ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

প্রথম কথা
আওয়ামী লীগ আর বিএনপি’র অপশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে আমাদের দেশে যারা জামায়াতে ইসলামীকে বিকল্প হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমার এ লেখা। আমার অনুরোধ- যুক্তি আর অভিজ্ঞতার আলোকে আপনারা বিচার করুন, আর দু’টি দলকেই সংশোধনের পরামর্শ দিন একেবারে তৃণমূলে। দর্শকের কাতারে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে না থেকে গ্রামে-গ্রামে ব্যানার হাতে নিয়ে “পরামর্শ সভা” করুন। মানুষকে বলুন- তারা যেন বোয়াল মাছের খপ্পর থেকে রক্ষা পেতে যেয়ে কুমিরের খপ্পরে না পড়ে।

ঘটনাকাল
১৯৮৬ সাল-এর ২৬শে নভেম্বর। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এরশাদীয় স্বৈরশাসনে দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আন্দোলনের দাবানল। ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়ার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে রাস্তায় মিটিং-মিছিল, হরতাল-পিকেটিংয়ে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের অহংকার, শহীদ তাজুল, সেলিম, দেলোয়ারের রক্তে রঞ্জিত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের রাজপথ। সকালে গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে নাস্তা করতে গেছি মতি’র দোকানে। কারন, একটু পরেই ক্লাসে যাবো। আমার বন্ধু ‘জীবন’ এসে ফোঁড়ন কাটলো- “অ্যাঁ… এক্কেবারে মাক্কু’র মতো ‘লাল ফোয়া’ লাগছে। আজ মিছিল আছে মনে রাখিস!” ক্লাস ফাঁকি মেরে মিছিল-মিটিং শেষে হলে ফিরে এসেছি। বিকেল পাঁচটার দিকে হলের বারান্দায় বসে কয়েকজন মিলে সেদিনের ক্যাম্পাস পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছি। হঠাত গুড়ুম-গুড়ুম আওয়াজ। মাইল খানেক দূরে সোহরাওয়ার্দ্দী হল মোড়ে হামিদের হাত কুনুই থেকে কেটে আলগা করে দিয়েছে শিবির। হামিদের অনুসারী আরো দশ-বারো জন মারাত্মক জখম। ঘটনাস্থল থেকে বাঁশির ফুঁৎকার, আর নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর ধ্বনি। এরপর এক যোগে ৫টি হলে সাঁড়াশী বোমা হামলায় আহত কয়েক ডজন ছাত্র, যারা ঘটনার আকস্মিকতায় আর পালাবার পথ খোঁজে পায়নি। আমরা যারা হলের নীচ তলার বাসিন্দা ছিলাম, তারা জানালা গলে (শিক আগে থেকেই ভাঙ্গা ছিল) কোন রকমে পালাতে পারলাম। শিবিরের পৈশাচিক আক্রমনে মারাত্মক আহতের আর্ত চিৎকারে হলের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। আমরা যারা পলায়নোন্মুখ, তাদের প্রতিও কাটা রাইফেল থেকে অনবরত গুলি বর্ষণ করলো তিন তলার ছাদ থেকে রেজাউল’রা! পরে জেনেছি- এই রেজাউল একাউন্টিং বিভাগের শিক্ষক হয়েছে জামাত শিক্ষকদের প্রত্তক্ষ্য সহযোগিতায়।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেইট থেকে আর হলে ফেরার সুযোগ পেলাম না। রাতে সবগুলো কক্ষের তালা ভেঙ্গে লুটপাট করলো। অনেকের মতো আমারও বই, পোশাক, কম্বল সবই গেলো। কল্পনাতেও কস্ট হলো- এরাই নামাজ পড়ে আর আল্লার বান্দা, নবীর উম্মত, মদুদীর অনুসারী বলে ইসলামের নামে জান কোরবান করে। আমার সামান্য হারানোর বেদনা হাওয়ায় উড়ে গেল আমার মতো অসংখ্যের শরীরের অঙ্গহানি দেখে। চট্টগ্রাম মেডিকেলে সে কী আহাজারি! আমি সুস্থ দেহে আছি এই ভেবে এখনো আমার দুঃখবোধ জাগে। এখনো ভাবি- আর কোন ছাত্র যেন সন্ত্রাসের শিকার না হয়! ধর্মের নামে মানুষ যেন পশু হয়ে না যায়! যারা জামাত-শিবিরের সাদা পোশাক, নামাজ-রোজা এবং সততা-নম্রতার ধ্বজা দেখে এদের অতীত ভুলে যায়, তারা যে কত বড় ভুলের চোরাবালিতে পা বাড়ায় তা ভাষায় বর্ণনা করার শক্তি আমার নেই।

