ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

যে জাতির হাতিয়ার (প্রযুক্তি) যত বেশি ধারালো (কার্যকর), অন্য জাতিগোষ্ঠীর উপর তার কর্তৃত্ব তত শক্তিশালী। সভ্যতার ইতিহাসে এরচেয়ে বড় ও নির্মম সত্য বোধ হয় আর কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রে এসে আইবিএম-এর সিরামিক চিপস উৎপাদন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উপলব্ধি করেছিলাম এই জনপদের লোকেরা প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে কতোটা নিবেদিত! যে রোবোটিক মেশিনগুলো চিপস তৈরি করত, এক সময় সেগুলোও বাতিল হলো, এলো আরো উন্নত সেমাই কন্ডাক্টর।

1
প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও চায়না সামিল হল। এই একই চিপস কম্পিউটার, মোবাইল, টিভি থেকে শুরু করে গেমিং এবং খেলনাপাতিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। দিনে দিনে সব ইলেক্ট্রনিক পণ্যই আজ মানুষের হাতের নাগালে। বছর বিশেক আগেও বাংলাদেশে যে মোবাইল ফোন ছিল বিত্তবানের আভিজাত্যের প্রকাশ, আজ তা দরিদ্র দিনমজুরের বেঁচে থাকার অবলম্বন। আমাদের জীবদ্দশায় চোখে দেখা এক চরম সত্য।
নিউইয়র্ক নগরী আমাদের আধুনিক জীবন যাপনে বহু আবিষ্কারের নীরব সাক্ষ্মী। গ্রাহাম বেলের টেলিফোন, কিংবা স্যামুয়েল মোর্সের টেলিগ্রাফ। পৃথিবীর প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলেছিল এই নিউইয়র্কেই। এর জনক ছিলেন টমাস আলভা এডিসন। সেদিন নিউজার্সিতে আবিষ্কার করলাম এডিসন টাউনশিপের। কারন সেখানের মেনলো পার্ক এলাকায় এডিসনের মূল গবেষণাগার ছিল। ১৮৭০ সালে এই শহরের গোড়াপত্তন। কিন্তু এডিসনের নামে এটি উৎসর্গ করা হয় ১৯৫৪ সালে। আর নিউইয়র্কে প্রথম এডিসনের বানিজ্যিক বাতি জ্বলেছিল ১৮৮২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর লোয়ার ম্যানহাটনের পার্ল ষ্ট্রীটে। বর্তমানে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ওয়াল স্ট্রীট গড়ে উঠেছে এর আশেপাশেই।
বলছিলাম আবিষ্কারের কথা। আমরা কেবল আবিষ্কারকের নাম জানি। কিন্তু আবিষ্কারের পেছনে যে শত শত মানুষের শত বছরের প্রচেস্টা, সে ইতিহাস আমরা কেউ রাখতে চাই না। বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের আগেও মানুষ আলো জ্বালিয়ে আঁধার নিবারণ করত। সেগুলো ছিল তেল অথবা গ্যাসের। নিউইয়র্ক নগরীতেও তখন সাতটি কোম্পানি গ্যাসের বাতি নির্মাণ করত, এবং সেগুলোর মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা। গ্যাসের বাতি ছিল অনিরাপদ এবং একটি কোম্পানি ওপর কোম্পানির বাতিতে আগুণ জ্বালিয়ে প্রমাণ করত নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব। নগরীর মানুষ তাই এঁদের নাম দিয়েছিল “গ্যাস গ্যাং”।
এডিসন থেমে থাকেননি, সেটিই ছিল ইতিহাস তাকে অমর করে রাখার কৃতিত্ব। একদল গবেষণা কর্মী নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করেছেন। কপার, প্লাটিনাম কিছুতেই বাতির আয়ু সাড়ে তের ঘন্টার বেশি করতে পারেন না। অবশেষে ১৮৮০ সালের শুরুতেই তিনি ঘোষণা দিলেন যে, তিনি এমন একটি ‘কার্বনাইজড বাম্বো ফিলামেন্ট’ উদ্ভাবন করেছেন যা দিয়ে বাতি জ্বালানো যাবে ১২০০ ঘণ্টারও বেশি। তখনই তিনি কন এডিসন কোম্পানি গঠন করেন, যে কোম্পানিটি আজো নিউইয়র্ক নগরীতে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে চলেছে। আজকাল বাজারে পাওয়ার সেভিং বাল্ব কোনো কোনোটি দশ হাজার ঘন্টাও চলে নির্বিঘ্নে। এমনকি এলইডি বাল্ব খুব দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে প্রচলিত এডিসন বাতির।

