ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

সম্ভবত ২০০১ সালের কোন এক দিনে প্রথম আলো’র ভেতরের পাতায় মুন্নীসাহার একটি রম্য-গদ্য প্রকাশিত হয় সাংবাদিক বানানোর কারিগরদের নিয়ে। লেখাটি পড়ে লজ্জা পেয়েছিলাম, আর আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে পেয়েছিলাম খানিকটা। মুন্নী আর আমার সাংবাদিকতার শুরু একই সময়ে একই টেবিলে বসে। ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনের পর তত্তাবধায়ক সরকার পত্রিকা প্রকাশনার বিধিনিষেধ তুলে নিলে “আজকের কাগজ” বের হয় গণতান্ত্রিক জমানার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ইনকিলাব-ইত্তেফাকের বিপরীতে একেবারে নবীন, আর আনকোরাদের নিয়ে যাত্রা শুরু হয় আজকের কাগজের। নাইম ভাই ছিলেন এর নেতৃত্বে।

আমি ছিলাম সেই আনকোরাদের দলে। ছোটবেলা থেকে বাড়িতে পত্রিকা পড়া, কিছু লেখা-লেখি এবং ছাত্র সংগঠনের কর্মী হিসেবে প্রেস রিলিজে আমার হাতেখড়ি। চট্টগ্রামের আজাদী, পূর্বকোণ এবং নয়াবাংলা ছাড়া আর কোন পত্রিকা অফিস আমি চিনতাম না। ইংরেজী পড়তে পারি, খানিকটা অনুবাদ করতে পারি- এই আমার দক্ষতা। নিজের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করার ক্ষমতা তখনো পাকা নয়। তথাপি এ নিয়েই আমার প্রথম চাকরি সহ-সম্পাদকের। প্রথম আলো’র মতিউর রহমান ছিলেন আজকের কাগজের বিশেষ প্রতিনিধি। আর মানব জমিনের মতিউর রহমান চৌধুরী ছিলেন এর কলাম লেখক।

গণতন্ত্র বিকাশের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষের মত ও পথের বিকাশ অবধারিত। সে কারনেই মিডিয়া বিকশিত হয়েছে বাধ-ভাঙ্গা স্রোতের মতো। সংবাদপত্র মানুষের আশা-আকাংখার প্রতীক। কিন্তু সেই আশা-আকাংখার হয়তো পুরো প্রতিফলন ছিল না ইত্তেফাক কিংবা ইনকিলাবে। সে কারনে মানুষ খুব সহজে হজম করতে থাকে আজকের কাগজের প্রতিটি বর্ণ। আজকের কাগজ যে কঠিন-কঠোর সাংবাদিকতার রীতি মেনে প্রকাশিত হতো, তা নয়। কিন্তু ভাবে, ভঙ্গিতে আর আঙ্গিকে ছিল অভিনবত্ব। তথাপি এক দশকের মধ্যে আমরা দেখছিলাম সাংবাদিকতা পেশাদারিত্তের হাত ছেড়ে বনিকের হাতে চলে গেছে। আর বনিকের হাতে এই ধারালো অস্ত্রটিকে কিন্তু নিয়ে গেছেন পেশাদার সাংবাদিকরাই। কেবল রুটি-রুজির খায়েশে!

মুন্নী সাহার নিবন্ধটি ছিল এ রকমের- সম্পাদক ডেকে ডেকে সাংবাদিক বানাচ্ছেন- ‘এই তোরা কে কে সাংবাদিক হবি আয়’! রিপোর্টার গিয়েছেন একটি অফিসে সংবাদ সংগ্রহে। অফিসের কর্তাব্যক্তি তার পিয়নকে ডাকছেন- “এই সাংবাদিক এক কাপ চা দিয়ে যা এখানে”।

মুন্নী সাহার নিবন্ধটি যখন প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়, তখন সেটি মতিউর রহমানের হাত থেকে চলে গেছে তৎকালীন ট্রান্সকম (অর্থাৎ ফিলিপস)-এর হাতে। বাংলাদেশে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা কতটুকু, তা আপনারাই ভালো জানেন। যদি থাকতো তাহলে হয়তো জানা যেতো- পত্রিকা, কিংবা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অর্থের উৎস কোথায়। বছরের পর বছর লোকসান গুণেও এগুলো টিকে থাকে কেমন করে? কি করে ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মিডিয়ার অনুমোদন নিয়ন্ত্রিত হয়?

যেটা বলছিলাম- বনিকের লোভ ধীরে-ধীরে বিস্তৃত হয়েছে আমাদের মিডিয়ায়। বনিকের আকাঙ্ক্ষা- তার পণ্যটি কত কম খরচে ক্রেতার হাতে পৌঁছানো যায়। আর পণ্যটি যদি অন্যান্য আর্থিক উৎস সৃষ্টিতে (অথবা সংরক্ষণে) কাজে লাগানো যায়, তাহলে তো কথাই নেই! প্রথম উদেশ্য সাধন করে বনিক ধাবিত তার দ্বিতীয় লক্ষ্যে। অর্থাৎ অবৈধ সম্পদকে পাহাড়া দেয়ার জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করা। মনে পড়ে কবি হাসান শাহরিয়ার একেই বলেছিলেন- ধনীর বাড়ির নেড়ি কুকুর। পরম বিশ্বস্থততায় সামান্য উচ্ছিষ্টের বিনিময়ে কালো টাকার পাহাড়াদার!

নীতিজ্ঞান বলে- একজন সাংবাদিক নিজেকে বিচারকের আসনে বসাতে না পারলে তার এ পেশায় থাকা উচিত নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাংবাদিকের হাতে থাকা বিচারের মানদণ্ডটি আজ চলে গেছে বনিকের হাতে। বনিকের এই তোলাদণ্ডে যদি খোদ সাংবাদিক নাজেহাল হয়, চাকরি হারিয়ে, সংসার খরচ- বাড়িভাড়া দিতে না পেরে চলন্ত বাসের নীচে নিজের অজান্তে বেঘোরে প্রাণ দেয়, তাতে আমি বিস্মিত হই না। আমি বিস্মিত হই, যখন দেখি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কত নিম্ন প্রজাতির প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়! পৃথিবীতে মানুষ কতভাবেই বেঁচে থাকে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাসে ছাই ছুঁড়ে বেঁচে থাকার সার্থকতা কোথায়?

নিউইয়র্ক, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২