ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

হাডসন ভ্যালীতে আমার প্রথম দিনগুলো’র প্রথম পর্বটি প্রকাশের পর অনেকে জানতে চেয়েছিলেন এর পর কী হলো। আজ যখন বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে বেশ মিঠে-কড়া মন্তব্য প্রকাশিত হচ্ছে, তখন এ লেখাটির প্রয়জনীয়তা এখনো আছে বলে মনে হয়। যাই হউক, আমি হাডসন ভ্যালীতে পাড়ি জমিয়েছিলাম ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই। নিউইয়র্ক নগরীতে থাকতে অনেকের এই লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না, সেখানকার ‘পাতাল রেল’-এর সহজলভ্যতার কারনে। কিন্তু নগরী থেকে বেড়িয়ে এলেই আর রক্ষে নেই। হয় লাইসেন্স নাও, গাড়ি নাও, নয়তো ঘরের ভেতর বন্দী জীবন-যাপন করো!

আগেই বলেছি- আমি হাডসন ভ্যালী’র প্রেমে পড়েছিলাম প্রথমবার এসেই, এর নির্মল প্রকৃতির কারনে। দ্বিতীয়তঃ ভালো কাজের আশায় আমি এসেছি এখানে, নিউইয়র্কে মনের মতো কাজ পাইনি বলে। প্রথম তিন দিন কাজ করেছি শামীমের বাসায় অবস্থান করেই। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে শামীমের এপার্টমেন্ট থেকে খানিকটা হেঁটে একটি পেট্রোল পাম্প (গ্যাস স্টেশন)-এর সামনে দাঁড়াতাম। ওখান থেকে বাবুল ভাই নামের এক ভদ্রলোকের গাড়িতে করে পৌঁছে যেতাম গন্তব্যে, অর্থাৎ আইবিএমে। ১২ ঘন্টার শিফট শেষে বিকেল সাড়ে ছ’টার কিছু পরে একই গাড়িতে করে আবার ফিরতাম। বাবুল ভাই পরামর্শ দিলেন আপনি বরং আমার এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে বাসা ভাড়া নিয়ে নেন। এতে করে আপনার কাজে যাওয়া-আসার কিছু সমাধান হবে। আর সেখানে একটি বড় গ্রোসারিও আছে, যেখানে গাড়ি ছাড়া নিত্য দিনের সদাই করা যাবে। তার এ যুক্তিটি আমার পছন্দ হলো। বিশেষ করে আমার শিশু কন্যাটির জন্য আর না হউক দুধ কিনতে হবে। সে জন্য লাইসেন্স পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে পারব না।

বাসা নিলাম, এর নাম ম্যানচেস্টার গার্ডেন এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। এর ভেতর বাচ্চাদের খেলাধুলার আলাদা পার্কসহ সকালে-বিকেলে হাটা-চলার বেশ সুব্যবস্থা আছে। মে মাসের প্রথম থেকেই উঠতে চাই। এ কারনে সপ্তাহান্তে নিউইয়র্কে গিয়ে একটি মুভার (বাংলাদেশী- নাম ‘মধুমতি’) ঠিক করলাম আমার যৎসামান্য আসবাব নিয়ে আসবো বলে। বাংলাদেশী বিজনেস ইয়েলো পেজ ঘেটে বের করলাম এদের টেলিফোন নম্বর। সকাল বেলা আরও দু’জন নিয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যে ছ’তলার সিঁড়ি মাড়িয়ে ওরা সবকিছু তুলে ফেললো গাড়িতে। প্রায় ৮০ মাইল উত্তরের পাহাড়-জঙ্গল-নদীর দেশ পুকেপ্সিতে আমার গন্তব্য।
কিন্তু আমার কী হবে, আমার যে লাইসেন্স নেই! যদিও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লার্নার পারমিট সংগ্রহ করেছিলাম, আর মাত্র কয়েকটি রোড লেসন নিয়েছিলাম এক বাঙালী ভদ্রলোকের ড্রাইভিং ইস্কুলে। একদিন লেসন নেয়ার সময় একটি ইন্টারসেকশনে পথচারী পারাপারের সময় ভদ্রলোক আমাকে ব্রেক কষার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন- মনে রাখবেন, ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’।
এ কথাটি আমি এখনো প্রায়ই মনে করি, বিশেষত গাড়ি চালনার সময়।

বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে কাজে যাই, আসি। নিজের সার্বভৌমত্য হীনতায় নিজেই লজ্জা পাই। কয়েক সপ্তাহের বেতন জমিয়ে জুন মাসের মাঝামাঝি শামীমকে নিয়ে একটি গাড়ি কিনে ফেললাম। মনে পড়ে ২০০২ সালের ১৪ই জুন। আমার প্রথম গাড়ি চার দরজার সেডান- নিশান সেন্ট্রা ১৯৯৪ সালের, মাইলেজ ছিলো ১ লাখ ৩৯ হাজার। শামীম হয়তো রাজি ছিলো না, কিন্তু আমি তাকে এমন একটা ধারণা দিলাম যে, গাড়ি চালাতে আমি সিদ্ধহস্ত। অথচ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে অন্তত ১২ ঘন্টার রোড প্র্যাকটিসের প্রয়োজন, আমার আছে মাত্র তিন ঘন্টার! এদেশে লাইসেন্স না থাকলেও যে কেউ গাড়ি কিনতে পারে ১৮ বছরের উপর। তবে ইনস্যুরেন্স থাকতে হবে অবশ্যি। আমি ইনস্যুরেন্স কিনেছিলাম মাসে একশো ডলার হিসেবে। বয়স যত কম ইনস্যুরেন্স তত বেশি, কম বয়স্কদের গাড়ি চালনায় ঝুঁকি বেশি বলে। পার্কিং লটে গাড়ি চালনার চেষ্টা করি। গাড়ির রোড টেস্টে হাজির হতে ৫ ঘন্টার আরেকটি ক্লাস করতে হয়, চল্লিশ ডলার দিয়ে সেটিও করলাম। একদিন লাইসেন্সের জন্য রোড টেস্টে হাজির হলাম ৯০ মাইল দূরে নিউইয়র্ক নগরীর কুইন্সে। ফেল করলাম। ইন্সট্রাক্টর বললো- যথেষ্ট মনোযোগী নই। ১শ’র মধ্যে পেয়েছি ৬০, আরো কুড়ি পেলে পাশ! ফেল মারলেও আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো। জীবনে কোন দিন ৬০ নম্বরের ফার্স্ট ডিভিশন পাইনি, আর এখানে কি না ৬০ পেয়েও ফেল? মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম- আর লাইসেন্সের অপেক্ষা নয়, কাল থেকে আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে কাজে যাবো। বলে রাখা ভালো- আমি যেখানটায় থাকি, তার দুই মাইলের মধ্যেই ড্রাইভিং টেস্ট নেয়া হয়, কিন্তু সেটা কেউ আমাকে বলেনি। যাক গে, কাল থেকে আমি আর বাবুল ভাইয়ের ঘাড়ে সওয়ার হবো না। ভদ্রলোক তার সার্ভিসের জন্য টাকা নিতে চান না, জোর করে দিতে হয়। এটাও আমার জন্যে এক বিড়ম্বনার।

প্রথম দিনের ড্রাইভিং
আমি আগে থেকেই বলতাম- গাড়ি হলো “মোবাইল ডেথ ট্র্যাপ”। কাজেই প্রথম দিনের ড্রাইভিং-এ আমি একা মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করবো, এমন বোকা আমি নই। সৌভাগ্যবশত সেদিন আমার শশুর বাড়ির লোকজন এলেন, তাদেরকে আইবিএম ক্যাম্পাস দেখানোর উছিলায় বের হলাম। বাসা থেকে ১৬ মাইল (২৫ কিমিঃ?) দূরের পথ গেলাম ৪৫ মিনিটে। অথচ এই পথটাই পাড়ি দেই বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে ২০-২৫ মিনিটে! যেখানটায় গতিবেগ লেখা ৪৫ মাইল, আমি সেখানে চালাচ্ছি ৩০ মাইল বেগে। আমার গাড়ির গতি বাড়ে না। পেছনে লম্বা লাইন, কিন্তু কেউ হর্ন বাজালো না। এক পর্যায়ে আমি গাড়ি সাইড করে বাকিদের পথ করে দিলাম। কেউ-কেউ আড় চোখে চাইলো- হু কেয়ারস। আমি আছি আমার যন্ত্রণায়! আমাকে আইন শেখাচ্ছ? দুটো টিপস জেনেছিলাম শামীমের কাছ থেকে- পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচে নামতে, আর রাস্তায় বাঁক নিতে ব্রেকে চাপ দিতে হবে। আবার সামনের গাড়ির পাছায় লাল বাতি জ্বলতে দেখলে, নিজেও লাল বাতি জ্বালাতে হবে, অর্থাৎ ব্রেক ধরতে হবে। এই আমার সম্বল।

