ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

12
১৮৯৫ সালে ভারতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ শুরুর আগের বছর মার্ক টোয়েনের জীবনে কয়েকটি বড় ঘটনা ঘটে যায়। এর একটি- টাইপ রাইটার মেশিনের ব্যবসায় ধরা খেয়ে তাকে ক্ষতি গুণতে হয় সে সময়ের ১ লাখ ডলার, যা বর্তমানের প্রায় ৩০ লাখ ডলারের সমান। নিজেকে দেউলে ঘোষণা করতে হয়। এই ব্যবসায় তার বিনিয়োগ ছিল তিন লাখ ডলার। এছাড়া চার্লস ওয়েবস্টার প্রকাশনা ব্যবসায়ও একই সময় তাকে বিপুল ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। নিজেকে তিনি তখন পরিচয় দিতেন চাল-চুলো হীন ভ্যাগাবন বলে।

আশা করেছিলেন পূর্ব দিগন্তে ভারত, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের সময় বিভিন্ন শহরে বক্তৃতা দিয়ে এবং ভ্রমণ কাহিনী লিখে তিনি যা উপার্জন করবেন, তা দিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারবেন। ভারত ভ্রমণে সে যাত্রায় বক্তৃতা দিয়ে তার আয় হয়েছিল সাড়ে বারো হাজার ডলার। বাকিটা তিনি আয় করেছিলেন দু’বছর পর প্রকাশিত ৭১৮ পৃষ্ঠার ভ্রমণ কাহিনী “ফলোয়িং দ্যা ইকুয়েটর” Following the Equator দিয়ে। ভারতে বোম্বে, দিল্লী, কলকাতা, মাদ্রাজ, দার্জিলিং এবং লাহোরে তিনি বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছেন। তবে এই ভ্রমণ কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই যাত্রায় তিনি আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশকেও অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন।

সেমুয়্যাল ক্লেমেন্স (মার্ক টোয়েনের) জন্ম ১৮৩৫ সালে। তাকে কখনো বলা হয় আমেরিকার “ফাদার অব লিটারেচার” কখনো “প্রফেট অব আমেরিকান লিটারেচার”। জীবদ্দশায় তিনি যাই লিখেছেন, পাঠকরা গিলেছেন গোগ্রাসে। এবং তার লেখনির ভাজে ভাজে সমাজ মনস্কতা এবং তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক পাঠককে আকৃষ্ট করে সহজে। ভারতের তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়াবলীতে তার আগ্রহ ছিল প্রচুর। তার বক্তৃতার অনুষ্ঠান সম্পর্কে সে সময় বোম্বের একটি পত্রিকা মন্তব্য করেছিল- “ব্রিটিশরা দেড়’শ বছরে ভারতকে যতটা চিনেছে, তার চেয়ে ঢের বেশী উপলব্ধি নিয়ে গেছেন মার্ক টোয়েন তার মাত্র কয়েক মাসের ভ্রমণে”। তিনি তার বক্তৃতার অনুষ্ঠান জীবন্ত করে রাখতেন কৌতুক ও শ্রোতার অংশগ্রহণে।

প্রায় এক বছর মেয়াদের ভ্রমণ শেষ হয় ১৮৯৬ সালের জুলাই মাসের শেষার্ধে। নিউইয়র্ক থেকে শুরু করে তার জাহাজ হনুলুলু পৌঁছে আগস্টের শেষ দিকে। সেখানে কলেরা মহামারি দেখা দিলে মার্ক টোয়েন বক্তৃতা না করেই সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ পাল তুলেন প্রশান্ত মহাসাগরে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পৌঁছান অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে। অস্ট্রেলিয়ার ইংলিশ আইন-কানুন দেখে স্তম্ভিত হন টোয়েন। তিনি লেখেন- সামান্য অপরাধে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ অথবা ৭ দিনের কারাবাস হয়, বিশ্বের অন্যপ্রান্তে তা সাত বছর কিংবা ১৪ বছরের। তিনি লেখেন- “২৫ বছর আগে ব্রিটেন ভ্রমণের সময় আমি দেখেছি সামান্য অপরাধে স্ত্রীদের যেখানে ২৫ বেত্রাঘাত করা হত, সেই একই অপরাধে অস্ট্রেলিয়া ও টাসমেনিয়ায় দেয়া হয় ৫০ বেত্রাঘাত। অফিসার অমানবিক হলে বেত্রাঘাতের পরিমান দাঁড়ায় শততে। পুরনো দলিল ঘেটে আমি দেখেছি সামান্য কয়টি চামচ চুরির অপরাধে একজন দাসীকে তিন’শ বেত্রাঘাত করা হয়েছে!”

