ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

12

 

ছবিঃ কমরেড ফরহাদ ও ভারত বর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা মোজাফফর আহম্মেদ।

গত ৫ই জুলাই ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের জন্মদিন। মোহাম্মদ ফরহাদ বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত মুসলমানের ঘরে যিনি কমিউনিস্ট শব্দটিকে ‘গালি’র পরিবর্তে সমীহের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি মোহাম্মদ ফরহাদ। তৎকালীন ১৯৬১ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েও তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন মানব মুক্তির পতাকা। পাকিস্তান আমলে জেল জুলুম, হুলিয়া মাথায় নিয়ে কৃষক-শ্রমিকের বাঁচার অধিকার নিয়ে সোচ্চার থেকেছেন, কখনো আপস করেননি ক্ষমতার কাছে।

দুর্ভাগ্য বশত বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম চেনে না মোহাম্মদ ফরহাদকে। যেমনটি চেনে না মনি সিংহ কিংবা ভারত বর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা কমরেড মোজাফফর আহম্মেদকে। এদেরকে চেনাবার দায়িত্ব যাদের, যারা নিজেদের মার্ক্সবাদী, কমিউনিস্ট বলে দাবি করেন, আশ্চর্যজনকভাবে তারাও নীরব! তার জন্মদিন উপলক্ষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) থেকে গতকাল কোনো বিবৃতিও ছিল না! দলটির ওয়েব সাইটে গিয়ে দেখি- সেখানেও ঝুলছে গত ১৯শে জুন তারিখে দেয়া মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সাহেবের একটি বিবৃতি। বিবৃতির শিরোনাম- “ঢাকায় কমিউনিস্ট পার্টির জনভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।”

কমরেড ফরহাদের জীবন পানি করা সংগঠন- সিপিবি কেমন চলছে, এটা কোনো গবেষণা ছাড়াই যে কেউ বলে দিতে পারবে কেবল এই ওয়েব সাইটটি দেখে। ২০১৫ সালে দাঁড়িয়ে কোনো প্রগতিকামী সংগঠনের ওয়েব সাইট যে এত দুর্বল, নিঃশক্তির, তা ভাবতেও কষ্ট হয়! অথচ এই মনি সিংহ, ফরহাদ তাদের রাজনৈতিক উত্তরসুরীদের জন্য কম সম্পদ রেখে যাননি। যদিও নিজেরা ঢাকায় আজীবন থেকেছেন ভাড়া করা চিলে কোঠায়!

জীবনে দু’বার মোহাম্মদ ফরহাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল, চট্টগ্রাম আর হবিগঞ্জে। আর মনি সিংহের সঙ্গে একবার গ্রীণ রোডে ভূতের গলিতে তার সন্তানের বাসায়। মোহাম্মদ ফরহাদ মস্কোতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাবার পর তার সেগুন বাগিচার বাসায় গিয়েছিলাম জীবন সঙ্গিনী (রাশেদা খানম) রিনা খানকে শোক জানানোর জন্য। হবিগঞ্জের সিপিবি নেতাদের সঙ্গে। ছোট্ট একটি দুই কোঠার বাসায় থাকতেন ফরহাদ। বৈঠক খানায় ছিল দু’টো মামুলি বেতের চেয়ার। স্ত্রীর একমাত্র আয়ে তার সংসার চলত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন রাজনীতিতে। স্ত্রীও সক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতে, তবে গোপনে।

বাংলাদেশের সংকটে যে রাজনীতিক মশাল জ্বেলে পথ দেখিয়েছেন সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে, তিনিই মোহাম্মদ ফরহাদ। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ এই চার বছরেই সিপিবিকে তিনি বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক-কৃষক-মজুরের আশা ভরসার স্থলে পরিণত করেছিলেন। মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শোষণ, দুর্নীতি ও অপশাসন থেকে মুক্তির। ‘৮৬-র নির্বাচনে তিনি যখন কমিউনিস্ট পার্টিকে ১০টি আসনে জয়যুক্ত করে সংসদে নিয়ে আসেন, তখন ইত্তেফাক, তখনকার দিনের জনপ্রিয় দৈনিক রিপোর্ট করেছিল- খুব শিগগির বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের ভ্যানগার্ড কমিউনিস্ট পার্টি “জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক” দেবে। এই বিপ্লবের রূপরেখাও তারা তুলে ধরেছিল। সেটা কোনো অলীক কল্পনা ছিল না। এখনকার শিক্ষা মন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহীদ ভাই সেদিন ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি, এবং ফরহাদ ভাই সভাপতি। নাহীদ ভাই সেসব জানেন।

১৯৮৭ সালের ৮ অক্টোবরে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মারা যাবার কয়েক মাস আগে ফরহাদ ভাই এক নীতি নির্ধারণী বক্তৃতা দিয়েছিলেন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে। এই বক্তৃতার ক্যাসেট তখন বিক্রি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাঝে। প্রায় চল্লিশ মিনিটের বক্তৃতা আমি কয়েকবার শুনেছি। তখনই তাগিদ অনুভব করেছিলাম- জাতীয় সংসদের মত জায়গাটি মেধাবী ও দেশপ্রেমিকদের পীঠস্থান হওয়া উচিত। যদি তাই হত, তাহলে ত্রিশ বছরের ব্যবধানে আজ হয়ত আমরা ভীন্ন এক বাংলাদেশকে দেখতে পেতাম।

কমরেড ফরহাদ স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কিছুই রেখে যাবার প্রয়োজন মনে করেননি, একমাত্র তার আদর্শিক জীবনের উদাহরণ ছাড়া। তার স্ত্রী সম্ভবত এখন থাকেন আজিমপুরে সরকারি কলোনিতে, আর একটি ছেলে সমিতকে আমি চিনি, থাকে নিউইয়র্কে। আট-দশ বছর আগে ভাগ্যান্বেষণে এসেছে এই দেশে। স্বাধীনতার পর আমরা হারিয়েছি অনেক কিছুই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আমরা আজ হারাতে বসেছি আমাদের উজ্জ্বল স্মৃতিকেও !!

নিউইয়র্ক ৬ জুলাই ২০১৫