ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

গত কুড়ি বছর ধরে ‘ঘন তান্ত্রিক’ রাজনৈতিক উত্তেজনায় আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের প্রিয় কিছু মানুষের মুখ। আলোচনা-সমালোচনা, ঘৃণা-বিদ্বেষ, হতাশা-ক্ষোভ, আশা-নিরাশায় ক্ষমতা-লোভী কয়েকটি রাজনৈতিক দল আর স্বার্থোন্মাদ তাদের নেতা-নেত্রীরা আমাদের মগজের কোষগুলোকে পরিণত করেছে বদ্ধ জলাশয়ে। এবং স্বার্থের এই সংক্রমিত উত্তেজনা আমাদের মধ্যেও তৈরি করেছে বিভক্তির ছায়াপথ। জ্ঞানী ও গুণী বিচারের আগে আমরা খুঁজে ফিরি কে কোন দলের! অথচ এই আকালেও আমাদের মধ্যে, চারপাশে এমন কিছু মানুষ ছিলেন এবং আছেন যাদের নিরহঙ্কার জীবন আর কর্তব্য নিষ্ঠা হতে পারে আর সকলের জন্য অনুপ্রেরণার। মোনাজাত উদ্দীন আর নাজিম উদ্দীন মোস্তান আমার দেখা সে দলের মানুষ। যারা প্রদীপ জ্বালিয়ে গেছেন মানব হিতৈষি সৎ সাংবাদিকতার।

মোনাজাত উদ্দীন

মোনাজাত ভাই’র রিপোর্টের সঙ্গে আমার পরিচয় দৈনিক সংবাদে। এরশাদ আমলে ‘পথ থেকে পথে’ উত্তর বঙ্গের মঙ্গার রিপোর্ট সৃষ্টি করেছিল তুমুল আলোড়নের। রিপোর্ট প্রকাশের পর-পর এরশাদ স্বয়ং ছুটে যায় মঙ্গা পীড়িত অঞ্চলে। সারা বাংলাদেশের মানুষ বাড়িয়ে দিয়েছিল সাহায্যের হাত। কিন্তু মোনাজাত ভাই’র সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আরো পরে। ১৯৯৩ সালের শেষ দিকে বাংলাবাজার পত্রিকা থেকে আমার সরেজমিন রিপোর্টের এ্যাসাইনমেন্ট ছিল উত্তরবঙ্গে মঙ্গা কভার করার।

সময়টা আশ্বিন-কার্ত্তিক মাস, ৭৫ ভাগ মানুষের কাজ থাকে না। উপোসে আর পুষ্ঠিহীনতায় মানুষের শরীরের প্রতিটি হাড় গোণা যায়! কচু সেদ্ধ, কিংবা বড়জোর মিস্টি আলু পুড়িয়ে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণ। নিলফামারি, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া সেরকমের চিরবঞ্চিত এলাকা। আমি যখন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতে যাই, চোখ তুলে তাকাতে পারি না। একি নিরন্ন বঞ্চিতের হাহাকার! শোনার বুঝি কেউ নেই! মোনাজাত ভাই তাদের কথা তুলে ধরতেন দেশবাসী আর পরিকল্পনাবিদদের চোখের সামনে।

আমি এক সপ্তাহ ছিলাম বগুড়ায় হোটেলে, আকবরিয়া রেস্টুরেন্টের পাশে। আহার সারতাম সে রেস্টুরেন্টেই। গ্রাম-গঞ্জ ঘুরে বিকেলে ফ্যাক্সে রিপোর্ট পাঠাতে যেতাম হাসিবুর রহমান বিলু ভাই’র ফোন-ফ্যাক্স-এর দোকান এবং একই সঙ্গে সংবাদ অফিসে। এক বিকেলে সেখানে হাজির মোনাজাত ভাই। কাঁদে ব্যাগ ঝোলানো, মনে হলো মোনাজাত ভাই নিজেই এক জীবন্ত রিপোর্ট। পরিচয়ের পর জিজ্ঞেস করলাম আমার রিপোর্ট পড়েন কি-না। উত্তরে বল্লেন, সবই পড়ি। একজন বড় মাপের সাংবাদিক হলেও কোন উন্নাসিকতা নেই। রিপোর্ট পাঠানোর পর সন্ধ্যের দিকে প্রস্তাব দিলেন বাজারের গলিতে সেদ্ধ ডিম খাওয়ার। গরম-গরম চারটে মুরগীর ডিম খেলেন। আমি খেলাম দু’টো। চারটে ডিম খাওয়ার পেছনে রহস্য কি জানতে চাইলে বল্লেন- আজ ভাবীর সঙ্গে বুল ফাইট হবে। তার এই নির্ভেজাল রসাত্মক উত্তরের মধ্য দিয়ে আমাদের ডিম খাওয়ার আসরে সমাপ্তি টানতে হলো। কিন্তু মোনাজাত ভাইকে কোনদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি তার পরিবার পরিজন আসলে কোথায় থাকেন। আমার সবসময় মনে হতো তিনি সারা বাংলাদেশের, সকল মানুষের।

