ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

রমজান আত্মশুদ্ধি আর সিয়ামের মাস। প্রতিটি মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করবে- আমি নিজে কতোটা মুসলমান। অথবা নিজে আমি কতো বেশি মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করি। আমার ধারণা বাংলাদেশের সকল মুসলমান নিজেকে এমনতর প্রশ্ন করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের প্রচার মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার এ প্রয়াস চোখে পড়ে না। বরং পুরো এ মাসটি জুড়ে এক ধরনের স্থুলতা, অবিমিস্রকারিতা, অজ্ঞানতা এবং কুসংস্কারের দাবানল ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয় আর চেতনাকে খান-খান করে দিয়ে যায়। রমজান এলেই এক ধরনের স্থুল ভক্তির জোয়ারে ভেসে যায় প্রিয় স্বদেশ। এ ভক্তির জোয়ার লক্ষ্য করা যায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত।

প্রথমে আসি ব্যক্তিগত পর্যায়ে। যারা আমরা রোজা রাখি, তারা কি অন্যদের প্রতি সদয় থাকি? বিশেষত কোন অরোজদারির প্রতি। অরোজদারিকে ‘বে-রোজদারি’ বলে বরবাদ করে দেয়ার এক ঐশ্বরিক জোশ লক্ষ্য করা যায় রোজাদারের মধ্যে। এটি আমি লক্ষ্য করেছি আমার প্রয়াত বাবার আচরণে। আর আজকাল লক্ষ্য করি সংসারের চারপাশে সবার মধ্যে। সংযম আর মিতাচার যদি রোজার প্রথম উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এখানেই আমরা রোজার মর্ম থেকে দূরে সরে যাই। নিজের ভেতরের দুর-বাসনাকে অন্যের উপর চাপানোর এই অসৎ প্রয়াসকে আমি কখনো রোজদারির আচরণ বলে মেনে নিতে পারি না। বাস্তব জীবনে প্রতিটি মানুষের চাওয়া-পাওয়া যেমন এক রকম নয়, মৃত্যুর পর তেমনি প্রত্যেককে নিজেদের মতো করে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করতে হবে। তখন আল্লাহ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন- তোমার তো আমলনামা ভাল না, ভাল বেহেস্তটি তোমার বরাদ্ধে নেই। আমি নিশঙ্ক চিত্তে বলবো- আপনি যেখানে ভাল মনে করেন আমাকে সেখানেই পাঠান, আমার কোন আপত্তি নেই। অথচ কী দুর্ভাগ্য- এই যে আমার নির্মোহ ভাবনা, এটিই আমি বলে বোঝাতে পারি না, আমার একান্ত কাছের মানুষটিকে! সৌভাগ্য যে, আল্লাহ এদের মতো এত নির্বোধ নন।

পারিবারিক আর সামাজিক বিবেচনার কথা কি বলবো? আমার তেরো বছরের বালিকাটি নিজের ইচ্ছায় দু-চারটি রোজা রাখে। এখন ওঁর বাড়ন্ত বয়স। প্রচুর খিদে পায় সবসময়। সুস্থ-সবল এবং কর্মচঞ্চল একজন শক্তিমান মানুষ হিসেবে ও বেড়ে উঠুক তা চেয়েছি ওঁর জন্মের পর থেকে। রাতে সেহরি খাওয়ার সময় ও যখন আমার কাছে যখন জানতে চায়- বাবা আমি রোজা রাখবো কি না, আমি তখন সম্মতি দিতে পারি না। আমার ধারণা- বাংলাদেশের প্রতিটি মহিলা শারিরীকভাবে দুর্বল প্রথমত অপর্যাপ্ত খাদ্য এবং দ্বিতীয়ত সমাজ ও ধর্মের বারাবাড়ির কারনে। এখানে দুর্বল বলতে আমি বুঝিয়েছি পুরুষের সঙ্গে শারিরিক সক্ষমতার আনুপাতিক বিচারে। অথচ, কোন-কোন আলেম (না জালেম!) ফতোয়া দেন- ‘বারো বছর থেকেই রোজা ফরজ? রোজা রাখতে না চাইলে মেরে রাখাও!’

এদিকে রাষ্ট্র হিসেবে যখন বাংলাদেশের কথা ভাবি- তখন চোখের সামনে দেখি এ দেশটি ভাসছে ভক্তির জোয়ারে। আমি রাস্তায় কাটিয়েছি বহু দিন। তাই চোখের সামনে দেখি- তোপখানা রোড জুড়ে কেবল সাদা কাপড়ের মিছিল, মাথায় টুপি এক দঙ্গল মানুষ। এদের হাতে লাঠি, মুখে ‘লা শরিকা লাহু’।

এদের কাছে নেই কোন যুক্তি, নেই বিজ্ঞান, নেই মানুষের প্রতি ন্যুনতম ভক্তি। এদের উস্কানিদাতা আমাদের ভণ্ড, প্রতারক রাজনীতিবিদেরা। আলোকোজ্জ্বল সামিয়ানার নীচে রমজানের বিকেলে এরা যখন মুখে গোলাবি শরবত ঢালেন, বাংলাদেশের আম জনতার তখন নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মাদ্রাসা ছাত্র নিঃস্ব শ্রেণীর। আমি কখনো এদের দোষ দেই না। এরা যখন দেখে দেশের নেতা-নেত্রী, কর্তা-কর্ত্রী, সবাই ধর্মের নামে ভণ্ডামীতে মগ্ন, তখন তারা ভাবে- ব্যবসাটি তো আমাদের! এই ব্যবসার জন্য আমরা ৩৬৫ দিন লেবাস ধরে রাখি! আর অথচ এরা বছরে মাত্র কয়েকদিন ধর্মপ্রাণ সেজে আমাদের ব্যাবসা কেড়ে নিতে চায়?

***
নিউইয়র্ক, ১০ জুলাই, ২০১১