ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

নোয়াম চমস্কিকে যারা চেনেন, তারা জানেন লোকটি কতোটা ঠোঁট কাটা। মূলত একজন ভাষাতত্ত্ববিদ। মনোবিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি। বিচরণ করেছেন রাজনীতিতে। আমেরিকান রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচক। তার তীক্ষ্ণ সমালোচনার কারনে নিজে ইহুদী হলেও ইসরাইলে তার প্রবেশাধিকার এখনো নিষিদ্ধ। তার মতামত ধারন করে বাম ঘরানাকে। নিজেকে তিনি দাবি করেন- “এনার্কো সিন্ডিকালিস্ট” হিসেবে। সিন্ডিকালিজম, যার অর্থ দাঁড়ায়- সমবায় ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রচলিত পুজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণীর “স্বব্যবস্থাপণা” এবং রাজনীতিতে “ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি” প্রবর্তনের পক্ষে এরা। এদের আদর্শ কমিউন ব্যাবস্থা হলো ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউন, কিংবা ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ১৯১৭ থেকে ১৯২১ পর্যন্ত সেন্ট পিটার্সবার্গের ক্রন্সতাদ, হাল আমলে আর্জেন্টিনার শ্রমিক আন্দোলনের জোর সমর্থক এরা। লিবারেটারিয়ান সোসিয়ালিজম বলতে এরা বোঝেন শ্রম দাসত্ব থেকে মানুষের মুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় কর্ত্রিত্তের বাইরে এক সমাজ ব্যাবস্থা। যেখানে কমিউন হবে সে সমাজের পরিপোষক। উনবিংশ শতকের মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের আদলে সিন্ডিকালিস্ট মতবাদ বর্তমানে জনপ্রিয় হতে চলেছে সমগ্র ইউরোপ এবং আমেরিকায়। বাড়ছে এ মতবাদে অনুসারীর সংখ্যা। “অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটের” পেছনে এবং প্রকাশ্যে এদের সাংগঠনিক ততপরতা রয়েছে বলে ধারণা। এরা মনে করে দেশে-দেশে ধনী ও শোষকের যে রাজনৈতিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, এর গালে থাপ্পড় মারার জন্যই “এনার্কো সিন্ডিকালিস্ট” মুভমেন্টের প্রয়োজন।

৮৩ বছর বয়সের চমস্কি গত ৫৫ বছর ধরে আমেরিকার সেরা ইউনিভার্সিটি এম আই টি (ম্যাসাচুসেট ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি) তে অধ্যাপনা করে আসছেন। ১৯২৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ইনি ফিলাডেলফিয়ার পেনসিলভানিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন ইহুদী স্কলার। তবে ঘরে তাদের প্রধান ভাষা ছিল ইদ্দিস। আইরিশ ক্যাথলিকদের ব্যাপারে ভীতি নিয়েই তার বাল্যকাল শুরু। ১৯৪৫ সাল থেকে দর্শনে তার লেখাপড়া শুরু। পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটিতে ওয়েস্ট চার্চম্যান, এবং নেলসন গুডম্যান ছিলেন তার দর্শনের অধ্যাপক। ১৯৪৯ সালে আরেক ভাষাতত্ত্ববিদ ক্যারল শ্যাতজ’কে বিয়ে করার পর তাদের দুটো মেয়ে ও একটি ছেলে। চমস্কি ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি এম আই টি’তে যোগ দেন এবং ১৯৬১ সালে অধ্যাপকে পদোন্নতি লাভ করেন। ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে সমগ্র আমেরিকায় জনমত তৈরি করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে ১৯৬৭ সালে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে “বুদ্ধিজীবীদের দায়” নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন। ভাষাতত্ত্ব এবং মনোবিজ্ঞানে তার অসামান্য অবদান সত্ত্বেও চমস্কি সমগ্র বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন একজন রাজনীতি তত্ত্ববিদ হিসেবে। দুনিয়ার প্রায় সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ডাক পড়ে বক্তৃতা দেবার জন্য। ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত হিউমানিটিস সাইটেশন ইনডেক্সে তিনি ছিলেন সবার শীষে। জীবিত কোন স্কলারের জন্য এ অর্জন বিরল। শতাধিক বইয়ের রচয়িতা চমস্কি সমসাময়িক বিষয়ের ওপর এখনো লিখে চলেছেন।