বগুড়ায় থাকার সময়েই বড় একটি ট্রেন দূর্ঘটনা হলো হিলিতে। দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন মানুষের মৃত্যু, আহত কমপক্ষে দুই শতাধিক। আমরা একটি মিনি ভ্যানে চড়ে গেলাম রিপোর্ট সংগ্রহ করতে। এখানেও সংগঠক এবং নেতা মোনাজাত ভাই। ফেরার পথে দুপুর গড়িয়ে গেল। গাড়ি থামালেন জয়পুর হাটের সংবাদ প্রতিনিধি আমিনুল ভাইয়ের বাড়িতে। আমিনুল ভাইয়ের স্ত্রী ঝটপট রান্নার আয়োজন করলেন ড্রাইভারসহ সাত জন মানুষের। আশ্চর্য হয়েছিলাম মোনাজাত ভাইর কাণ্ড দেখে! বলা নেই, কওয়া নেই এভাবে হুট করে আতিথেয়তা গ্রহণের মতো হৃদয়ের প্রসারতা কেবল মোনাজাত ভাই’রই আছে!

পরের বছর মন্দা কভার করতে গিয়েছিলাম কুড়িগ্রাম, লালমনির হাটে। সঙ্গে ছিলেন ফটো সাংবাদিক কাজল হাজরা। সে-কি রোদে-বৃষ্টিতে ভিজে চিলমারির পথে রিক্সা ভ্যানে চড়ে জনপদে ঘুরে বেড়ানো! বিকেলে রংপুর প্রেসক্লাবে গেলে সেখানেও দেখা হয় চারন সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের সঙ্গে। এক দুপুরে প্রস্তাব দিলেন- চলুন তিনবিঘা কড়িডোরের ওপর রিপোর্ট করে আসি। রংপুরের রশিদ বাবু ভাইকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ রওয়ানা পাটগ্রামের উদ্দেশ্যে। আমরা যখন তিনবিঘা করিডোরে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। শেষবারের মতো ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী খুলে দেবে করিডোরের গেট। মোনাজাত ভাই ছবি তুললেন।

১৯৯৫ সালের শীতের এক সকালে ঢাকায় হঠাৎ খবর পেলাম মোনাজাত ভাই আর নেই। আরিচায় ফেরীর তিনতলায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সময় পা ফসকে পড়ে গেছেন যমুনার কালো জলে। কাজ পাগল এই মানুষটির সঙ্গে আর দেখা হওয়ার কোন সুযোগ নেই! মোনাজাত ভাই লিখে গেছেন অন্তত বারোটি বই। পেয়েছেন স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের অশেষ সম্মান। ৫১ বছর বয়সে মারা যান। বেঁচে থাকলে আজ হয়তো মোনাজাত ভাই থাকতেন ৬৬ বছরের এক কাজ পাগল তরুন!

নাজিম উদ্দীন মোস্তান

১৯৯৫ সালের শেষ দিকে আমি কয়েক মাসের জন্য স্বেচ্ছায় চাকরি বাদ দিয়ে একটি নিউজ সার্ভিস চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। শুরু হয়েছিল পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নীতিগত বিরোধ। ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিকতার প্রথম স্বাদ! উদ্দেশ্য ঢাকার বাইরের কাগজগুলোকে নিউজ-রিপোর্ট ফিড করা। ঢাকায় ইন্টারনেট চালু হলেও বাইরে নেই। তবে ফ্যাক্স সার্ভস চালু হয়েছে। সিলেট, রাজশাহী আর চট্টগ্রামের তিনটি দৈনিক কাগজে প্রধান-প্রধান ঘটনাবলীর রিপোর্ট পাঠাই। দীনেশ, শামীমসহ কয়েক জন বন্ধু আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু মাস শেষে পত্রিকার মালিকদের কাছে টাকা চাইতে গেলে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। একমাত্র সিলেটের দৈনিক যুগভেরীর সম্পাদক হেরল্ড রশিদের কাছ থেকে পেয়েছিলাম চার হাজার টাকা, অর্থাৎ চুক্তির প্রায় পুরোটাই। কিন্তু বাকিদের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় প্রকল্পটি বাতিল করতে হলো মাসেক দুয়েকের মধ্যে। সেই আর্থিক সঙ্কটের দিনে হঠাৎ হন্ত-দন্ত হয়ে নাজিম ভাই উপস্থিত আমাদের অফিস, অর্থাৎ ডেল্টা নিউজ এণ্ড মিডিয়ার ধানমণ্ডি ২ নম্বর সড়কের মোড়ে দোতলার অফিসে। দৈনিক ইত্তেফাকের কাজের বাইরে একটি সাপ্তাহিক বের করতেন, নাম ছিল ‘রাষ্ট্র’। বললেন, জহির আপনি চাইলে আমার কাগজে লিখতে পারেন। আমি বললাম আপনার কাগজের ঠিকানা কোথায়? বললেন, কেন আমার বাসায়? সোবহান বাগে মোস্তান ভাই’র ভাড়া বাসার বসবার ঘরটি চার-পাঁচটি ডেস্কটপে সাজানো। তার সন্তানরাই পত্রিকার কম্পোজার। ফেরার পথে আমাকে পাঁচশো টাকার একটি নোট জোরে পকেটে গুজিয়ে দিয়ে বল্লেন- আপনার লেখার আগাম টাকা। আমি থ! আমার লেখার মূল্য এতো? বড়জোর দু’শ থেকে তিন’শ টাকা। পাঁচ’শ টাকার লিখিয়ে কখনো ছিলাম না। যা হোক তখন লিখেছিলাম নিয়মিত রাষ্ট্র সাপ্তাহিকে।

