ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

ক্যানিবলিজমের তত্ত্বটিকে একেবারে উড়িয়ে দেবেন না। সাংবাদিকতায়তো অবশ্যই নয়। কাল রাতে প্রতিবেশি একজনের সঙ্গে কারাওকে গান করছিলাম। হঠাত গান শোনার ফাঁকে মনে হলো বিডিতে বাংলাদেশের সংবাদ দেখি। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সাগর-রুণি’র নিহত হওয়ার সংবাদ। গান বন্ধ করে আমার প্রতিবেশি দম্পতি এবং স্ত্রীকে দেখাচ্ছিলাম সংবাদটি। এরপর ঘন্টা খানেক সময় ধরে বাংলাদেশে রান্নাঘরের গ্রীল কাটা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা। রাত একটার দিকে ঘুমোতে যাওয়া। কিন্তু আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় তিনবার। কেবল দেখি মূমুর্ষ সাগরের হাত-পা বাঁধা।

অবশ্য আরো কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে ঢুঁ মেরেছিলাম ঘটনার বিশদ জানার জন্যে। বার্তা২৪-এর একটি সংবাদে আমার চোখ আটকে যায়। সংবাদটি ছিল “মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে অস্থিরতা”। অস্থিরতার কারন- সেখানে বেশ কিছু সংবাদ কর্মী ছাঁটাই এবং পদত্যাগের ঘটনা ঘটছিল। যেখানে সাগর ছিলেন বার্তা সম্পাদক। আমার আধো ঘুমের পুরো রাত এই জঘণ্য হত্যাযজ্ঞের কারন অনুসন্ধানের চেষ্টা করি।

গ্রিল কাটা

ঢাকায় রান্নাঘরের গ্রীল কাটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আমার আট বছরের ব্যাচেলর জীবনে কোনদিন গ্রীল কাটার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু যেই বিয়ে করলাম, তিন বছরের সংসার জীবনে দুটি বাসায় গ্রীল কাটার শব্দে আমারই প্রথম ঘুম ভাংলো। দুটি বাসা’ই ছিল নীচ তলায়। নীচ তলায় ভাড়া কম গুণতে হয় তাই। দু’টি ফ্ল্যাট বাড়িই ছিল কাঁটা তারে সুরক্ষিত। দ্বিতীয়টির জানালার গ্রীল কাটতে গেলে দেয়ালের উপর ভাঙ্গা কাঁচ এবং দু’ফুটের কাঁটা তার ডিঙতে হতো। “গ্রীল-কাটার”দের কী দুঃসাহসিক অভিযাত্রা! সেবারও আমার ঘুম ভাংলো। তখন আমি বাংলাবাজার পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক। দুর্বৃত্তদের হয়তো জানা ছিল না- আমিও রাতের চৌকিদার! অথবা তারা হয়তো জেনেশুনেই কোন মিশন নিয়ে এসেছিলো।

ক্যাণীবল তত্ত্ব

সাংবাদিকাতায় ক্যাণীবলিজমের চর্চা হয়, এটা অনেকেই মানতে চান না। কিন্তু হয়, বিশ্বের সর্বত্র- এমনকি সিএনএন-এ পর্যন্ত। কিন্তু আমাদের দেশের মতো এতো গ্রস নয়। আমি সংবাদে চাকরি নেয়ার আগের ঘটনা। একবার মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলাবাজার পত্রিকায় ইস্তফা দিয়ে নিজেই একটি ট্যাবলয়েড (মানব জমিন) বের করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। কেউ-কেউ হয়তো মতি ভাইকে খুশি করার জন্য বাংলাবাজার পত্রিকায় শেষমেশ একটি “অসস্থিকর পরিবেশ” সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় আমার ধানমন্ডি ১৪ নম্বরের বাসায় এক সকালে তিনজন ‘মাসল্ম্যান সাংবাদিক’ এলেন। এরা আমারই সহকর্মী জুনিয়র। আজ এতো বছর পর এদের নাম বলে এদেরকে খাটো করার অভিপ্রায় আমার নেই। নামে কি-বা আসে যায়! যাকগে, আমার নব পরিণীতা স্ত্রী এদেরকে সাধ্যমত চা-বিস্কুটে আপ্যায়ণ করলেন। এরপর এরা আমাকে প্রশ্ন করলো- আমি কেন মতি ভাইয়ের সঙ্গে মানব জমিনে গেলাম না? আমি আমার যুক্তি দেখালাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম- আমার যুক্তি এদের পছন্দ হয়নি। তথাপি আমি দুঃখ প্রকাশ করলাম, মতি ভাইয়ের সঙ্গে যেতে না পারার কারনে। এদের একজন আমাকে অনুরোধ করলো তাকে যেন কাছের দোকান থেকে ক’টি বেনসনের শলাকা কিনে দেই। আমাদের দেশে তখন চা-নাস্তার শেষে বেনসনের শলাকায় অগ্নি প্রজ্জলনের রীতি। আমি নিজে ধূমপায়ী না হলেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু সিগারেটের দোকানে যে আমার জন্য “ক্যানিবলিজম”-এর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল তা তখনো বুঝতে পারিনি। এদের একজন আমার গায়ে হাত তুলে ব্যাঙ্গ করে বলতে থাকলো আমি নাকি মতি ভাইয়ের চেয়ে বড় সাংবাদিক হয়ে গেছি। দুর্ভাগ্য আমার। কয়েক মাস পর দেখলাম- এদের একজন একটি টিভি চ্যানেলের প্রধান সংবাদ পাঠক। আর দু’জন সম্ভবত এখন লন্ডনে। একবার একজন রাস্তায় একাকি আমাকে পেয়ে পায়ে ধরে মাফও চাইলো। আমি মাফ করে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। আর বললাম- আপনার কোন দোষ নেই। পৃথিবীতে অনেক প্রাণী বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে এটা করে! কিন্তু ক্যাণীবলিজমের স্মৃতি আমার মন থেকে যায়নি।

এবার সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় গিয়ে মানুষ-জন নিয়ে অনেকটা বেপরোয়া ঘুরে বেড়িয়েছি মধ্যরাত অবধি। আমার আত্মীয় এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন- ঢাকা আর আগের মতো নেই। এখানে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সার্থপর! আমি বিশ্বাস করতে চাইলাম না। সম্ভবত জার্মানী থেকে দেশে ফিরে সাগরও সেটা বিশ্বাস করতে চাননি!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ছিলাম রাজনৈতিক কর্মী। রাজনীতিতে গুঁতোগুঁতির ঠেলায় এসেছিলাম সাংবাদিকতায়। হায়রে- এখন দেখি এখানেও গুঁতোগুঁতি, এখানেও ক্যাণীবলিজম? নির্বিবাদী মানুষগুলো তাহলে দাঁড়াবে কোথায়?

নিউইয়র্ক, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২