ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 
sidebyside_fullcolor_white-RGB_crop

চার দিন আগে, শুক্রবারে আমেরিকায় যে ভয়ানক কাণ্ডটি হয়ে গেল তা নিয়ে ফেইসবুক গরম। যাদের লেখা পড়ে ভাল লাগে, তাদের মতামত পাবার পর অপেক্ষা করছিলাম শফি হুজুরের মতামতের। তিন দিনেও যখন কোনো মতামত এলো না, তখন ধরে নিলাম ওয়াজিয়ান’রা সম্ভবত অপেক্ষা করছেন শীতকালের। শীতকালে শরীর গরম করার ফুলঝুরি ছড়াবেন তারা। এখন দেখা যাক আমার বন্ধুরা কে কি বলেছেন। একজন ভালগার উগরে বলেছেন, ‘এই রায়ে আমেরিকার …… মারা সারা। এখন্ সারা বিশ্বের …… মারার জন্য তারা তৈরি!’ আরেক বিজ্ঞ প্রগতিশীল বন্ধু ধর্মকে টেনে এনে বলেছেন, এখন ‘মাতার সঙ্গে পুত্রের বিয়ে হলেও আর বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।’ আরেক মার্কসবাদী বন্ধু পুঁজিবাদের সাতকাহন জুড়ে দিয়েছেন এর সঙ্গে। বলছেন- পুঁজিবাদ মানুষকে যেমন নিঃসঙ্গ করে দেয়, আমেরিকার এই ঘটনায়ও নাকি মানুষকে নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আমেরিকার বিরোধিতা করার অনেক বিষয় আছে। কিন্তু কেবল বিরোধিতা করার জন্য মার্ক্সবাদকেও অযৌক্তিক কিংবা সামঞ্জস্যহীন করে ফেলা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ না! আশ্চর্য হলাম এই যুক্তিতে। নিঃসঙ্গ সমকামীরা যখন আইনানুগ সঙ্গ খুঁজছে, এবং রাষ্ট্র, আদালত যখন সেই সুযোগ করে দিচ্ছে, তখন তারা নিঃসঙ্গ হয় কিভাবে? কী সব উল্টাপাল্টা যুক্তি!

এখানে বলে রাখা ভাল- গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের সংশোধনী হিসেবে এলজিবিটি (লেসবিয়ান-গে-বাই সেক্সুয়াল-ট্রান্সজেণ্ডার) মানুষদের বিবাহের অধিকারকে বৈধ বলে রায় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এগারো বছর আগে ম্যাসাচুসেট রাজ্যে সমকামিদের বিয়ে প্রথম অনুমোদন পায়। ৫০টি রাজ্যের মধ্যে ৩৭টি রাজ্য ইতিমধ্যে এই বিয়ে অনুমোদন দিয়েছে। এখন সংবিধানের এই রায়ের ফলে বাকি রাজ্যগুলোও বৈধতা দিতে বাধ্য। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন- আমি বলব- এই রায়টি “বিয়ে” শব্দটি প্রয়োগ না করে “ডমেস্টিক পার্টনার” বলতে পারতো। হয়ত এটি শব্দের হেরফের। তাতে রায়ের “এসেন্স”-এ কোনো পার্থক্য হত বলে আমার মনে হয়না। হয়ত, ভবিষ্যতে রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় এলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটা পাল্টাতেও পারে। তবে আমি যতদূর মনে করতে পারি- এলজিবিটি অধিকার প্রদানের জন্য ওবামা নিরবাচনী ওয়াদা করেছিলেন ২০০৮ সালে, এবং এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাকে একচেটিয়া ভোট দেন।

এ কথা কে না জানে যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটা মানুষ তো বটেই, পশু-পাখির অধিকার সংরক্ষণ করা হয় সংবিধান ও আইনের বলে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ও সংগ্রামে এটা অর্জিত। কাজেই কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ যদি কোনো একটি অধিকার লাভের দাবি জানায়, এবং তাদের এই অধিকার লাভের বিনিময়ে যদি অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, তাহলে সংবিধানের মৌলিক অধিকার বলে তারা সে অধিকার পেতে কোনো বাঁধা নেই। এখানে ধর্ম কিংবা চার্চের কোনো ভূমিকা নেই। চার্চ কি বলল না বলল, তাতে কারো কিছু যায় আসে না! অথচ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে রাষ্ট্র এবং উপাসনালয় কার্যত পৃথক হতে পারেনি। এ কারনে আমরা প্রায়শ উপাসনালয়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলি, তাদের চটাতে চাই না।