পত্রিকার নামে হয়তো খটকা লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশকে একটি সাবালক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য মেধা ও চিন্তার সন্নিবেশ ছিল সে পত্রিকাটিতে। রাষ্ট্রের অত্যন্ত ভেতরকার খবরে ঠাসা থাকতো পত্রিকাটি। যদিও এর অঙ্গ সৌষ্টব ততটা ছিল না, কিন্তু তাতে কী। পড়তে বসলে মনে হতো প্রতিটি সংবাদই অত্যন্ত জরুরি এবং পাঠযোগ্য।

ইত্তেফাক থেকে বিএনপি বিট কভার করতেন মোস্তান ভাই, আর বাংলাবাজার পত্রিকা থেকে আমি। ১৯৯২ সালের অক্টোবর মাসে সম্ভবত, বিএনপির অভ্যন্তরীণ সভা হবে তখনকার একমাত্র কার্যালয় ডাউন টাউন ঢাকার নয়াবাজারে। আমি সবার আগে মিটিং-এ পৌঁছি, মোস্তান ভাই আমার পরে। ইনকিলাবের আব্দুল্লাহ আরো পরে। জেনারেল শওকতের সভাপতিত্বে মিটিংয়ে খালেদা জিয়াও উপস্থিত। সম্ভবত আলাল অথবা ঢাকা মহানগরীর প্রচার সম্পাদক কেউ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন- ‘নির্বাচনের পর আমাদেরকে কলার খোসার মতো ছুঁড়ে ফেলা হয়’। এটাই হয়ে যায় পুরো মিটিং-এর টোন। সেটাই শিরোনাম হয়ে আসে সংবাদপত্রে। আরেকবার মোস্তান ভাই’র সঙ্গে আমারও এ্যাসাইনমেন্ট পড়লো জাতীয় পর্যায়ের রবীন্দ্র উৎসব শিলাইদহে। সম্ভবত ১৯৯৪ সালে, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া উদ্ভোধন করলেন উৎসব। তখনকার পাবনার সংবাদদাতা অঞ্জন রায়ও ছিলেন এ্যাসাইনমেন্টর বাইরের আড্ডাগুলোতে (এখন কাজ করেন একুশে টিভিতে)।

ইত্তেফাকে প্রুফ রিডিংয়ের কাজ থেকে শুরু করে চীফ রিপোর্টার পর্যন্ত হয়েছিলেন মোস্তান ভাই। এই নিরন্তর কাজের ফাঁকে দুটো বিষয়ে মাস্টার্সও করেছেন। শুনেছি তিনি চীফ রিপোর্টার হওয়ার পর রিপোর্টাররা তার বিরুদ্ধে কলম বিরতিও চালিয়েছিলেন। এর কারন ছিল সম্ভবত মোস্তান ভাই’র স্বচ্ছতা এবং আপোষহীনতা। নিউজ-রিপোর্টের গভীরতা এবং গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে প্রশ্নাতীত। এটাই ছিল মোস্তান ভাইর নীতি। বাংলাদেশের আর্থ-সামজিক অগ্রগতি, বিশেষত কম্পিউটার প্রযুক্তির বিকাশে মোস্তান ভাই-র ভূমিকা ছিল অবিসংবাদিত। কম্পিউটার প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং সম্ভাবনার খবরাদি তিনিই প্রথম তুলে ধরা শুরু করেন জাতীয় পত্রিকায়। নব্বইয়ের দশকে উচ্চ প্রযুক্তির রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে পুরো ভারত উপমহাদেশে সম্ভবত তিনিই পুরোধা সাংবাদিক।

বাংলাদেশ ছাড়ার আগে জেনেছিলাম মোস্তান ভাই পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষের দিককার খবর আর জানি না। আজ অনলাইনে হাজার বার তার নাম তল্লাশি দিয়েও কোন একটি ছবি পেলাম না, কিংবা জানতেও পারলাম না আমাদের মোস্তান ভাই এখন কোথায়, কেমন?