ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
21

 

 

 

 

 

ভারত উপমহাদেশে (বাংলাদশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা) প্রচলিত লিখিত ও মৌখিক প্রায় সকল ভাষার জন্ম সংস্কৃত থেকে। বাল্যকালে দেখেছি ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত বাবা স্থানীয়রা যতটা ফার্সি জানতেন, ততটাই জানতেন সংস্কৃত। আমাদের স্কুল গুলোতেও সংস্কৃত ভাষা শেখানোর পণ্ডিত মশাই থাকতেন, যিনি হিন্দু ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃত ভাষাও শিক্ষা দিতেন। তবে আমাদের সময় হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আমরা মুসলিম এক বাংলার শিক্ষক পেয়েছিলাম, যিনি বাংলার পাশাপাশি সংস্কৃতও পড়াতেন সমান তালে। বাংলাভাষায় “সংস্কৃতবান” যে শব্দটি চালু আছে, তারও একটি ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এক সময় সংস্কৃত উচু তলার মানুষের (রাজা-উজির-পণ্ডিতের) ভাষা ছিল বলেই রুচিবান মানুষ সহজেই পরিচিত হন “সংস্কৃতবান” হিসেবে।

আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনও “পালি ও সংস্কৃতি” নামে বিভাগ আছে। সেখানে যেমন আছেন শিক্ষক, তেমনি ছাত্র। কিন্তু এই ভাষায় পারদর্শীরা সমাজের কোথায়, কোন স্তরে কি কাজ করছেন, তা নিয়ে কোনো তথ্য পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সংস্কৃত ভাষা নিয়ে আমার এই আগ্রহের কারন- সম্প্রতি লাইব্রেরী থেকে একটি বই এনে পড়ছি, যার টাইটেল হল- “জনপ্রিয় ভারতীয় লোক গল্প”। বইয়ের সবগুলো গল্পই বেদ, উপনিষদ থেকে নেয়া। যেগুলো রচিত হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। গল্পগুলো আকর্ষণীয় সন্দেহ নেই, এবং এতে ভারতীয় সমাজ জীবনের প্রতিফলন আছে। এবং আমি চিন্তা করেছি গল্পগুলো অনুবাদ করে বন্ধুদের আগ্রহ মেটাবো। তাতে করে আমাদের শেকড় চেনা আরও সহজ হবে।

কিন্তু সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে জানতে গিয়ে অন্তরজালে যা জানলাম, তা মোটেই আশাপ্রদ নয়। সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ফারসি ও আরবীর যোগসূত্র আছে। প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে সংস্কৃত প্রচলিত ছিল “ইন্দো-ইরানিয়ান” ভাষা হিসেবে। মুগলরা প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে সারা ভারতবর্ষে চালু করেছিল ফার্সি, কিন্তু সংস্কৃতের পিঠে কখনো ছুরিকাঘাত করেনি। দুই’শ বছরের ব্রিটিশ শাসন কেবল ভারতের ধর্ম, প্রথা ও সমাজ জীবনকেই তাচ্ছিল্য করেনি, সংস্কৃত ভাষাকেও করে গেছে পঙ্গু। তাইতো সংস্কৃত এখন একটি মৃত প্রায় ভাষা। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত অধ্যাপক এবং ভারত বিশেষজ্ঞ শেলডন পলক এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

অথচ শুনে আশ্চর্য হবেন- সারা ভারতে চৌদ্দটি সংস্কৃত বিশ্ব্ববিদ্যালয় আছে যার একটির জন্ম যেমন ১৭৯১ সালে, তেমনি সর্বশেষটির জন্ম ২০১১ সালে। সরকার এবং কিছু মানুষের প্রচেস্টা স্বত্বেও সংস্কৃত’র এই বেহাল দশার আরও কিছু নমুনা দেখুন- ২০১১ সালের সর্ব ভারতীয় লোক গণনায় মাত্র ১৪ হাজার লোক বলেছেন সংস্কৃত তাদের প্রাথমিক ভাষা। যেখানে ১৯৯১ সালে অনুরূপ লোক গণনায় প্রায় ৪৯,৭০০ লোক বলেছিলেন তারা সংস্কৃত ভাষায় কথা বলেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন সবগুলো ধর্মের ধর্ম গ্রন্থ রচিত সংস্কৃত ভাষায়। তা স্বত্বেও সংস্কৃত ভাষার এই দৈণ্য দশার কারন নিহিত আছে তার নামের মধ্যেই। বলেছিলাম- এটি ইন্দো-ইওরোপীয় ও ইন্দো-ইরানী ভাষার সংস্করণ। আর্যরা এই ভাষা সংস্কার করে উঁচু তলার ভাষা নির্মাণ করেছিল। এই ভাষাতেই তারা বিকশিত করেছিল ভারতে জন্ম লাভ করা ধর্মগুলোর। ধর্মের পৃষ্ঠপোষক তথা ব্রাহ্মণ’রা ছিলেন উঁচু তলার মানুষ। সে কারনে নীচু তলার মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয়তা পায়নি।

ভারতের কর্ণাটকে মুগল শাসনামলের শুরুতে বিজয়নগর সম্রাটের আনুকূল্যে রাজা কৃষ্ণ দেবরায় একটি গ্রাম স্থাপন করেন, যার নাম মাথুর। সে গ্রামের বাসিন্দারা এখনও সংস্কৃতে কথা বলেন ঐতিহ্য সূত্রে। আর কথা বলেন ভারতের “গুরুকূল” নামে একটি সংগঠন এর সদস্যরা। এরা চিরকুমার, এদের মধ্যে বিবাহ নিষেধ। সংগঠনটির জন্মও হয় ভারতের স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে নরেন্দ্র মোদীর দেশ গুজরাটে। তবে এদের সাধনার প্রধান উপজিব্য- বেদ এবং উপনিষদ।

নিউইয়র্ক, ৩ জুলাই ২০১৫

ছবি ঃ একাদশ শতকে বিহারে পাওয়া দেবী মহত্তমার তালপাতায় লেখা সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি এবং “গুরুকূল” এর সংস্কৃত পাঠ।