ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

গত কয়দিন থেকে ব্লগ খুললেই চোখে পড়ে ব্যক্তি আক্রোশের ফুলঝুরি। মনে হয় কেউ একজন ভাগাড় খুলে বসেছে হঠাত করে, আর সেখানে কোটি-কোটি কাক-পক্ষি ভীড় জমিয়েছে। এদিকে জনপদের মানুষ-জন পালাবার রাস্তা খুঁজছে। এগুলো কি ভাল কাজ? মোটেও নয়। যিনি লিখেছেন, তার যেমন সময় নস্ট, যারা ক্লান্ত দিনের শেষে একটু ভাল-মন্দ পড়তে আসে তাঁদেরও সময় নস্ট। এসব পড়তে গেলে মনে হয় পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসছে। এই বিশ্বায়নের যুগে কোথায় মানুষে মানুষে ভ্রাত্রিত্ব-বন্ধন বাড়বে তাতো নয়, যেন গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধানো! কেউ একজন তার অভিমত প্রকাশ করলো, যে করেই হোক তাকে ছোট করতে হবে। এই যদি হয় আমাদের জাতীয় চরিত্র, তাহলে আমরা কিভাবে বড় কিছু আশা করতে পারি? অথচ মানুষ তো আমরা কম নয়, পাক্কা ষোল কোটি।

চ.বি-তে পড়ার সময় রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের বারান্দায় সব সময় একটি বড় ব্যানার ঝুলতে দেখতাম। রুশো’র উক্তি- “আমি তোমার মতের সঙ্গে একাত্ম হতে না পারি, কিন্তু আমি আমার জীবন দিয়ে তোমার কথা বলার স্বাধীনতা রক্ষা করবো”।

শত বছর আগে যে ব্যক্তিটি অনুরূপ কথা বলে যেতে পারে, আর শত বছর পরে নিজেদের ছবি আয়নায় দেখলে কি মনে হয়? অন্যকে খাটো করা মানে নিজের গণ্ডিকে ছোট করে ফেলা, আমরা কি ভুলে যাই? আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু নিজেদের জীবনে, কথা বলায়, আচার-আচরনে এর উল্টোটা প্রদর্শন করি। অপরের ছিদ্র অন্বেষণের আগে নিজের ছিদ্রগুলো সম্পর্কে কি সচেতন হওয়া উচিত নয়?

আস্তিক-নাস্তিকের দ্বন্দ্ব চিরকালের
আমরা যদি কয়েক হাজার বছরের মানব ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখবো আস্তিক-নাস্তিকের দ্বন্দ্ব সেই আদিম সমাজেও। এক দল চাইতো অতিপ্রাকৃত উপাদান, এমনকি চন্দ্রসূর্যকে উপাসনা করতে। আরেক দল তা মানত না। এখানে মনে পড়ছে একজন নাস্তিকের কথা। বাংলাদেশের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা মন্ত্রী অধ্যাপক আবুল ফজল। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন নাস্তিক। একবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। তার আমলে বিশাল আকারের চবি জামে মসজিদ তৈরি হয়। এখনো তার নাম ফলক রয়েছে জামে মসজিদের দেয়ালে। কিন্তু তার পরে যিনি উপাচার্য হন, তিনিও ছিলেন চট্টগ্রামের একজন ধার্মিক মানুষ। অধ্যাপক আব্দুল করিম। জামে মসজিদের জন্য বরাদ্দকৃত সিমেন্ট-রড চুরি করে ইনি চট্টগ্রাম শহরে নিজের প্রাসাদোপম অট্টালিকা তৈরি করেন। অবশ্য ১৯৭৬ সালের দিকে তার জেল-জরিমানা দুটোই হয়েছিল। অধ্যাপক আবুল ফজল অনেক সুখপাঠ্য বই লিখে গেছেন। যদি কখনো সময় পান তবে আস্তিক-নাস্তিকের দ্বন্দ্ব নিয়ে তার রম্য বই- “আয়না” পড়ে নেবেন। বইটি পড়বেন, আর হাসবেন, অথবা ঘেমে উঠবেন!

