ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সেদিন আমি “বিশ্ববিদ্যালয় না জেলখানা” লেখাটিতে কাহিনীর একটি অধ্যায় লিখেছিলাম। কিন্তু এ কাহিনীর উল্টোপিঠে যে আরেকটি কাহিনী ছিল তা কিন্তু বলা হয়নি। এ কাহিনী না জানলে ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এবং এ ভুলের মাশুল হবে অনেক বড়। কারন আমাদের সমাজে মধ্যবর্তী, অর্থাৎ সুবিধাবাদী অবস্থানে বাস করেন সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক। যাদেরকে গণনায় আনতে আমরা প্রায়শ ভুলে যাই। এরাই কিন্তু ক্ষমতার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে মোকাবেলার মতো যারা জামাত-শিবিরকেও মোকাবেলার চিন্তা করেন, তারা ভূলের মহাসাগরে বাস করেন। জামাত-শিবির কিন্তু কোন দলের নাম নয়। একটি মতাদর্শের নাম। আর এই মতাদর্শের বীজ আমাদের দেশের সাধারন মানুষের অস্থি-মজ্জায়। জামাত শিবির কেবল ইসলামী বিপ্লব কিংবা জাগরনের চিন্তাই করে না, এ জাগরনের লক্ষে যা-যা করা দরকার তা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে। যেমন সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে মিশে। তাদেরকে নামাজ-রোজার দাওয়াত দেয়। শুধু তাই নয়- অসুস্থের সেবা করে, দরিদ্র ও ঋণ গ্রস্থদের আর্থিকভাবে সহায়তা করে। শুধু তাই নয়- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের চেয়ে তাদের চারিত্রিক দ্রিঢ়তাও অনেক। এরা চাদা’র জন্য কাউকে তাড়া করে না। মুখে সব সময় কোরানের আয়াত আওড়ায়। তাদের মনগড়া (টুইস্টেড) তর্জমা উপস্থাপন করে। এবং বিশেষ করে ‘জেহাদ’, ‘মজলুম’ এ শব্দগুলোকে মানুষ লুফে নেয়।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা সে সব ছেলে-মেয়েদের টার্গেট করে যারা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসেন, এবং যাদের সঙ্গে শহরের ছেলে-মেয়েদের ব্যবধান থাকে। শহরের ছেলেমেয়েরা অনেকটা অবাধ এবং নাটক-হিন্দি সিনেমার সঙ্গে পরিচিত। গ্রামের সন্তানদের ক্ষেত্রে মুক্তভাবে চলা এবং চিন্তার সুযোগ সীমিত। সে কারনে মাথায় হিজাব তুলে দিয়ে, কিংবা থুঁতনিতে চার গাছা দাড়ি ঝুলিয়ে এদেরকে ইসলামের পথে নিয়ে আসা খুবই সহজ।

আর মধ্যবর্তী লোকগুলোর কথা বলছিলাম। এদেরকে চেনা খুব সহজ নয়। জামাত একবার অস্ত্র হাতে তুলে নিলে, কিংবা ক্ষমতায় চলে এলে এই মধ্যবর্তী লোকরাই তাদের পায়বন্দ হয়ে যাবে। এমনটা হয়েছে ইরানে। সেখানে শাহের বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রগতিবাদী, কিংবা বাম্পন্থীরাই ছিল শক্তিশালী। কিন্তু চূড়ান্ত মুহুর্তে সামনে চলে আসে খোমেনির দল। মনে করুন, এখন যারা জামাতের বিরুদ্ধে খড়গ হস্ত, তাদের মধ্যে অনেকে সুযোগের সন্ধানে জামাতের সঙ্গে হাত মেলাবে। এমনটা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন জামাতকে মোকাবেলার কৌশল কি হতে পারে? আমি বলবো গণতান্ত্রিক সহনশীলতা। প্লেইন লেভেল ফিল্ড। কেউ যেন ফাউল করার সুযোগ না পায়। মনে রাখবেন- ঢিল মারলে কিন্তু পাটকেলটি খেতে হবে। জামাত-শিবির যারা করে তারাও মানুষ। ‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই’- এটিই যেন হয় আমাদের সকল কাজের মূলমন্ত্র। কেউ ফাউল করলে যেন দেশের সংবিধান এবং প্রচলিত আইনেই তার বিচার হয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা জানি- যেখানে আইনের শাসন অনুপস্থিত সেখানেই তালেবানি উগ্রতা মাথাচাড়া দেয়। এ্টা হয়েছে আফগানিস্তান, সোমালিয়া, সুদানে।

আমাদের দেশে জাতীয় সংসদ সঠিকভাবে কাজ করতে পারলে আমাদের এ বিষয়টি নিয়ে উৎকণ্ঠা তো দূরের কথা, কথা বলারই প্রয়োজন হতো না। আমাদের সংবিধান যথেস্ট শক্তিশালী ছিল মানুষের অধিকার রক্ষা ও চর্চার ক্ষেত্রে। কিন্তু আমরা এ সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে পারিনি। বারবার সামরিক শাসন এসেছে। আমরা সংবিধানের কথা মতো স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে পারিনি। আমরা বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরন করতে পারিনি। আমরা সমাজ ও রাজনীতি থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে পারিনি। জামাতের শক্তি সঞ্চয়ের এগুলোই মূল কারন। আসুন, জামাতকে গালি এয়ার আগে আমরা আমাদের নিজেদের দূর্বলতাগুলো চিহ্নিত করি।

নিউইয়র্ক, ৪ অক্টোবর ২০১১