ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

……………………
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন দেশটির ভুঁইফোড় রাজনীতিকরা অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন, তখন যে কারো মনে হতে পারে- হয়ত আসলেই বিপদে আছে দেশটির মুসলমানেরা। আসলে কি তাই? যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানেরা কি আসলেই অনাহুত? যারা খোঁজ খবর রাখেন তারা জানেন- পিউ রিসার্চের গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হল ইসলাম। মুসলমানেরা সংখ্যায় বাড়ছে যে কোনো ধর্মালম্বীর চেয়ে দ্রুততার সঙ্গে। গত সাত বছরে খ্রীস্টান ধর্মালম্বীর সংখ্যা ঋণাত্মক (-৭.৮), ইহুদী ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা একই আছে, সেই তুলনায় মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে .৫ শতাংশ হারে। মুসলমানের পরেই আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রায় .৩ শতাংশ হারে। মুসলমানেরা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ- অর্থাৎ ত্রিশ লাখ বা তারও বেশি।

নিউইয়র্ক নগরীর মুসলমানকে দেখার জন্য মোটেও বেগ পেতে হয় না। নগরীর ট্রাফিক পুলিশের চল্লিশ শতাংশ মুসলমান, এঁদের বৃহৎ একটি অংশ আবার বাংলাদেশী আমেরিকান। বর্তমানে শিক্ষিত বাংলাদেশীরা বিপুল সংখ্যায় পুলিশ এবং ট্রাফিক পুলিশের চাকরিতে ঢুকছেন। আগে যেখানে আগত বাংলাদেশিরা প্রথমেই ক্যাণ্ডি দোকান, ফুটপাতে পত্রিকা বেচা, ইয়েলো ক্যাব কিংবা রাস্তার পাশের ফলের দোকানে অথবা রেস্টুরেন্টে সার্ভারের চাকরি নিতেন, এখন আর সে দিন নেই। তাও বলা যায়- এখনো নগরীর পচানব্বই ভাগ ফুড ভেন্ডরের মালিক অভিবাসী মুসলমান। এসব ফুড কার্টের উপরে ফলাও করে ঝুলছে ‘হালাল ফুড’। আর এসবের বেশিরভাগের মালিক মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা- মিশর, ইরান, ইরাক, ইয়েমেন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, আরব, পাকিস্তানী অভিবাসী। ফলের কার্ট ছাড়াও বেশ কিছু ফুড ভেন্ডরের মালিক বাংলাদেশী। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা বেশ কিছু ডেলি-গ্রোসারি পরিচালনা করেন নিউইয়র্ক নগরীর সর্বত্র।

নিউইয়র্ক নগরীতে মুসলমানরা দাপটের সঙ্গে আরেকটি পেশায় অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। সেটি হল ইয়েলো ক্যাব। ক্যাবি’দের অন্তত নব্বই ভাগ মুসলমান। এরা আফ্রিকার ইথিওপিয়া, মৌরিতানিয়া, ঘানা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া ইত্যাদি এবং এশিয়ায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ইত্যাদি দেশ থেকে এসেছেন। মোট কথা- যেকোনো দেশের ভ্রমণকারী নিউইয়র্ক নগরীতে এসে পাঁচজন মানুষের সেবা নিলে এঁদের অন্তত দু’জন হবেন মুসলমান। আবার এই দু’জনের অন্তত একজন হবেন বাংলাদেশী। আমেরিকা যেমন মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখে টিকে থাকতে পারবে না, তেমনি মুসলমানরাও বসবাসের জন্য আমেরিকার চেয়ে ভাল দেশ পৃথিবীতে আর খুঁজে পাবে না। নাইন-এলিভেন পরবর্তি গত চৌদ্দ বছরে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়- যুক্তারস্ট্র তার প্রতিষ্ঠাকালীন সবার জন্য সমান সুযোগ এবং বৈষম্যহীন মুক্ত জীবনের বাণী থেকে এক চুল সরে যায়নি। যদিও কট্টরপন্থী রাজনীতিকরা নাগরিকদের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করুক।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে দশ হাজারের বেশি মুসলিম আমেরিকান কর্মরত আছেন, এবং এই সংখ্যা যে কোনো অমুসলিম দেশের চেয়ে বেশি। বহু মুসলমান সৈন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব ক’টি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্রাণ দিয়েছেন। অন্যান্য অভিবাসীর মত মুসলমানেরাও বহু কস্ট করে এদেশে এসে তাদের ভাগ্য গড়ার প্রয়াসে লিপ্ত। তাই যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি এদেশে অবস্থানরত মুসলমানদেরও সমান শ্রদ্ধা ও অঙ্গীকার।

ঐতিহাসিকরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন- গত তিন শ’ বছর ধরে মুসলমানেরা আমেরিকান সমাজের অংশ। আফ্রিকা থেকে যেসব ক্রীতদাস যুক্তরাষ্ট্রে আনা হত তাদের অন্তত পঁচিশ ভাগ ছিল মুসলমান। যদিও তাদের অধিকাংশের নাম এবং ধর্ম পরিবর্তন করা হত জোরপূর্বক ‘প্ল্যান্টেশন’ মালিকদের ইচ্ছানুসারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যখন ব্রিটিশের কলোনি ছিল, তখনও মুসলমান নাবিক, ব্যবসায়ী এবং ভ্রমণকারীর আগমণ ঘটত এই দেশে। শুধু তাই নয়, আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা রাজনীতিক জন এডামস, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, আলেক্সাণ্ডার হ্যামিল্টন, জর্জ ওয়াশিংটন প্রমুখ মুসলমানদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতেন। এবং তাদের ঘরে, নিজস্ব পাঠাগারেও কোরআনের সংগ্রহ ছিল। এমন একটি কোরআনের সঙ্কলন সংগৃহীত আছে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে, যার সংগ্রাহক ছিলেন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন (১৭৪৩-১৮২৬)। ২০০৭ সালে কেইথ এলিসন নামের প্রথম আমেরিকান মুসলমান কংগ্রেসম্যান কোরআনের এই সঙ্কলনটি স্পর্শ করেই ক্যাপিটল হীলে শপথ নিয়েছিলেন।

১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকা স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বিশ্বে প্রথম যে দেশটি স্বীকৃতি দেয় সেটিও ছিল মুসলিম দেশ- মরক্কো। “And the rockets’ red glare, the bomb bursting in air” বলে যে কথাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতে উতকীর্ণ আছে, তারো প্রাযুক্তিক সফলতা দেখিয়েছিলেন ভারতের মহীশুরের রাজাধীরাজ টিপু সুলতান ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। পরবর্তিতে আমেরিকান নৌবাহিনী একই কায়দায় এর ব্যবহার করে বিভিন্ন যুদ্ধে। এবং এটিকে নৌবাহিনীর সঙ্গীত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

আমেরিকার মুসলমানদের তিন ভাগে ভাগ করা চলে- একঃ অভিবাসী মুসলিম, জন্মগত আমেরিকান মুসলিম এবং ধর্মান্তরিত মুসলিম। সম্প্রতি যে পাকিস্তানী মুসলিম দম্পতি সার্নবার্ডিনো হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, এরা জন্মসূত্রেই আমেরিকান। পিউ রিসার্চের একটি গবেষণা (২০১১) বলছে- যুক্তরাস্ট্রে অবস্থানরত মুসলমানদের মাত্র দুই শতাংশ আল কায়দা, এবং ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সমর্থন দেন। অবশ্য বাদবাকি আমেরিকানের প্রতি তিন জনের একজন মনে করেন মুসলমানেরা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। নাইন এলিভেনের কারনেই তারা এমনটা মনে করেন বলে জানিয়েছেন। গত মাসে সার্নবার্ডিনো হত্যাকাণ্ডের পর কত শতাংশ আমেরিকান এখন মুসলমানদের ব্যাপারে এমন ধারণা পোষণ করেন তা এখনো জানা যায়নি।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ আল-কোরআন পরধর্মের প্রতি সহিংসতা সমর্থন করে কিনা? কোরআনের পঞ্চম পারার ৩২ নম্বর আয়াতে আছে- “….if anyone killed a person, it would be as if he killed the whole of mankind; and if anyone saved a life, it would be as if he saved the life of the whole amnkind….”

পরিশেষে নিজের একটি অভিজ্ঞতা বলে এ লেখার সমাপ্তি টানতে চাই- সম্প্রতি আমি নিউইয়র্কের তিনজন সাধারণ নাগরিককে প্রশ্ন করেছিলাম “হালাল ফুড” বিষয়ে। আমার প্রশ্ন ছিল- ওই যে ফুড ভেন্ডরের গায়ে “হালাল ফুড” লেখা আছে সে সম্পর্কে তুমি কি জানো? একজন হিস্পানিক মহিলা উত্তর দিল- “ইট ইজ ভেরি গুড, বিকজ, হোয়েন দে কিল এনিমেল, দে কিল্ড ইট ভেরি নাইস এণ্ড জেন্টলি, সো এনিমেল ডাজনট গেট এংরি।” একজন ভারতীয় গুজরাটি পুরুষকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল- “দ্যা মেথড মুসলিম প্র্যাকটিসিং ইজ গুড ফর হ্যালথ, বিকজ হোয়েন দে কিল এনিমেল, অল দ্যা ব্লাড কেইম আউট, এট দ্যা সেইম টাইম অল জার্ম গেট আউট ফ্রম দ্যা এনিমেল মিট।” অপরদিকে একজন সাদা ককেশিয়ান (ইউরোপিয়ান)কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে সে বলল- “আই ডিড নট কেয়ার এবাউট দ্যাট, ইফ ইট ইজ ডেলিশিয়াস, গুড টু ইট (eat)।” বলাবাহুল্য, নিউইয়র্কের ৯৫ ভাগ ফুড কার্টের বাইরেই লেখা আছে “হালাল”। আর এসবের কয়েক হাজার পরিচালনাকারী মুসলমান স্বাধীন ও সচ্ছলতার সঙ্গে তাদের জীবন অতিবাহিত করছেন।

নিউইয়র্ক, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫

ছবিঃ আমাদের এলাকার মসজিদ আল-নূর এবং নিউইয়র্কের একটি হালাল ফুড ভেন্ডর