তিনি কোন প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাস করেন না, তবে তার আগ্রহ পশ্চিমা দর্শনে। তার দার্শনিক গুরু ব্রিটিশ স্কলার বার্টারেন্ড রাসেল, এবং আমেরিকান দার্শনিক জন ডেওয়ী। লাদেন হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন- আমাদের কেমন লাগবে যদি ইরাকী কমাণ্ডোরা জর্জ বুশের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে এবং তার মৃতদেহ আটলান্টিকে ডুবিয়ে দেয়?” জর্জ বুশের অপরাধকে তিনি বিন লাদেনের অপরাধের চেয়ে গুরুতর মনে করেন এবং বলেন- বুশের এই অপরাধ নাৎসি অপরাধের সমতূল্য। আমেরিকান মিডিয়াকে তিনি যুক্তরাস্ট্র সরকারের “কেনা গোলাম” বলে অভিহিত করেন। এটাকে তিনি অস্বাভাবিক বিবেচনা করেন না, কারন এ সব মিডিয়ার মালিকও কর্পোরেট হাউস; যাদের সার্থ দেখভাল করার দায়িত্ব যুক্তরাস্ট্র সরকারের। তারপরও তিনি মনে করেন আমেরিকাই দুনিয়ার সেরা দেশ, কারন স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং পথ চলা একমাত্র আমেরিকাতেই সম্ভব।

গত ২৮শে অক্টোবর যুক্তরাজ্য থেকে প্রচারিত ইন্টারনেট পত্রিকা পাবলিক সার্ভিস ইউরোপ ডট কম-এর এডিটর ডীন ক্যারল একটি সাক্ষাতকার ছাপেন চমেস্কি’র। তার কিয়দংশ আমি এখানে পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি।

চমস্কি’র সাক্ষাৎকার

ডীন ক্যারলঃ আমরা জানি আপনি বিন লাদেন বধ করা সম্পর্কিত ওবামা প্রশাসনের অনুসৃত নীতির বিরোধী। এ ব্যাপারে আপনি কি বলেন?
চমস্কিঃ আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেয়া যায় না। ইংলিশ-আমেরিকান আইনে এটাই রীতি। সন্দেহের অপরাধীকে ধরা, এবং তাকে বিচারের আওতায় আনার আগে তাকে তাকে হত্যা করা গুরুতর অপরাধ। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ এবং অভিযান আন্তর্জাতিক আইনেরও নীতি-লঙ্ঘন।

ডীন ক্যারলঃ পাকিস্তান এবং ইয়েমেনে ড্রন ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণকে কিভাবে দেখেন?
চমস্কিঃ এটা নীতি বিরুদ্ধ। এভাবে টার্গেট করে মানুষ হত্যার কোন যৌক্তিকতা নেই। বুশের সময়ও এটা চলেছিল। কিন্তু ওবামা প্রশাসন বিশ্বব্যাপী তা বৃদ্ধি করে আততায়ীর মতো গুপ্ত হত্যায় নেমেছে। এ সব অভিযান এমন সব মানুষের বিরুদ্ধে পরিচালনা করা হচ্ছে যাদেরকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মদদ দাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন দাড়াচ্ছে কোনটি সন্ত্রাসী কাজ? সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী, অথবা সন্ত্রাসী কায়দায় মানুষ হত্যা? তাহলে কোন কোন ক্ষেত্রে বুশের চেয়ে ওবামা প্রশাসনের অনুসৃত নীতি অধিকতর নিকৃষ্ট! আমরা জানি বুশ প্রশাসন সন্দেহের সন্ত্রাসীকে আটক অপহরণ করে গোপন কোন কারাগারে পাঠিয়ে দিত। সেখানে আটককৃতের সঙ্গে আর যাই হউক ভালো ব্যাবহার করা হতো না। সেখানে ওবামা প্রশাসন বুশের নীতিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে বলছে- আটক করো না, জেলে পোরো না, মেরে ফেল। প্রশাসনের মনে রাখা দরকার যে, এরা সন্দেহের মানুষ। ওসামা বিন লাদেনও তাই। ৯/১১-এর আক্রমণকারী, অথবা পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহ এবং সন্দেহের প্রমাণ দু’টো এক কথা নয়। ৯/১১ কমিশনের হাতে যে সব সাক্ষ্য, প্রমাণাদি এসেছে তা সরকারের দেয়া। আর সরকার তা সংগ্রহ করেছে কঠোর নিপীড়ন মূলক অবস্থার মধ্যে থাকা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে। কোন স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল এমন সাক্ষ্য-প্রমাণাদিকে গুরুত্ব দিত বলে মনে হয় না।

