ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ব্রায়ান’কে আমি চিনি গত চার বছর। তার গল্পটি বলার আগে আমি এখানে কিঞ্চিৎ ভূমিকার অবতারনা করছি। আর গল্পটি বলছি সবার শেষে।

ব্যক্তি স্বাধীনতার সঙ্গে ধর্মের বিরোধ বোধকরি মানব সভ্যতার প্রাচীনতম বিরোধ। মানব সমাজের জন্য ক্ষতিকারক আচরণ থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করার জন্যই সংগঠিত ধর্মমত ও এর বিধি-বিধান রচিত হয়েছিল। তাইতো ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই কোন ধর্মের শুরুটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কখনো সমাজের ভেতর থেকে, আবার কখনো শাসকের পক্ষ থেকে ধর্মমত ও এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে আঘাত এসেছে। ফলে ধর্মও কখনো তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে, নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে সমাজের সঙ্গে আপোস করে। ধর্মের এই নমনীয়তার কারনে এখনো টিকে আছে এবং পৃথিবীর বহু সমাজ থেকে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা তাই এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তবে পরিবর্তিত হয়েছে ধর্মের ভূমিকা। আধুনিক সভ্যতায় রাস্ট্র লাগাম টেনে ধরেছে ধর্মের। এই লাগামের কারন- ধর্ম নিজেই নিজের শত্রু হয়ে কখনো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এটি অবশ্যই ধর্মের দোষ নয়। দোষ ধর্মের রক্ষক বলে দাবীদার একটি গোষ্ঠীর। এরা নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে ধর্মের মোড়কে সমাজে বিক্রির চেষ্টা করে। তখনই সমাজে সৃষ্টি হয় বিরোধ। এই বিরোধের নিস্পত্তি সাধনে রাস্ট্রকে ত্রাতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। রাষ্ট্র দূর্বল হলে অন্যান্য শক্তি সে স্থান পূরণ করে। সংগঠিত সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি কিংবা সামরিক বাহিনীর শক্তি এ ক্ষেত্রে স্মর্তব্য।

বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতার সঙ্গে ধর্মের বিরোধের চরম বহিঃপ্রকাশ। এই ‘স্বাধীনতা’ মানে মানুষের আত্মিক ও আর্থিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। এর বিপরীতে ছিল নিপীড়ক শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে এক শ্রেণীর ধর্মবাজ মৌলভীদের অশুভ আঁতাত।

আধুনিক সভ্যতায় ধর্ম যেন সমাজের ওপর খড়গ হয়ে আবির্ভূত না সে কারনে রাস্ট্রের পক্ষ থেকে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ এসেছে। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে খ্রিষ্ট ধর্মের অতি প্রভাব মানব সমাজে হিংসা ও হানাহানির কারন হয়ে দেখা দিলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইন করে যাজকদের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। একই আইনের মাধ্যমে ধর্মকে সীমাবদ্ধ করা হয় কেবল চার্চের মধ্যে। এর আগে পর্যন্ত, ধর্ম ছিল আমাদের দেশের মতো সর্ব্ব্যাপী।

আমাদের দেশে যেমন এখনো দেখা যায়- বুকে কোরান বেঁধে, কাফনের কাপড় গায়ে জড়িয়ে কিছু লোক রাস্তায় এবং প্রকাশ্য সভায় মাতম করে, আর বোঝাতে চেষ্টা করে তারাই মানুষের ইহকাল এবং পরকালের রক্ষক! ইউরোপে প্রায় চার’শ বছর আগে এসব আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যাতে মতলববাজরা মানুষের আবেগকে প্রতারিত করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। এর ফলে সমাজের মানুষ জীবনমুখী হয়। মিথ্যা আবেগে পারস্পরিক কলহে লিপ্ত হয় না। সমাজে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটে। চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কিংবা প্রকৃতি বিজ্ঞানের সুফল ভোগ করে পুরো মানব সমাজ। অবশ্য চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় সহস্রাধিক বছর ধরে এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে পারস্য, অসিরিয়ান ও সুমেরীয় (সিরিয়া) মেসোপটেমিয়া (ইরাক), চীন বিশ্ব সভ্যতায় অসামান্য অবদান রাখে। কারন তখনও সে সব দেশে ধর্মবাজদের দানবীয় বিস্তার ছিল না।

আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ধর্মবাজদের গত কয়েক’শ বছরের অশুভ আঁতাতের বিরুদ্ধে জাগরণ শুরু হয়েছে। এই জাগরণ এ সব দেশে ব্যক্তি স্বাধীনতার বিকাশ ও বেঁচে থাকার নতুন ‘প্রেরণা’ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

পৃথিবীর বহু দেশে ধর্ম এখন ব্যক্তি পর্যায়ে আচরীয়, এর বেশী নয়। সভ্যতার এ পর্বে সমাজ এবং রাস্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত ধর্ম চর্চ্চা ও বিশ্বাসের ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করতে আর আগ্রহী নয়। ধর্ম পালন করা ও না করার ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমেরিকায় আসার পর মানুষের এই ব্যক্তি স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ দেখে আমি বিস্ময়াভিভূত। এখন আমি যে গল্পটি বলবো সেটি একশ ভাগ সত্য, এবং এর সত্যতা কেবল আমেরিকাতেই সম্ভব। বাংলাদেশে তা কবে নাগাদ সম্ভব হবে তা পাঠকই বিবেচনা করবেন।


ব্রায়ানের গল্প

নিউইয়র্ক নগরীর আশি মাইল উত্তরে আমার একটি ছোট পারিবারিক ব্যবসা আছে, যাতে আমি এখন কালে-ভদ্রে যাই। সেই ব্যবসার একজন নিয়মিত খদ্দের ব্রায়ান কলেজে পড়ে, বয়স ২৫-২৬।
ব্রায়ানের মা ইহুদী, এবং বাবা ক্যথলিক খ্রিস্টান। ব্রায়ান গত চার বছর ধরে একজন পাকা মুসলমান। মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর ব্র্যায়ান পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। কখনো তাব্লিগ জামাতের সঙ্গে চিল্লাতেও যায়। মসজিদ এখানে আমাদের বাঙালী সমাজের মিলন ক্ষেত্র। আমিও প্রায়ই মসজিদে যাই, এবং ব্রায়ানের সঙ্গে দেখা হয়। সর্বশেষ ব্রায়ান আমার ব্যবসায় এসেছিল কয়েক দিন আগে এবং আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম- মুসলমান ধর্মে দিক্ষিত হওয়ার চার বছর পর তার প্রতিক্রিয়া কি? উত্তরে সে বলল- ‘আমি আগের চেয়ে অনেক বেশী সার্টেন’ (অর্থাৎ আমার জীবন এখন অনেকটা নিশ্চিত)।
ব্রায়ানের এ উত্তরের সময় তার ইহুদী মাতা তার পাশেই দাড়িয়েছিল। আর ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলেছিল।

আমার অন্তর্দৃষ্টি নিমিশে ছুটে গিয়েছিল বাংলাদেশে। আমি ভাবছিলাম আর নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম- ‘ধর্মের মর্ম’ উপলব্ধির জন্য এ ধরণের ব্যক্তিস্বাধীনতা আমরা কবে থেকে উপভোগ করবো? আমাদের সমাজ এবং পরিবার ধর্ম পালনে এখনো যতটা খড়গহস্ত, তাতে মানুষের অন্তরে ধর্ম আদৌ কোন প্রভাব বিস্তার করে বলে আমি সন্দিহান। সে কারনে আমরা ধর্ম চর্চা করি, কিন্তু ধর্মের বাণী লালন করি না। আগে কোনদিন নিজেকে আমি এ ধরণের প্রশ্ন করিনি। আয়নায় নিজের চেহারা দেখে, কিংবা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ধর্ম নিয়ে যেমন প্রশ্ন আমি কোনদিন করিনি।

নিউইয়র্ক, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১১