১৭৭০ সালে ক্যাপ্টেন কুকের অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের পর্ব উল্লেখ করে টোয়েন লিখেন- “আঠারো বছর পর থেকেই ব্রিটেন কয়েদীদের এই দেশটিতে দেশান্তর শুরু করে। এবং পরবর্তী ৫৩ বছরে অস্ট্রেলিয়া ও নিউ সাউথ ওয়েলসে সব মিলে ৮৩ হাজার দণ্ডিতকে দেশান্তরি করা হয়। তাদের খাদ্য নেই, চিকিৎসা নেই, এমন অমানবিক বিচার পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। এই দেশে যেমন প্রত্যেক মানুষের ঘরে ঘরে চার্চের ছড়াছড়ি, তেমনি বর্ণবাদের বাউণ্ডারিও যত্রতত্র।”

২৩ ডিসেম্বর মার্ক টোয়েনের জাহাজ যাত্রা শুরু করে সিডনী থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কার উদ্দেশ্যে। ২০ জানুয়ারি তারা পৌঁছেন বোম্বে। বোম্বে সম্পর্কে লেখেন- “এটি প্রায় দশ লাখ লোকের বিরাট নগরী। চোখে পড়ার মত বেশ কিছু সাদা মানুষ, আর রঙ্গিন পাগড়ি। এটা রঙ্গিন ইন্ডিয়া, সর্বত্রই রঙ্গিন। সব সরকারি ভবনের দরোজায় পাগড়ি বাঁধা নেটিভ চাপরাশি আর ভেতরে সাদা মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করার মত। তা স্বত্বেও এটা ভারত, স্বপ্ন ও প্রেমের ভূমি। সম্পদের যেমন কমতি নেই, দারিদ্রও বেশুমার। দুর্ভিক্ষ ও মহামারির দেশ! দৈত্য ও আলাদীনের চেরাগের দেশ! যেখানে বাঘ, সিংহ আর কোবরায় জঙ্গল পরিপূর্ণ। শত জাতি, শত ভাষা, হাজারো ধর্ম, এবং কুড়ি লক্ষাধিক দেব-দেবীর দেশ! মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের সূতিকাগার। ঐতিহাসিক চরিত্রের মাতামহ, ঐতিহ্যের প্র-পিতামহ এই ভারতভূমি। এই একটি দেশ দেখার ইচ্ছা সকল মানুষের, এবং এটি দেখলে জগতের বাকি অর্ধেক না দেখলেও চলে!

