ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

কাল রাতে আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। মানুষের মাথা ছিটকে পড়ার দৃশ্য কোনদিন দেখবো, কল্পনা করিনি। একটি নয়, দু’টি নয়, এক এক করে আট আটটি মাথা! আর মাথাগুলো আমারই এক স্বজাতির। যে পেটের দায়ে সবুজ-শ্যামল উর্বর ভূমি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল উশর মরুভূমিতে। যে ভূমিতে পশুরও চরণ চলে না। সেখানেই চাকরি হারিয়ে ভাগ্যহত হয় এরা। পৃথিবী জানতে পারলো না- আদালতের কাঠগড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনা হয়েছিল, আর এ অভিযোগের জবাবে তারা কি বলেছিল। তাদের ভাষা বোঝার জন্য কোন দোভাষী ছিল কি না, কিংবা অভিযোগকারীর বক্তব্যই বা কি ছিল? সৌদি আরবে প্রচলিত (তথাকথিত শরীয়া) আইন নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনার ইচ্ছেটিকে তাই ঝেটিয়ে বিদেয় করে দিয়েছি। মন ভাল হলে অন্য কোনদিন লিখবো। আজ আমার জানা শোনা তিনটে অভিজ্ঞতার কথা বলে বিদেয় নেব। মাফ করবেন আমাকে প্রতিশ্রুতি রাখতে পারলাম না বলে।


আমার এক বন্ধু বুয়েট থেকে পাশ করে নব্বইয়ের গোঁড়াতে গিয়েছিলেন সৌদি আরবের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে চাকরি নিয়ে, সেখান থেকে পরবর্তীতে আসেন যুক্তরাষ্ট্রে আইবিএমে চাকরিতে। এখন আইবিএম ছেড়েও চলে গেছেন নিউইয়র্ক সিটির স্যানিটেশন বিভাগে আরো উচ্চ বেতনে। বন্ধুটির নাম আজহার। তারই অভিজ্ঞতার বর্ণনায় এ লেখা। সৌদি আরবে ইনি কাজ করেন প্রায় ছয় বছর। তার অধীনে যেসব সৌদি সদ্য পাশ করা যুবক কাজে ঢুকত, তাদের বেতন থাকতো সব সময় দ্বিগুণ। একবার তার প্রমোশন হয়, বেতনও বাড়ে হাজার রিয়াল। কিন্তু তার অধীনে ন্যাদারল্যাণ্ড থেকে সাদা চামড়ার যে যুবকটিকে আনা হয়, তার বেতন ছিল আজহারের বেতনের তিন গুণ বেশী। সাদা চামড়ার এই খ্রিস্টান মানুষটিও হতভম্ব হয়ে যায়, আজহারকে বলে- কুকুরেরও কৃতজ্ঞতা বোধ থাকে। অবশেষে তারি পরামর্শে এইচ ওয়ান ভিসা নিয়ে আজহার আজ আমেরিকায়। বুকের পাথরটি সরিয়ে আজহার যখন এ সব অভিজ্ঞতার কথা বলে, তখন তার দৃষ্টি হয়ে যায় পাথর। সে পাথরের কান্না আমি শুনেছি- কারন সে মেসকিন বাঙালী, বাংলাদেশী তার পরিচয়!


আমার ভাগিনী দু’টি বাবা-মা’র কল্যাণে ভালই নামাজ কালাম পড়ে। আমেরিকায় জন্ম হলেও বাঙালী মুসলিম সংস্কৃতি লালন ও পরিচর্যায় পারিবারিকভাবেই কঠোর। গত বছর গিয়েছিল বাবা-মা’র সঙ্গে হজ্জে। কাবা শরিফ তাওয়াফের আগে আর সব মানুষের সঙ্গে “তামাশা” দেখতে তারাও সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়েছিল। তাদের জানা ছিল না- এখানে মানুষের মন্ডু কর্তন হবে। কোরবানির পশুর প্রতি অন্যায় আচরনের মতো এই নিষ্ঠুর প্রব্রিত্তি দেখে তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, আর হতবিহবল হয়ে এদিকওদিক ছোটোছুটি শুরু করে। এ দৃশ্যের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে আমি তাদের প্রশ্ন করলে তারা জানায়- ইসলামের ঔদার্য্য আর মহানুভবতার কোন আলামত তারা লক্ষ্য করেনি সৌদি আরবে। বরং মানুষ এবং নারীর প্রতি চরম অসম্মান প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে পবিত্র ধর্মকে, অন্তত সৌদি আরবে ওমরায় যাবার অভিজ্ঞতা তাই বলে।


নামাজ পড়তে গেলে দেখা হয় ডাচ-আইরিশ (নও মুসলিম) জামাল-এর সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে সে জানালো মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আগে সে যদি সৌদি আরব যেত, তাহলে সে কোনদিন মুসলমান হতো না।

পরিশেষে
আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি কাল রাতে ঘুম না হওয়ার ফাঁকে। আমার ইচ্ছে ছিল নিকট ভবিষ্যতে ইসলামের পূন্যভূমি, আব্বাসীয়-উমাইয়া খেলাফতের দর্শণীয় স্থান, মক্কা-মদিনা দেখতে সৌদি আরব যাবার। কিন্তু আমার ভাইয়ের রক্তে যে ভূমি কলংকিত ও অপবিত্র হয়েছে সেখানে যাবার পরিকল্পনা আমি বাতিল করে দিয়েছি।

নিউইয়র্ক, ১২ অক্টোবর, ২০১১