ডীন ক্যারলঃ লিবিয়ার বিষয়টিকে কিভাবে মূল্যায়ণ করেন?
চমস্কিঃ ব্রিটিশ, ফ্রান্স এবং আমেরিকা তিনটিই আগ্রাসন এবং আধিপত্য বিস্তারে ঐতিহ্যবাহী। এরা যোগ দিয়েছে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত একটি দেশের বিদ্রোহীদের সঙ্গে। এদের এই আগ্রাসনের সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তের কোন যোগসূত্র ছিল না। কিন্তু বৃহৎ এই তিন শক্তির ভূমিকা বিতর্কিত। বলা হয়ে থাকে এদের ভূমিকার প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। আসলে তা সঠিক নয়। এটা কোন জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ইস্যু ছিল না। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই এর বিপক্ষে। লিবিয়া আফ্রিকার একটি দেশ, আফ্রিকান ইউনিয়ন সমোঝোতা ও কূটনীতির পক্ষে বলেছে। তাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন সে সময় বেইজিং-এ একটি কনফারেন্স করে, তারাও কূটনীতি ও সমোঝোতার কথা বলে যুক্ত ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী এই শক্তি ত্রয়ী কোন কিছুই আমলে নেয়নি। লিবিয়া একটি গোত্র কিংবা উপজাতি প্রধান দেশ। সেখানে রয়েছে নানান গোত্র বিরোধ। এই বিরোধের জের ধরেই গৃহযুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদের উপস্থিতি। কে জানে সেখান থেকে এখন কী বেড়িয়ে আসে! অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে শরিয়া আইন অনুমোদনসহ নারী অধিকার হরণের ঘোষণা দিয়েছে। পশ্চিমের খুব কম লোকেই এসব বুঝতে পারে, সমস্যা এখানেও। অপরদিকে গাদ্দাফির বিরুদ্ধেও প্রচুর জনসমর্থন ছিল।

ডীন ক্যারলঃ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীনের উত্থান এবং পরিবর্তিত বিশ্বে ইউরোপ-আমেরিকার ভূমিকা কি হবে?
চমস্কিঃ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এখন যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, তাহলো পশ্চিমের অধোগতি এবং তার সঙ্গে চূড়ান্ত একটি ধারণা- বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে চীন এবং ভারত বেড়িয়ে আসছে কি-না। ধারণাটি তেমন যুক্তিযুক্ত নয়। চীনে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ঘটছে ঠিক। কিন্তু এগুলো অত্যন্ত গরীব দেশ। ইউরোপ এবং আমেরিকার মাথাপিছু আয়ের তুলনায় তাদের মাথাপিছু আয় অত্যন্ত কম। তাদের রয়েছে বহুবিধ আভ্যন্তরীণ সমস্যা। চীনকে এখন অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে মনে করা হলেও, এদের অর্থনীতি এখনো এসেম্বলী প্লান্টের (সংযোজন কারখানার) বেশি কিছু নয়। চীন, জাপান, কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি সত্যিকারভাবে নিরূপিত হলে তা ২৫ শতাংশ কমে যাবে। কারন শিল্পোন্নত ইউরোপ এবং আমেরিকা থেকে প্রযুক্তি এবং যন্ত্রাংশ ঢুকছে চীনে, এবং সেগুলো এসেম্বল্ড হয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে আবার শিল্পোন্নত দেশেই। যেমন আপনি যে আইপডটি কিনলেন বাজার থেকে, তার গায়ে যদিও চীন থেকে রফতানিকৃত লেখা, কিন্তু চীন থেকে খুব সামান্যই মূল্য সংযোজিত হয়েছে। তবে এটাও সুনিশ্চিত যে, চীনও প্রযুক্তির শীর্শে আরোহন করবে। চীনের রয়েছে জনসংখ্যা সমস্যা। তথাপি চীন উন্নতি করবে। কিন্তু ভারত সে তুলনায় একটি দরিদ্রপীড়িত দেশ। যার কোটি-কোটি মানুষ অবর্ণনীয় দুখ-দূর্দশার মধ্যে দিনাতিপাত করে। তবে আমাদের এই পৃথিবীটা ক্রমেই বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে। বৈচিত্র্যময়তা আর বহুজাতিকতার এক নতুন শতাব্দির দ্বারপ্রান্তে আমরা।

নিউইয়র্ক, ১০ নভেম্বর, ২০১১