ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাস পড়েছিলাম সেই পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে। মার্ক্স-এঙ্গেলসের সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস ছিল রাজনীতির প্রথম পাঠ। এর সঙ্গে তুলনামূলক সমাজতত্ত্ব তথা হেগেল, সিগ্মান্ড ফ্রিউড এরাও ছিলেন অবশ্য পাঠ্য। তবে এখন পর্যন্ত মার্ক্স এঙ্গেলসের তত্ত্বটি পৃথিবীর সর্বত্র পাঠ্য।

রাজনীতির প্রথম পাঠ আমার ব্যক্তিগত জীবনে অবদান রেখেছে অসামান্য। তাই আমার চিন্তাধারায় আমি কখনো রক্ষণশীল কিংবা কট্টর নই। সবকিছুই স্বাভাবিক, সাধারণ এবং পৃথিবী তথা সমাজ বিবর্তনের নিয়মতান্ত্রিক প্রপঞ্চ বলে মেনে নেই। আমার কাছে তাই প্রচলিত ধর্ম, দর্শন, প্রথা, রীতিনীতি কোন কিছুই অমোঘ নয়। সবই মানুষের সৃষ্টি, মানুষেরই প্রয়োজনে। আমার মানা না মানার বিষয়টি এখানে অপ্রয়োজনীয়। আমার নিজের সত্তা নিয়েও আমার প্রশ্ন জাগে কখনো। আমি কে, কেন এই পৃথিবীতে, আমার পরিচয় কি হতে পারতো। আমি যা দেখছি, শুনছি, জেনেছি কিংবা জানছি তার কতোটুকু সত্যি? আমার দেখা-জানা-শোনা সব কিছুই যদি মানুষের সৃষ্ট হয়, তাহলে এগুলো আমি স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নেব কেন? আমি যে ঈশ্বরের কথা জানি, কিংবা মানি, যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথা-রীতি আমাকে শেখানো হয় তার সবি’তো মানুষের সৃষ্টি, মানুষের প্রয়োজনে। নিজেকে প্রশ্ন করি সমাজ বিবর্তন যথা নিয়মে ঘটে চলেছে তো, নাকি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

আমার বাল্য, কৈশোর, এবং যৌবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে চির সবুজের বাংলাদেশে। আমি সবসময় অনুভব করেছি আমার এই প্রিয় মাতৃভুমিটি একটি বদ্ধ জলাশয়। এখানে নতুনের আবাহন কম। এখানে মানুষ আছে প্রচুর, কিন্তু মানুষের প্রয়োজনে সৃষ্টিশীলতার অভাব। সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ পুরনো ধ্যান ধারণা, মতবাদ আর রীতিনীতিকে আঁকড়ে থাকতে চায়। একে যদি আমি কুসংস্কার বলি, তাহলে খুব একটা অন্যায় হবে না। তাই আমি আমার প্রথম সংস্কারের তাগিদ অনুভব করি আমার নিজের পরিবারে। আমার মনে হয়- আমাদের প্রতিটি পরিবার যদি ধর্ম, দর্শন, সংস্কার ও রীতিনীতি পালনে সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও নমনীয় হয় তাহলে আমরা একটি উন্নত সমাজ গড়তে পারবো।

এখানে আমি সংক্ষেপে বলতে চেষ্টা করবো আমার ব্যাক্তিগত দর্শন আমেরিকা আসার পর কতোটা ইন্টারেকটেড (মিথস্ক্রিয়া?) হলো। ২০০১ সালের শেষের দিকে আমি আমেরিকায় আসি সপরিবারে। আমার স্ত্রী ও তিন বছরের একটি মাত্র কন্যা। আমার স্ত্রী আবার আমার কন্যাটির মা-ও। শুনতে একটু খটকা লাগছে? খটকা লাগবেই, কারন আমরা অভ্যস্ত শুনতে- স্ত্রী মানেই কন্যার মা। কিন্তু আমেরিকায় মানুষ সব সময় এটা শুনতে অভ্যস্ত নয়। বহু সন্তান জানে না কে তাদের বাবা। একমাত্র মা-ই বলতে পারে সন্তানটির পিতা কে? যদি মা-ও বিভ্রান্ত হয়, তাহলে সায়েন্টিফিক ম্যাথড- ডিএনএ টেস্ট। অবশ্য ডিএনএ টেস্টেরও শূন্য এক শতাংশ বিফলতা আছে। সে কারনে যেখানে যাই, সেখানেই মায়ের নাম আগে। পাসপোর্ট, বার্থ সার্টিফিকেট, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা, ইনস্যুরেন্স, স্কুলের নিবন্ধন, ব্যাঙ্কের সিকিউরিটি কোডে মায়ের নাম অবধারিত। বাপ থাকলে যা, না থাকলেও তা। রাষ্ট্র সবসময় মায়ের পক্ষে। বাপের নাম সরকারি কিংবা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে না থাকলেও বাপ কিন্তু দায়িত্ব মুক্ত নয়। রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিয়েছে বাবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে বাপকে ‘চাইল্ড সাপোর্ট’ (অর্থ) প্রদানে বাধ্য করা হয়। পারিবারিক আদালত এ কাজটি করে অত্যন্ত কঠোরভাবে।

শুধু আমেরিকা কেনো পুরো পশ্চিমা বিশ্ব এ নিয়মের অধীন। বাংলাদেশেও খোরপোষের বিধান আছে। সচেতন নারীরা আদালতের দ্বারস্থ হলে আদালত তাদের পক্ষে রায় দেন, কিন্তু কত জন নারী সেটা ভোগ করতে পারেন?

এবার উপসংহারে আসি। আবারো সেই সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস! প্রায় ১০ হাজার বছর আগে আদি সাম্যবাদী সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজ বিবর্তনে পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ভুল করে পুরুষ ভাবে আমিই এই পরিবার তথা সমাজের কর্তা। আসলে ভুল- নারী জানে তার জড়ায়ুতে কার বীজ অংকুরিত, বাগানের মালিকই বা কে?

নিউইয়র্ক, ২৮ জুলাই, ২০১১