যেখানে যাই, সেখানেই দেখি পাগড়ি মাথায় চাপরাশিরা ছুটে বেড়াচ্ছে নগ্ন পদে। কারো মাথায় বা ফেজ টুপি। এরা কথা বলে জটলা করে। আমি হোটেলটির কক্ষে যাবার সময় এক সাদা লোক এলো অভ্যর্থনা জানাতে, সম্ভবত জার্মান। তিনজন নেটিভ চাপরাশি নিয়ে এসেছে কক্ষের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখার জন্য। এদের পেছনে আবার চৌদ্দ জনের লম্বা লাইন- কারো হাতে স্যুটকেস, র‍্যাপার, ছাতা, ব্যাগ কিংবা বিছানাপত্র। মিছিলের সর্বশেষ ব্যক্তিটির হাতে কোনো ব্যাগ নেই, একটি পাখা। মিছিলের মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত কারো মুখে হাসির স্পর্শ নেই! একজন নেটিভ হাঁটু গেড়ে দরজার ওখানে কি জানি করছিল। সাদা লোকটি কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করেই তার চোপা বরাবর একটি থাপ্পড় দিল। নেটিভটি মাথা নোয়ানো অবস্থায়ই উঠে দাঁড়ালো এবং নীরবে তা মেনে নিল। গত অর্ধ শতকে আমি এমন ঘটনা দেখিনি। ঘটনাটি আমাকে বাল্যকালে নিয়ে গেল, আমেরিকার গৃহযুদ্ধের আগে যখন ক্রীতদাসের প্রতি এমন ঘটনা চোখের সামনে প্রায়ই ঘটত!”

ভারতীয়রা কেন বিদেশি ভগবানকে নিজেদের ভগবান ভাবে না? এমন প্রশ্নের জবাবে মার্ক টোয়েন লেখেন- “দেশে অনেকেই বলেন- খ্রিস্ট ধর্ম কেন ভারতে প্রসার লাভ করে না। তারা জেনে আসছে যে, ভারতীয়রা খুব সহজেই বিশ্বাস করে। প্রাকৃতিক যে কোনো আশ্চর্যজনক ঘটনায় তাদের বিশ্বাস, এবং শুনে খুব মনোযোগে। কাজেই তারা যুক্তি দেখায়- যেহেতু ভারতীয়রা খুব সহজেই বিশ্বাস করে, খ্রীস্ট ধর্মকে তাদের সামনে উপস্থাপন করলেই লুফে নেবে! বাইবেলের আশ্চর্যজনক ঘটনাবলী সত্য হলেও অলৌকিক ঘটনার গল্প তৈরিতে আমরা সফল নই। আমাদের অলৌকিক ঘটনাগুলো মামুলি, হিন্দুদের অলৌকিক ঘটনা আরও আকর্ষণীয়। তাদের ধর্ম পুরোটাই অলৌকিক ঘটনার উপর প্রতিষ্ঠিত। তার উপর মানুষ ধর্মের ব্যাপারে সব সময় শক্তিমান দেবতাকেই খুঁজে। হিন্দু ধর্মের দেবতারা আমাদের দেবতার চেয়ে অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী!” উদাহরণ স্বরূপ তিনি হনুমানের প্রসঙ্গ টানেন। লঙ্কা থেকে সীতা উদ্ধারে হনুমানের শক্তিমত্তার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন- “আমরা কি কেবল এই একটি হনুমানের মত কোনো ভগবান তৈরি করতে পেরেছি?”

যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিম দিগন্তে কাক যে একেবারেই নেই, তা নয়। কিন্তু চোখে পরে কালেভদ্রে। এই ভারতীয় কাক সম্পর্কেও লিখেছেন টোয়েন। তিনি লেখেন- “এরা আবার চলে এসেছে। এরা শক্ত পালকে আবৃত। সর্বদা কলরব মুখর। একটুখানি স্থির হতে চায় না। যেন স্থির হয়ে চিন্তা করলেই বক্তৃতা দেয়ার সময় ফুরিয়ে যাবে! আমি যতই সরে বসি ততই কাছাকাছি আসে, একা নয়, দল বেঁধে। আর কিছুই ফেলনা থাকতে দেয় না! এই কাকেদের দলে আছে জুয়ারি, কমেডিয়ান, ব্ল্যাকগার্ড, চোর-বাটপার, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, অধ্যাপক সবাই। সব সময় নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে এরা উদগ্রীব! নীচু স্বরে নয়, যতটা শক্তিতে কুলায় উচ্চৈঃস্বরে। আমার ধারণা মানুষের মধ্যে এদের কোনো শত্রু নেই। সাদা, মুসলমান এবং হিন্দু তো বটেই, সম্ভবত এদের হত্যা করাটাকে পাপ মনে করে। অথচ বাঘ, সিংহ, কুকুর বেড়াল, এমনকি সাপ মারায়ও এদের জুড়ি নেই। আমি ব্যালকোনির একমাথায় হয়ত বসলাম। তারা আরেক পাশে এসে বসল। একটি দু’টি করে কয়েক জন আমার কাছাকাছি চলে এসে আমাকে নানা প্রশ্ন করতে শুরু করল। এদের ভয়ডর বলতে কিছুই নেই। তাই এদের সংখ্যা ভারতে অগুণতি।”

