ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

মানুষ পারে না, এমন কাজ কি এই পৃথিবীতে আছে? সম্ভবত নেই। মানুষের অসাধ্য এমন কিছু নেই। আর, এই যে আফ্রিকার কালো মানুষ- যাদের শক্তিমত্তা আর পৃথিবীকে বদলে দেয়ার কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান, উপাখ্যান তারা আবার জেগে উঠছে। এবার কেবল শক্তিমত্তায় নয়, মেধা-বুদ্ধি আর স্বকীয়তায়। প্রতি মে দিবসে যে গানটি সারা পৃথিবীময় উচ্চারিত হয়, তাও কালো মানুষদের নিয়ে। এবার তাদেরই সৃষ্টি গাঁথা তুলে ধরতে চাই বাংলাভাষী পাঠকের সামনে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। জাপানীদের ঠেকানো যাচ্ছিলো না মোটেও। বিশেষত চীন এবং বর্মায়। পর্বতসংকুল পরিবেশে যেখানে মানুষের চলাচল অসাধ্য, সেখানে সৈন্য-সামন্তের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করা চারটি খানি কথা নয়। বার্মা রোড দিয়ে যতটা সরবরাহ সম্ভব ছিল, তাও কাট করে দিল জাপানীরা বোমা মেরে। তাই রেঙ্গুন সমুদ্র বন্দর থেকে চীনের কুন্মিং পর্যন্ত বিকল্প সড়কের প্রয়জনীয়তা দেখা দিল। ১৯৪২ সালের ১লা ডিসেম্বর আমেরিকান নর্দার্ন কমাণ্ডের জেনারেল স্টিলওয়েল দায়িত্ব পেলেন সড়কটি নির্মানের। নির্মাণ করবে ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের কালো সৈনিকেরা। আসামের লেদো থেকে, বার্মা হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত প্রায় চার হাজার ফুট উচ্চতায় নদীর মতো একেবেকে চলা এক দুসাহসিক যাত্রাপথ। ৪৬ মাইলের মধ্যে ১৩’শ মোড় নিয়ে বিস্ময়কর উচ্চতায় উঠে গেছে সড়কটি।

১৯৪৫ সালে চিয়াং কাইশেক চীনের প্রেসিডেন্ট হলে তিনি এই সড়কটির নাম প্রস্তাব করেন এর জনক- জেনারেল স্টীলওয়েল-এর নামে। ১৫ হাজার মার্কিন সৈন্য এটি নির্মাণ করে যাদের অধিকাংশ ছিল আফ্রিকান আমেরিকান। আর সড়কটি নির্মাণ করতে মারা যায় এদের প্রায় এগারো’শ সৈন্য। স্থানীয় ৩৫ হাজার মানুষ দিনেরাতে কাজ করে এক হাজার মাইলেরও বেশি দীর্ঘ এ সড়কটির কাজ শেষ করেন ১৯৪৫ সালের শুরুতে। একই বছরের ১২ জানুয়ারি প্রথম কনভয় এ সড়কটি অতিক্রম করে। ৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে প্রথম ছয় মাসেই ১ লাখ ২৯ হাজার টন সামগ্রী পৌঁছে মিত্র বাহিনীর কাছে। ট্রাক-লরির হিসেবে এ সংখ্যা ২৬ হাজার। আসামের লেদো থেকে কুনমিং পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ১০৭৯ মাইল হলেও এটি বিখ্যাত হয়ে আছে এর প্রকৌশল বিস্ময়পনার কারনে। সর্বপোরি কালো মানুষের অবিশ্বাসযোগ্য শ্রম। আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ারিং রেজিমেন্ট ৪৫, এবং ৮২৩ এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটেলিয়ন প্রথমে এর কাজ শুরু করে। দুটোই আফ্রিকান-আমেরিকান ইউনিট। ১৯৪৩ সালের দিকে এদের সঙ্গে যোগ দেয় ৮৪৮, ৮৪৯, ৮৫৮ এবং ১৮৮৩ এই ব্যাটেলিয়ন, যাদের সবাই আফ্রিকান-আমেরিকান ইউনিট।

সর্বশেষ ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন আকাশ থেকে তার সঙ্গী আমেরিকান পাইলটকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- এটি কোন চাইনীজ নদী কি-না? চার্চিল স্বীকার করেছিলেন- কালো মানুষের পরিশ্রম ছাড়া এর নির্মাণ ছিল অসম্ভব।

১৯৫৫ সালে বন্ধ হওয়ার পর ২০০৭ সাল থেকে ভারত-বার্মা সড়ক সংযোগ পুনরায় চালু হলে ‘লেদো রোড’ আবার আলোচনায় আসে। বিশেষত লেদো সড়কের পাশে “লেইক অব নো রিটার্ন” পাংসাউ গিরিপথের পাশের হ্রদটি পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একে বলা হয় বার্মার ‘বার্মুদা ট্রায়াঙ্গাল’।

কথিত আছে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় এর উপর দিয়ে উড়োজাহাজ গেলে তা আর ফেরত আসতো না। বলা বাহুল্য পুরো লেদো সড়কটি এখন পর্যটন আকর্ষণ। এর সামরিক প্রয়জনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বলে রাখা প্রয়োজন- বার্মা, ভারত আর চীনকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে এই লেদো রোড। আবার ভারত মহাসাগরের উপর সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ভারত-চীনের বিরোধে এক ধাপ এগিয়ে আছে চীন কেবল এই লেদো রোডের কারনে।

নিউইয়র্ক, ২২ নভেম্বর, ২০১১