, চেতনায় শানিত করার প্রয়াস চালাই। কিন্তু আমরা কি জানি যে আমাদের কারনে আমরা সন্তানের জীবনকে বিপদগ্রস্থ করে তুলি! প্রশ্ন দাঁড়ায়- তাহলে আমরা কি সব অন্যায় মেনে নিয়ে ঘরের কোণে আশ্রয় নেব, নাকি বিদেশে পালিয়ে যেয়ে প্রাণ বাঁচাবো? আমাদের সন্তান নিশ্চয় আমাদের কাছে অনেক বড়। কিন্তু আমাদের দেশ, সমাজ যা আমাদের চোখের সামনে দিনে দিনে সন্ত্রাসী-মাফিয়াদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে চলেছে, আমরা কি তা মেনে নেব?

রফিউর রাব্বী একজন বাবা হিসেবে নিশ্চয় ভুল করেননি। বিপদ জেনেও সমাজের অনাচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চলেছেন। এই সেদিনও দেশের মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কে তার সন্তানের হত্যাকারী। কারা নারায়নগঞ্জবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে। তিনি একজন সন্তানহারা বাবা। এমপি কিংবা নেতা হওয়ার খায়েশ তার নেই। তা হতে চাইলে ঘাতকের খড়গের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা উচু করে প্রতিবাদ জানাতেন না। এমনকি তাকে সন্তানও হারাতে হতো না। আজ আমরা, যারা সন্তানের নিরাপদ আবাসভূমি হিসেবে বাংলাদেশকে দেখতে চাই- আমাদের সবার উচিত তার পাশে দাঁড়ানো। সমাজের এই স্খলন নীরব দর্শকের মত উপভোগ করতে চাইলে, এমন দিন বেশী দূরে নয়, যেদিন আমাদের সবার সন্তানকেই ত্বকীর ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে।

দেশের জীবন-যাপন থেকে দূরে বলে নিজেকেও অপরাধী ভাবি। ত্বকী বাবার সঙ্গে লুকোচুরি খেলে শাহবাগের গণজাগরণে যোগ দিয়েছিল। আর আমার মত অনেক প্রবাসী দেশের মানুষের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে দেশের বাইরে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজেছি। তাই বলে একজন বাবার সঙ্গে সন্তান হত্যার বিচার দাবি করাকে উদাসীন চোখে এড়িয়ে যাবার উপলক্ষ খুজছি না। আসুন আমরা সবাই দাবি জানাই, যে কোনো মূল্যে ত্বকী হত্যার বিচার করতে হবে। আমাদের দেশকে আমরা ঘাতকের নিরাপদ বিচরণ ভূমিতে পরিণত হতে দিতে পারি না!!

নিউইয়র্ক, ১০ই জুন ২০১৫
—————————-
(সপ্তাহান্তে বাবা দিবস। মনে হয়েছে রফিউর রাব্বী একজন শ্রেষ্ঠ বাবা। তার মত প্রত্যেক বাবা যেন আমাদের সন্তানদের প্রতিবাদী মানুষ হতে শিখাই।) ছবিঃ লাল জামা গায়ে ত্বকী, বাবা’র ফেইসবুক থেকে নেয়া।