23
মানুষের আবিষ্কারের পেছনে মূল শক্তি প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি। এডিসন যেমন বলেন- “I find out what the world needs. Then I go ahead and try to invent it.” তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী, পাশাপাশি বড় একজন উদ্যোক্তা। গবেষণা কাজে সম্পদের লভ্যতা ছিল তার। এটি আজ আর অজানা নয়- এডিসনের গবেষক টীমের আফ্রিকান আমেরিকান Lewis Howard Latimer (1848-1928) ছিলেন এই বৈদ্যুতিক বাতির মূল গবেষক। কিন্তু অনুসন্ধিৎসু পাঠক ছাড়া এটি কেউ জানেন না। কারন বৈদ্যুতিক বাতির প্যাটেন্ট রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল এডিসনের নামেই। এডিসন নিজেই স্বীকার করেছেন তার গবেষক দল ছিলেন বেতন ভোগী। কিন্তু বেতনের বাইরেও তারা গবেষণা কাজে বেহিসেবী সময় দিতেন। কিন্তু ইতিহাস সে সব বিজ্ঞানীর আত্ম নিবেদনের সামান্যই জ্ঞাত!
আমাদের বাংলাদেশেও অভাবক্লিস্ট অনেক প্রতিভা জন্ম নেয়। কিন্তু তাদের প্রতিভা আলোর মুখ দেখে না। কিংবা খুব অল্প দামে সে প্রতিভা বিক্রি হয়ে যায় কর্পোরেটের কাছে। অ্যাপেলের জনক স্টীভ জবস একজন অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞানী যেমন ছিলেন, তার চেয়ে বড় ছিলেন একজন উদ্যোক্তা। এডিসনের আমল থেকেই আমরা দেখি নিরলস বিজ্ঞানীর চেয়ে উদ্যোক্তা বিজ্ঞানী বেশি কার্যকর। যিনি গবেষকের সমাবেশ যেমন ঘটাবেন, তেমনি সমাবেশ ঘটাবেন পূঁজির। ‘ক্যাপিটাল’ ছাড়া কোনো গবেষণাই বাণিজ্যক ভিত্তি পায় না। তবে সবার আগে প্রয়োজন ‘প্রতিভা’র প্রতিপালন। যে সমাজ প্রতিভাকে প্রতিপালন করতে পারে, সে সমাজই হয় সভ্যতার দিক নির্দেশক। বাংলাদেশে আজ প্রতিভার প্রতিপালন জরুরি।
শুরুতে বলেছিলাম নিউজার্সির এডিসন মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের কথা। এটি সেই ছোট্ট শহর এডিসনে। সেখানে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক বাল্ব। সেটি মিউজিয়াম পার্কের একটি স্তম্ভের উপর। যা নির্মাণ করা হয় ১৯৩৮ সালে এডিসনের কীর্তির কথা স্মরণ করে। এই স্তম্ভটির স্থলেই এডিসন ১৮৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁর বৈদ্যুতিক বাল্বের কথা প্রথম বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন। স্তম্ভটি ১১৮ ফুট উঁচু। কিন্তু বৈদ্যুতিক বাল্বটি এখন আর এডিসনের ফিলামেন্ট বাল্ব নয়, সময়ের তালে এটি এখন এলইডি বাল্বে পরিবর্তিত হয়েছে।
বিদ্যুতের প্রতি আমার দুর্বলতা থেকেই এ লেখার জন্ম। আমার জীবনের প্রথম বিস্ময়- স্বাধীনতার পর আমাদের ছোট্ট হবিগঞ্জ শহরের বাড়িতে প্রথম যখন বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলল। ২০০১ সালে দেশ ছাড়ার আগে পিডিবি, ডেশা, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ঘুরে রিপোর্ট করেছিলাম- দেশের মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষ বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে পারেন। আজ সেটি ৭০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এরচেয়ে বড় বিস্ময় আর কী হতে পারে? অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের হার বাড়ার সঙ্গে এটিও কম বড় অর্জন নয়!
ছবিঃ এডিসন টাওয়ারে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক বাল্ব।