যাই হউক, এ ঘটনার পর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিগণিত হলো একটি জেলখানায়। অনেকে বলতো আলীয়া মাদ্রাসা! কারন এখানে দেশের গণতন্ত্রের জন্য কোন মিছিল-মিটিং করতে চাইলে শিবিরের অনুমতি নিতে হবে। শিবিরের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিছিল করা আর মৃত্যু পরোয়ানা হাতে নেওয়া একই কথা! এমনকি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি’ এমন কথাও বলা যাবে না। প্রথম দিকে কেউ মিছিলে এমন কড়া শব্দ ব্যাবহার করে রাতে হয়তো হলে ফিরেছে। তখন শিবির নেতারা রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তার কক্ষে এসে হাজির। প্রথমে চড়-থাপ্পর, তারপর কানে ধরে উঠ-বস করিয়ে প্রতিজ্ঞা করায়, শাসায়- “চট্টগ্রাম কলেজে শাহাদাতের ঘটনা মনে আছে?” উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রাবাসে রুমমেট শিবিরের সাথী প্রার্থীর সঙ্গে তর্ক করায় সে বছরেই ভোর রাতে গলা কেটে খুন করে শাহাদাত’কে। শাহাদাত ছিল ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে খুনী স্বীকার করেছিলো সে সবটাই করেছে ইসলামের প্রয়জনে। জামায়াত নেতাদের কাছে সে শিখেছিল ইসলামের নামে কোরবান হওয়া এবং কোরবান করা সবই আখেরাতে বেহেশতের ‘দ্বারওয়াজা’ খোলার ‘কাজ’!

মিছিল-মিটিং-এর কথা না হয় বাদ দিলাম। ঘটনার পর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরণের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও ছিল নিষিদ্ধ। আবৃতি অনুষ্ঠান নেই, নেই বিতর্ক, গান-বাজনা। শিক্ষকরাও বিভক্ত, এক দল জামায়াত পন্থী, আরেক দল জামায়াত বিরোধী। জামায়াত বিরোধীরা আবার দুই ভাগে- এক দল আওয়ামী লীগ, আরেক দল আওয়ামী লীগ বিরোধী- যারা নিজেদের দাবি করতেন প্রগতিশীল বলে। যারা কোন দিন দাড়ি রাখেননি, এমন শিক্ষককেও দেখলাম দাড়ি রেখে আখেরাতের পথে পা বাড়াতে। শিবিরের সঙ্গে সখ্যতায় লাভ অনেক- হলের প্রভোস্ট হওয়া যায়, ভিসি, প্রভিসি হওয়ার আশাও থাকে।

চট্টগ্রামের সাকা চৌধুরী ব্যাক্তিগতভাবে এরশাদের জোটবন্দী হলেও শিবিরের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা। হামিদ এরশাদের ছাত্র সমাজের নেতা হলেও সাকা চৌধুরীর ভূমিকা প্রমান করে- এ ঘটনার নেপথ্যে পাকিস্তান দূতাবাস সক্রিয় থাকার যথেষ্ট কারন রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- এতবড় সন্ত্রাসী ঘটনার পরও ক্যাম্পাস থেকে কোন অস্ত্র উদ্ধার হলো না, শিবিরের একটি সন্ত্রাসীও গ্রেফতার হলো না। জিয়াউদ্দীন বাবলু নামে এরশাদের আরেক কুলাঙ্গার মন্ত্রী ছিল চট্টগ্রামের। তার ছোট ভাই ছিল শিবিরের নেতা। সেও ছিল নীরব। ব্লে রাখা ভালো- এই বামপন্থী বাবলু ছিল একসময় ডাকসুর নেতা। সরকারের এই নীরবতা এবং সরকারি দলের কাপুরুষোচিত আচরনে সচেতন ছাত্র সমাজ হতাশ। আমাদের বুঝতে ভুল হলো না- নাটের গুরু এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থা। একে উৎখাত না করলে নিকট ভবিষ্যতে এই জামাতিরা পুরো বাংলাদেশকেই গিলে খাবে। তখন বাংলাদেশটাই হয়ে যাবে একটি জেলখানা!

নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে আমরা তখন চট্টগ্রাম শহরে মিছিল-মিটিং করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের চেয়ে গণতন্ত্রের প্রয়োজন বেশী। ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার’- কবিতার ছন্দ দোলা দিয়েছিল আমাদের জীবনেও। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করতে পারিনি, তাই বলে আমাদের এই যুদ্ধটিও কি কম গুরুত্বপূর্ণ? তৎকালীন সময়ে দৈনিক সংবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন রিপোর্টার জাফর ওয়াজেদ (বর্তমানে নিরুদ্দেশ!) আর আমীর খসরু (সম্ভবত বিবিসি’তে)।

সারা দেশের মানুষ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোমহর্ষক ঘটনা শোনে ও পড়ে মুহ্যমান। কিন্তু কে এগিয়ে আসবে আমাদেরকে এই জেল জীবন থেকে উদ্ধার করতে?
সেদিনের ঘটনার পর আমি এক রাতের জন্য হলে এসে পর দিন বই-পত্র নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল এ যেন এক মৃতপুরী। ক্যাম্পাসে দিনে গান-বাজনা করে কেউ হয়তো হলে ফিরেছে, রাতে তার কক্ষে শিবির নেতারা এসে এমনভাবে অপমান করেছে যে, অই ছেলেটি ভয়ে কাতর হয়ে বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে মেলামেশাও ছেড়ে দিয়েছে। আমরা যারা সংগঠক-কর্মী, আমাদেরও এড়িয়ে চলে। এমন পরিস্থিতি এখন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
প্রয়োজন- সচেতন মানুষের ঐক্য!

