ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

1

 

 

 

 

 

 

 

 
ফেইসবুকে পদচারণা নিয়মিত-অনিয়মিত প্রায় সাত বছর। এরমধ্যে পুরনো বন্ধুবান্ধব যেমন পেয়েছি, তেমনি জুটেছে নতুনও। পুরোটাই আনন্দের। তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা- কবি আবু হাসান শাহরিয়ার ভাইকে অক্ষত এবং অবিকৃত ভাবে পাওয়া। শাহরিয়ার ভাই ৫৬-তে পদার্পণ করেছেন। বলা যায় জীবনের মধ্য গগণে। এর মধ্যে দিয়েছেন অনেক, পেয়েছেন তারচেয়ে অনেক কম। এই না পাওয়ার অনেক কারণ আছে। তারসঙ্গে কয়েক বছর সান্নিধ্যের অভিজ্ঞতা থেকে দু’একটি কারন জানাতে চেষ্টা করব।

১৯৯১ সালে অধুনা লুপ্ত ‘আজকের কাগজ’ জন্মলাভের শুরুতে সহসম্পাদক হিসেবে আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। পাশের কক্ষেই যে লোকটি টেবিলের চারপাশে লোকজন ঘিরে বসে থাকতেন, তিনি শাহরিয়ার ভাই। সপ্তাহের যেদিন আজকের কাগজের সাহিত্য পাতাটি প্রকাশিত হত, তার কয়েক দিন আগে থেকে তার কর্ম চাঞ্চল্য ছিল চোখে পড়ার মত। কবি নির্মলেন্দু গুণ যখন বাংলাবাজার পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক, আমি তখন সে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক। কিন্তু সাহিত্য নিয়ে শাহরিয়ার ভাইয়ের মত এমন সিরিয়াস মানুষ আমার জীবনে দ্বিতীয়টি আর দেখিনি। নিয়মিত আট পৃষ্ঠার আজকের কাগজ সাহিত্য পাতা নিয়ে বারো পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হত। যেদিন সাহিত্য পাতা প্রকাশিত হত, সেদিন কাগজের কাটতি বেড়ে যেত অন্তত ২৫ ভাগ। তারচেয়েও বড় কথা গেট-আপ, মেক-আপ এবং বিষয়ের আভিজাত্যে ঢাকায় এমন সাহিত্য পাতার কোনো তুলনা ছিল না।

হঠাত একদিন চট্টগ্রাম থেকে চিত্রকর বন্ধু উত্তম সেন এসে নাজেল হন, যোগ দেন আজকের কাগজে। আমি, উত্তম, কবি আসাদ মান্নান (এখন বিটিভি’র ডিজি), আর আমার আরেক বন্ধু সমীর ছিলাম আমরা একই বাসার বাসিন্দা। সবাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আসাদ ভাই ছিলেন সচিবালয়ে সিনিয়র সহকারি সচিব। একজন সৎ চাকরিজীবী বলে আর্থিক কারনে পরিবারকে রেখেছিলেন সন্দ্বীপে গ্রামের বাড়িতে। সমীর চাকরি করতেন বিসিআইসি’তে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে তারমধ্যেও লেখক-কবি হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করি। তখনই শাহরিয়ার ভাইয়ের বেশ ক’টি কবিতার বই প্রকাশিত। আসাদ ভাইরও একটি কি দু’টো। লিটল ম্যাগাজিন এবং কবিতা-ছড়া সূত্রে এদের যোগাযোগ অন্তত দশকের। এদিকে শাহরিয়ার ভাই’র বাসাও ছিল আমাদের জিগাতলা বাসা’র ৫০-৬০ গজ দূরে। ফলে আসা-যাওয়ার পথের ধারে শাহরিয়ার ভাইয়ের আগমণ ছিল নিত্য, এমনকি দিনে কয়েকবার।