অনেকেরই এটি অজানা যে, যুক্তরাষ্ট্রের আগে অন্তত দুই ডজন দেশ এলজিবিটি-দের বিবাহের অধিকার দিয়েছে। গ্রীনল্যাণ্ড, আয়ারল্যাণ্ড, ফিনল্যাণ্ড চলতি বছর, লুক্সেমবার্গ, স্কটল্যাণ্ড গত বছর, ইংল্যাণ্ড ও ওয়েলস, ব্রাজিল, ফ্রান্স, নিউজিল্যাণ্ড, উরুগুয়ে ২০১৩, ডেনমার্ক ২০১২, আরজেন্টিনা, পর্তুগাল, আইসল্যাণ্ড ২০১০, সুইডেন, নরওয়ে ২০০৯, সাউথ আফ্রিকা ২০০৬, স্পেইন, কানাডা ২০০৫, বেলজিয়াম ২০০৩, নেদারল্যাণ্ড ২০০০ সালে। এমনকি মেক্সিকো’র মত দেশ শর্ত সাপেক্ষে সমকামী বিবাহের অনুমতি দিয়েছে।

এখন আসুন বিয়ে’র ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কি বলা হয়েছে। সংবিধানে বিয়ে বলতে একজন নারী ও একজন পুরুষের স্বেচ্ছায় পরস্পরকে বরণ করে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ আমরা জানি- মধ্য প্রাচ্যের সংবিধানে তো বটেই, আমাদের সাংবিধানিক আইনেও একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী গ্রহণের সুযোগ আছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বে এটি (পলিগামিতা) মারাত্মক রকমের অপরাধ। কাজেই ‘বিয়ে’র দৃষ্টিভঙ্গি দেশভেদে ভীন্ন! পিউ রিসার্চের জরীপে যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহিতদের প্রায় পচানব্বই শতাংশ বলছেন- তারা ভালবাসা এবং বান্ধবীর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার কারনেই ‘বিয়ে’ করেন। আমাদের বেলায় শতকরা কতজন এই জ্ঞানে বিয়ে করেন, তার হিসাব সম্ভবত কারো অজানা নয়! আর ‘বিয়ে’ নামের যে কাগুজে বণ্ড এই সভ্য দুনিয়ায় চালু আছে কত বছর ধরে? বড়জোর ১০ হাজার বছর! তার আগেও তো পৃথিবীতে সন্তান-সন্ততি উৎপাদনে কোনো ঘাটতি পড়েনি!

অনেকে বলবেন ‘প্রথা’ বলে একটা কথা আছে। প্রথা তো আমরা মানুষই সৃষ্টি করি। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে দাস প্রথাও ছিল ধর্ম ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে আইনানুগ। মানুষ সংগ্রাম করে এই প্রথা ভেঙ্গেছে। এক সময় যাজকরা সিদ্ধান্ত দিত রাষ্ট্র কার্যে। ব্রাহ্মণরা ছড়ি ঘুরাতো সমাজে। সেই প্রথাও পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত প্রায়। এমন একদিন আসবে যেদিন বাংলাদেশেও বহু বিবাহ আইন করে রদ করা হবে। আমরা ভালবাসার বিয়েকে উৎসাহ যোগাবো, প্রথার বিয়েকে নয়! প্রথা বিষয়ে আরেকটি উদাহরণ দেই- যেমন আমি আমার স্ত্রীর নামের শেষে আমার নাম বা অপ্রয়োজনীয় উপাধি জুড়ে দেইনি। আমি মনে করেছি- আমার সন্তানের নামের শেষে যেমন আমার নাম বা উপাধি আছে, ঠিক তেমনি আমার স্ত্রীর নামের পেছনে তার বাবার উপাধিটিই যুক্ত হউক। তাকে বিয়ে করার সঙ্গে সঙ্গে তার নাম পাল্টে ফেলিনি। এটিও প্রথার বিরুদ্ধে আমার প্রথম অবস্থান। অথচ সো কল্ড শিক্ষিত সমাজ বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর নাম পাল্টে দেন, এটা যুক্তরাস্ট্রেও হয়, এই যেমন হিলারী ক্লিনটন। স্বামী পরনারীর সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করলেও স্ত্রী ঠিকই আলগে রেখেছে স্বামীর নাম! এ কেমন বিচার?