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমরা লুকিয়ে-লুকিয়ে সভা করে ছাত্রদের সংগঠিত করতে লাগলাম। কয়েকজন শিক্ষকের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আমরা সে সব সভা করেছি। আমরা এ যুগের মুক্তিযোদ্ধা! আমাদের এক একেকটি কর্মী যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করতো। আশ্চর্যের বিষয়- মাত্র কিছুদিনের মধ্যে সব ছাত্র-ছাত্রী বুঝতে পেরেছিল “ঐক্যই বল”। কয়েক’শ ছাত্রকে শিবির দমন করতে পারে, কিন্তু কয়েক হাজারকে দমন করা যাবে না। সে কারনে একুশে ফেব্রুয়ারী, কিংবা স্বাধীনতা-বিজয় দিবসের মতো অনুষ্ঠান যখন আমরা সম্মিলিতভাবে পালন করতে শুরু করলাম, তখন সাধারন ছাত্রদের তেজ বেড়ে যেত। ক্ষণিকের জন্য হলেও তারা ভুলে যেত শিবিরের নির্যাতন এবং অপমানের কথা। তারা প্রতিশোধের শপথ নিত। কিন্তু প্রতিশোধতো আর খালি হাতে নেয়া যায় না! তবে অস্ত্র একটি আছে, সেটি হলো ভোটের অস্ত্র। আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে কেউ-কেউ অস্ত্র হাতে শিবিরকে মোকাবেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে সব চেষ্টা সাধারন ছাত্রদের সমর্থন পায়নি কখনো। বরং সাধারন ছাত্ররা সে সব ছাত্রনেতাদের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। প্রায় চার বছরের অক্লান্ত চেস্টার পর ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন প্রভৃতি সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভাইস চ্যন্সেলর অধ্যাপক আলমগীর সিরাজুদ্দীনের কাছে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জানাতে থাকি। নির্বাচনের একটি আচরণবিধিও তৈরি হয়। শিবির সহ সবাই এতে স্বাক্ষর করে। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র লীগের মতো কয়েকটি বড় সংগঠন সেদিন কোন পদ না নিয়েই ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনে সব্বাইকে ত্যাগের আহবান জানায়। ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে (এরশাদ পতনের বছর খানেক আগে) সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শিবির যে কোন ভাবে নির্বাচন পণ্ড করে দিতে পারে, সে কারনে আমরা তাদের সঙ্গে যে কোন রকমের বিবাদ এড়িয়ে চললাম। নির্বাচনের আগের রাতে আমরা হলের পাশে কূড়ে ঘরগুলোতে (ছাত্র নিবাস) রাত কাটালাম, আর হলে-হলে খবর পৌঁছে দিলাম, যাতে সবাই ফজরের আজানের আগে ভো্টের লাইনে দাঁড়ায়।

গণতন্ত্রের বিজয়!
আমাদের আহবানে কাজ হলো। জানুয়ারি মাসের শীতের ভোরে হাজার-হাজার ছাত্র ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে চাকসু এবং সব ক’টি হলে (এফ রহমান হল ছাড়া) “ছাত্র ঐক্য” কে বিজয়ী করলো নিরংকুশভাবে। এফ রহমান হলে পরাজয়ের কারন ছিল- ছাত্রলীগ-এর দুই গ্রুপ! এই বিজয়ের মাসখানেকের মধ্যে আমি পড়াশুনার পাঠ ঘুছিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। শুরু হলো স্বৈরাচার হঠানোর চূড়ান্ত এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।

শেষ কথা!
আমাদের আশা ছিল- এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অস্ত্র উদ্ধার করবে। কিন্তু খালেদা, কিংবা হাসিনা কেউইতো পড়াশুনার মান এবং পরিবেশ নিয়ে চিন্তা করেন বলে মনে হয় না। বরং খালেদা জিয়া অত্যন্ত জঘন্যভাবে জামায়াতের সঙ্গে অশ্লীল সখ্যতা গড়ে তুললেন, যা বিএনপির রাজনীতির জন্য ছিল অপ্রয়োজনীয়। আর তা দেখাদেখি আওয়ামী লীগও জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সংসদের ভেতরে বাইরে আন্দোলন গড়ে তুললো ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে। আজ যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ যে অবস্থান নিয়েছে, তা সে তুরুপের তাসের মতো আবার ব্যবহার করে কি না তা-ই দেখার বিষয়।

***
নিউইয়র্ক, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১১