নাস্তিকের যুক্তি যতই অখণ্ডনীয় হউক, ধর্মের সামাজিক মূল্য কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আর সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়া কি কেউ কখনো বড় কাজ করতে পারে? এই অবামা’র কথা ধরুন- খ্রীস্টান সেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী হিসেবে শিকাগোর সাউথ সাইডে কালো মানুষের জন্য তিনি কাজ শুরু করেন। পরে এদের এলাকা থেকেই সিনেটর, অতঃপর প্রেসিডেন্ট! কাজেই মানুষ ভাল না বাসলে নেতা হওয়া যায় না। নাস্তিক মানুষ যতই সৎ এবং অকপট হউক, মানুষ নেতা হিসেবে কিন্তু কপট চরিত্রের লোককেই বেশি পছন্দ করে। এ কারনে ইতিহাসে ইব্রাহিম (আব্রাহাম), মুসা, ইসা, মুহাম্মদ অমর হয়ে আছেন। গ্যালিলিও’রা সত্য এবং বিজ্ঞানের কথা বলেন। তথাপি তাদের হেমলক পানে আত্মহুতি দিতে হয়।

এই প্রবাস জীবনে মনে করুন সন্তানদেরকে যখন বাঙালী সংস্কৃতির কথা বলি, তখন তা পরিপূর্ণতা পায় না। কেবল একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, কিংবা পহেলা বৈশাখের আয়োজনে বাঙালী মন ভরে না। আর সামাজিক কর্মকাণ্ড যেহেতু মহিলা কেন্দ্রিক, সে কারনে মসজিদের ফ্যামিলি নাইট’ কিংবা অন্যান্য কর্মকাণ্ডে মহিলারা খুবই সতঃস্ফুর্ত। কাজেই পুরুষ আস্তিক, কিংবা নাস্তিক তাতে কারো কিছু যায় আসে না। মহিলারা যেখানে, সেখানে তাদের যেতেই হয়।

ধর্মের সাবলীল পথ চলায় ব্যত্যয় ঘটলে মানুষ অনেক সময় বিদ্রোহ করতে পারে। এর উদাহরন সোভিয়েত রাশিয়া। ১৯৯১ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক পতনের এটিও একটি কারন। আবার একটি নাস্তিক দেশও প্রবল পরিক্রমে ভালো ভাবেই টিকে থাকতে পারে যুগ যুগ ধরে। যেমন মহা চীন। ১৯৯৯ সালে চীনা বিপ্লবের ৫০তম বার্ষিকীতে সেখানে যাওয়ার পর আমার এই উপলব্ধি আরো দৃঢ় হয়। সেখানকার ১২০ কোটি জনসাধারন তিনটি দর্শনে সমান ভাগে বিভক্ত। সবগুলোই নাস্তিক দর্শন। বৌদ্ধ, কনফুসিয়াসিজম এবং দাও’ইজম। প্রতিটি দর্শন অন্ততঃ আড়াই হাজার বছরের পুরনো। তিনটি দর্শনই কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এ কারনেই হযরত মুহম্মদ হয়তো বলেছিলেন- জ্ঞানার্জনের জন্য চীন দেশে হলেও যাও।

সব দর্শনের মূলকথা মানবতাবাদ
ধর্ম বলেন, দর্শন বলেন, মানবতাবাদ ছাড়া কিছুই টিকে থাকতে পারে না। তিন হাজার বছর আগে মুসা যেমন তার অনুসারীদের মানবতার পথে টেনে এনেছেন। একইভাবে ঈসা এবং মুহম্মদ (সঃ) সকল মানুষকে মানবতার পথে টেনেছেন। এবং এদের সবার স্বীকৃতি রয়েছে পবিত্র কোরানে। বৌদ্ধ অথবা হিন্দু ধর্ম আরব ভূখণ্ডের বাইরে বলে এদের স্বীকৃতি ছিল না পবিত্র কোরানে। আজ এই ব্লগে দেখি, যিনি ইসলামের জন্য জান-কোরবান করার জন্য তৈরি, তারও আদর্শ গুরু স্টীভ জবস অথবা বিল গেইটস। সবাই স্কুল পালিয়ে, গরীব থেকে বড়লোক হতে চায়! এদের জন্যই হয়তো লালন শাহ লিখেছেন- “তোরা আপন ঘরের খবর কেউ নিলি না”।

আমাদের সমাজেই কতো মানুষ নিজের জীবনকে উতসর্গ করে যাচ্ছেন মানবতার সেবায়, ইন্টারনেটের কূফলে আমরা তাদের ভুলতে বসেছি, অথবা অস্বীকার করছি। আজ আমাদেরই এক মহান কবি কাজী নজরুলের একটি গানের চরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করবো- “কারো মনে তুমি দিয়ো না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবা’র ঘরে। মানুষেরে তুমি যতো করো ঘৃণা, খোদা যান তত দূরে সরে।” অথচ এই নজরুলকে কাফের ফতোয়া দিয়ে গ্রাম ছাড়া করেছিল মোল্লারা!

নিউইয়র্ক, ২৬ অক্টোবর, ২০১১