ভারতীয়রা সাদা চামড়াকে কেন এতো সমীহ করে, এর কারন সম্পর্কে টোয়েন বলেন- “এক ধরণের ছিটগ্রস্থতা চোখে পরে, তা হলো সাদা চামড়ার প্রতি অধিক মনোযোগ, এমন কি এ ব্যাপারে প্রচারণাও আছে। ভারতীয়রা মনে করে রঙ ফর্সা = সৌন্দর্য। সম্ভবত কোনো ভারতীয় মা-ই চান না যে তার কন্যা কখনো রোদে যাক। সাগর পাড়ি দেয়ার সময় প্রয়োজনে তারা কফিনে আশ্রয় নেবে, তবু রোদে দাঁড়াবে না। আমার দেখা মতে প্রায় সব কালো ও বাদামী চামড়া দেখতে খুব সুন্দর। কিন্তু এমন সাদা চামড়ার মানুষ পাওয়া কঠিন, যার চামড়া মসৃণ ও দাগ বিহীন। অথচ ভারতীয়রা মনে করে সাদা চামড়ার মানুষ ব্লিচিং ধোয়া।

সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন সম্পর্কেও বলেছেন টোয়েন। তিনি লেখেন- আমি সেখানে থাকা অবস্থায় কিছু ভাল মনের ইউরোপীয় পেয়েছি, যারা জেনানাদের (মহিলা) জন্য নগরীতে পৃথক পার্ক স্থাপনের কথা বলেছিলেন। এতে করে পার্কে তারা পর্দা থেকে বের হয়ে, উন্মুক্ত আলো হাওয়ায় অবগাহনের সুযোগ পাবে, এবং তাদের নিজস্বতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। কিন্তু এই ধারণা বাতিল হলো নেটিভ মহিলাদেরই বাধার কারনেব। নেটিভ মহিলারা মনে করলো এতে করে ইউরোপীয় মহিলারা স্বল্প বসনে পার্কে আসার সুযোগ পাবে। সন্দেহ না থাকলে যে কোনো ভাল উদ্যোগই প্রশংসনীয়। আমি ভাল উদ্যোগের কথা এ কারনে বললাম যে পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ আইন আছে, আর সে সব প্রয়োগের জন্য আছে লক্ষ লক্ষ মানদণ্ড। মহৎ উদ্যোগ না থাকলে কোনো আইনই কার্যকর হয় না।

মার্ক টোয়েনের এই ভ্রমণ কাহিনী আমেরিকায় কলম্বাস আগমণের প্রায় তিন শতাধিক বছর পরের ঘটনা। কিন্তু মার্ক টোয়েনের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ভারত সম্পর্কে প্রথম ধারণা লাভ করে। ভারতের নিজস্বতা এখনো আমেরিকাবাসীর কাছে আকর্ষণের, একই সঙ্গে এর দরিদ্রতা উদ্বেগের। কিন্তু আমেরিকার মানুষ ভারতকে ভালবাসে একটি বিস্ময়কর দেশ হিসেবেই। গ্যালাপ পুলের ২০১৫ সালের জরিপে ভারত আমেরিকাবাসির পছন্দের তালি্কায় পঞ্চম। ৭১ শতাংশ মানুষ ভারতের পক্ষে অনুকূল মতামত দিয়েছেন।

***

নিউইয়র্ক, ১০ জুলাই ২০১৫