আমি যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় চৌদ্দ বছর। আমার দেখা মতে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ কাগুজে বিয়ে এবং আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বাস করে। এমন বহু ঘটনা হর-হামেশা দেখা যায়, তারা সংসার করছে ষাট-সত্তুর বছর, সন্তান-নাতি-পুতি সবই আছে, তবু বিয়ে করেনি। বিয়ে করাটাকে বাড়তি ঝামেলা কিংবা অপ্রয়োজনীয় মনে করে। ভালবাসা না থাকলে তো বিয়েও থাকে না! আর সম্পদের উপর যেহেতু নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সেকারনে সংসার টিকে থাকে কেবল “ভালবাসার” উপর! তারা ভালবাসাটাকেই ধরে রাখার চেস্টা করে, বিয়ে নয়। ধর্মের বাঁধন যেহেতু নেই, সেকারনে ভালবাসা উঠে গেলে সংসারেও ভাঙ্গন ধরে। তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বিয়েটাই যদি ফালতু বিষয়ে পরিণত হয়ে যায়, তাহলে এলজিবিটি লোকেরা কেন কাগুজে বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লাগল? প্রথমত এর পেছনে কিছু রাস্ট্রীয় এবং আইনি সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন জড়িত। দ্বিতীয়ত এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা রাষ্ট্রের কাছে তাদের “ভালবাসার স্বীকৃতি” চেয়েছে। এতকাল রাষ্ট্র তাদের ব্যাপারে উদাসীন ছিল, সুপ্রীম কোর্টের রায়ের পর রাষ্ট্রের উদাসীন হওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।

এখন আসুন- এই এলজিবিটি রাষ্ট্র থেকে কি সুবিধাটুকু পাবে? প্রথমত ট্যাক্স কোডে তারা যখন “ম্যারিড কাপল” হিসেবে “জয়েন্ট” ফাইলিং করবে, তখন একটা সুবিধা পাবে। ইন্সুরেন্সে সুবিধা পাবে। হাসপাতালগুলোতে সব রোগীকেই জানাতে হয়- তার ইমারজেন্সী প্রয়োজনে কাকে পাওয়া যাবে? রাস্ট্রীয় মেডিক্যাল বেনিফিট থেকেও তারা বঞ্চিত হবে না। তারা দত্তক হিসাবে সন্তান পালন করতে পারে। এ ক্ষত্রে আমাদের মাথায় প্রথমেই আসে- “বুকের দুধ কোত্থেকে পাবে?” বুকের দুধের সন্তানকে কেউ দত্তক দেয় না। আর এমন যদি হয়, সন্তান ভূমিস্ট হওয়ার পরই মায়ের মৃত্যু ঘটে, সেটি আলাদা কথা। আর পৃথিবী এমনিতেই জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত। অনাথ আশ্রমের বালক-বালিকা যদি কারো পিতৃ-মাতৃ স্নেহে বড় হয়ে উঠে তাতে তো আমাদের ক্ষতির কোনো কারন নেই? সুপ্রীম কোর্টের রায়ের ফলে বিশ্বেস করুন বিয়ে কিংবা সন্তান উৎপাদন কোনো কালে বন্ধ হবে না। কিন্তু কিছু মানুষের প্রতি সুবিচার করা যাবে। ভুলে যাবেন না, এরা আমাদের পরিবার কিংবা সমাজেরই অংশ। এদেরও মনো যাতনা আছে, এরাও কাউকে না কাউকে ভালবাসে।

নিউইয়র্ক, ৩০শে জুন ২০১৫