শাহরিয়ার ভাই এবং আসাদ ভাইকে কেন্দ্র করে প্রায় সন্ধ্যায় আমাদের এই তিন শয়ন কক্ষের বাড়িতে কবিতা আড্ডা হত। তাতে রাজু আলাউদ্দীন, সাঈদ তারিক, সূচি সৈয়দ, ফরিদ উদ্দীন যুক্ত হতেন। এমন কি কোনো এক আড্ডায় কবি রফিক আজাদও যোগ দিয়েছেন। সামনের সুধারাম রেস্তরাঁয় চা-সিঙ্গারার অর্ডার দেয়া যেত দোতলায় দাঁড়িয়েই। এরা সবাই আবৃতি করতেন স্বরচিত কবিতা। একমাত্র আমি ছিলাম নিয়মিত শ্রোতা। কবিতা লেখার শক্তি আমার নেই। কিন্তু কবি-লেখক-চিত্র শিল্পীর এমন আড্ডা এড়িয়ে চলার মত অবুঝ আমি ছিলাম না।
সংবাদ পত্রে কাজের ফাঁকে শাহরিয়ার ভাইয়ের একটি প্রকাশনা অফিস ছিল গুলিস্তানে। সচিবালয়ে রিপোর্ট সংগ্রহ কিংবা কোনো কাজে গুলিস্তান গেলে শাহরিয়ার ভাইয়ের অফিসে ঢুঁ মারতাম। যদিও পাঁচ তলার সিঁড়ি ভাঙ্গা খুব সহজ ছিল না।

শাহরিয়ার ভাই একজন প্রেমিক, প্রচণ্ড আবেগী, অভিমানী, উদার এবং স্পস্টবাদী মানুষ। এ যাবত কোনো সরকারি পদক, কিংবা খেতাব-বিভূষণ না পাওয়ার জন্য যে কোনো কীর্তিবান মানুষের এ গুণগুলোই যথেস্ট! আমাদের সমাজে, দেশে প্রতিভা নিয়ে জন্মানো, আর প্রতিভাকে সমাদর করা দু’টোই অনেক কঠিন কাজ। যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতাবানের কাজে আপনি না লাগবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজে আপনার কোনো মূল্য নেই! কর্পোরেট মিডিয়াকে যিনি বলেন- “ধনীর বাড়ির পাহারাদার কুকুর” তার সমাদর তো মিডিয়ায়ও হওয়ার কথা না! শাহরিয়ার ভাই এই কাজটিই করেন। পাতে ছাই জুটবে জেনেও সমালোচনায় পিছ পা হননি অন্তত আমার দেখা গত প্রায় দুই যুগে। কোনো মানুষকে জানা এবং তার সম্পর্কে লেখার জন্য এই সময়টা যথেস্ট।

ঢাকার শিল্প-সাহিত্য, পত্রিকা জগতে একধরণের চাটুকারিতা আমাকে পীড়া দিয়েছে এগারো বছরের সাংবাদিকতা জীবনে। ক্ষমতার সঙ্গে অনেক পেশাদার সাংবাদিকের গোপন অভিসার কাছে থেকে দেখেছি। শাহরিয়ার ভাই এই প্রথাগতদের দলে নেই, এমন কথা ঘুমের ঘোরেও বলতে পারব। তবে আমি প্রচণ্ডভাবে বিশ্বাসী- কিছু মানুষ স্রোতের বিপরীতেও সাঁতার কাটতে জানে, শাহরিয়ার ভাই সে দলের। কারন প্রকৃতিগত ভাবেই তিনি একজন কবি। কবি-লেখক হওয়ার জন্য তাকে কারো দুয়ারে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হয়নি।

আমরা যখন উচ্চারণ করি- ‘মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে ধরো নিজেরে, কারো করো না ভয়’ তখন আক্ষরিক অর্থে একজন দ্বিধাহীন, নিঃশঙ্ক চিত্তের মানুষ খুঁজি। শাহরিয়ার ভাই সে প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকুন, আর পথ দেখিয়ে চলুন বর্তমান আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। আজ জন্মদিনে শুভ কামনা হয়ে থাকল শাহরিয়ার ভাইয়ের প্রতি।
নিউইয়র্ক, ২৫শে জুন ২০১৫