পর দিন থেকে গাড়ি চালিয়ে কাজে যাই। আইন মানলে পুলিশ দাঁড় করাবে না কোনদিন। আইন না মানলে খবর আছে। মাস খানেক ধরে চালাচ্ছি। একদিন সিংগেল লেনের রাস্তায় একটি বাস’কে ওভারটেক করতে যেয়ে মারাত্মক এক্সিডেন্টের মুখোমুখি হতে গিয়ে বেঁচে গেলাম গাড়িকে রাস্তার পাশে জঙ্গলে ঢুকিয়ে। কি করবো, ‘আইন না মানার থ্রিল যে আমার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে’, বাংলাদেশ থেকে আসার এক বছরও যে হয়নি! এরমধ্যে আরেকবার পরীক্ষা দিলাম, এবারও ফেল। ইন্সট্রাক্টর বললো, তুমি গাড়ি চালাতে জানো, কিন্তু যথেষ্ট নিরাপদ সচেতন নও। হ্যাঁ, মাত্র ক’দিন আগেইতো আমি মরতে-মরতে বেঁচে গেলাম! এদিকে আরো অঘটন আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

অঘটন!
অক্টোবর মাসের এক বিকেলে আমি বউ-বাচ্চা নিয়ে পাশের শপিং মলে গেলাম মুদি সদাই কিনতে। এইতো চাল-ডাল-দুধ ইত্যাদি। ফেরার সময় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। ভুলে গেলাম গাড়ির হেড লাইট জ্বালাতে। মলের পার্কিং লট থেকে বের হয়ে প্রধান সড়কে, একটি ট্রাফিক লাইটও অতিক্রম করলাম। দেখি পেছনে পুলিশের গাড়ি লাল-নীল-হলুদ বাতি জ্বালিয়ে। আমি চালাচ্ছি তো চালাচ্ছি। এক পর্যায়ে সাইরেন বাজানো শুরু করলো। তখন আমি গাড়ি সাইড করলাম। পুলিশ এসে জানালায় টোকা দিল। জানালা খুললাম। চাইলো- লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ইনস্যুরেন্সের কপি। লাইসেন্স বলতে আমার লার্নার পারমিট। পুলিশ আমাদের নামতে বলল। আমি নেমে আমার কন্যাটিকে কোলে তুলে নিলাম, স্ত্রী আমার পাশে। পুলিশ জিজ্ঞেস করলো তোমার লাইসেন্স কই? আমি বললাম, দুই বার পরীক্ষায় অবতীর্ণ, কিন্তু ফেল। সংসারের প্রয়োজনে গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়েছি।’ পুলিশ বলল- তুমি পুলিশের গাড়ির লাইট দেখেও থামালে না কেন? আমি বললাম, জীবনে এই প্রথম, জানা ছিল না। পুলিশ আবার বলল- তোমার লাইসেন্স থাকলে হয়তো ঠিকই জানতে! আমি বললাম- হয়তো তাই। গাড়ির অবস্থান থেকে আমার বাসা মাত্র ২০০ মিটার হবে। অথচ, পুলিশ গাড়িটি টো গাড়িতে তুলে নিয়ে আমাদেরকে টো গাড়ির সামনে বসিয়ে দিলো। আর হাতে ধরিয়ে দিলো একটি টিকেট। আমি ‘নো গিল্টি’ আর্জি করে টিকিটটি ছেড়ে দিলাম পরদিনের ডাকে। তিন মাস পরে কোর্টের শুনানির তারিখ পড়লো। আমি তখনো কাজে যাতায়াত করি। অবশ্য তিন মাস পূর্তির আগেই আমার লাইসেন্স হয়ে গেলো। নির্ধারিত দিনে কোর্টে গেলাম, কিন্তু পুলিশের পাত্তা নেই। বিচারক রায় দিলেন- মামলা খালাশ!!

সারমর্মঃ লাইসেন্স ছাড়া কেউ গাড়ি চালাবেন না

নিউইয়র্ক, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১১