ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

নেলসন ম্যান্ডেলা নামটির সঙ্গে আমার পরিচয় সেই ১৯৮৮ সালে। রুবেন দ্বীপে ম্যান্ডেলার কারাবাসের ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে সাপ্তাহিক একতা পর-পর কয়েক সংখ্যা বিশেষ প্রতিবেদন ছাপে। দেশবাসী প্রথম জানতে পারল ম্যান্ডেলা নামের এক কালো নেতা দক্ষিণ আফ্রিকার কারাগারে মানুষের মুক্তির প্রহর গুণছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র পিয়াসী মানুষের কাছে চির প্রেরণার এই মানুষটি।

মতিউর রহমানের সম্পাদিত সেই একতা’র ২৫ কপি বিক্রির দায়িত্ব ছিল আমার। এক টাকা দামের একতা প্রতি সপ্তায় বগল দাবা করে পৌঁছে দিতাম আলাওল হলের চব্বিশটি কক্ষে নগদে। টাকা হাতে-নাতে পৌঁছে দিতাম একরামের হাতে, আর একরাম সে টাকা পৌঁছে দিত একত্রে পুরনো ঢাকার একতা অফিসে। আমার নিজের কপিটিও ছিল এক টাকায় কেনা। বিক্রির কোন কমিশন ছিল না। একরামও কমিশনের কানাকড়ি পেত না। দেশের প্রতি ভালবাসা, আর বদলে দেয়ার প্রতিশ্রুতিই ছিল আমাদের একমাত্র কমিশন।

আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল- আমরা সবাই ম্যান্ডেলা হবো। ম্যান্ডেলার মতো পুড়ে-পুড়ে খাটি সোনা হবো, আর বদলে দেবো প্রিয় স্বদেশ ভূমিকে! দূর্ভাগ্যক্রমে আজ আর ‘মেহনতি মানুষের পত্রিকা’ চোখে পড়ে না। আজ চোখে পড়ে মাফিয়াদের বাচিয়ে রাখার পত্রিকা! সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে প্রভুভক্ত কুকুরের মতো- কি করে দেশে সংখ্যালঘুদের শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখা যায়!

বলছিলাম ম্যান্ডেলা’র কথা। মনে পড়ে উইনী ম্যান্ডেলার কথা। প্রিয় স্বামীর প্রতিক্ষায় যৌবন যে কবে বালির বাঁধের মতো উত্তাল সাগরে বিলীন হয়ে গেছে, সেটাও জানা ছিল না তার! আজ আবার ম্যন্ডেলার কথা মনে হলো ‘ইনভিক্টাস’ ছবিটি দেখে।

১৯১৮ সালে জন্ম ম্যান্ডেলা ১৯৪৮ সালে রাজনীতিতে সক্রিয় হন আফ্রিকান ন্যাশনাল পার্টির বিজয়ের পর। ১৯৫২ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠনের পর সরকারের বর্ণবাদ নীতির প্রতিবাদ করতে থাকেন। একই সময় তিনি এএনসি’র আর্মড গ্রুপের প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৬২ সালে গ্রেফতারের পর তাকে দ্বীপান্তরে কারাবাস দেয়া হয়। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ম্যান্ডেলার মুক্তি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বেগবান করে। ১১ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে তার মুক্তির দৃশ্যটি সারাবিশ্বে লাইভ টেলিকাস্ট করা হয়। ১৯৯১ সালে এএনসি’র প্রথম উন্মুক্ত কনফারেন্স হলে ম্যান্ডেলা এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে ৬২% ভোট পেয়ে ম্যান্ডেলা হন দেশের প্রথম কালো প্রেসিডেন্ট। কর্তৃত্ব পিয়াসী সংখ্যালঘু সাদা’রা তাকে ভোট দেয়নি। তাতে কী? ম্যান্ডেলা সারা বিশ্বের সব মানুষের নেতা! এর আগে ১৯৯৩ সালে তিনি লাভ করেন নোবেল শান্তি পুরষ্কার।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
আজ বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জীবনে এক অবিশ্বাস্য অনিশ্চয়তা ভর করেছে। দেশটি কি এগোবে, না পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহে হারিয়ে যাবে এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো! যেমন ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ বিরোধী মুক্তি আন্দোলন, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের স্বাধিকার এবং ১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক মুক্তি আন্দোলন! আজ সীমিত গণতন্ত্রের সুযোগেও সামাজিক প্রগতির সূচকগুলো যখন ঊর্ধমূখী, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যখন দূর্নীতিবিরোধী, জবাবদিহিতার দাবি প্রকট হচ্ছে, তখন মেহনতী-গরিব মানুষের আরো একটি ঐক্যের ভীষণ প্রয়োজন! সমগ্র ভারত-বর্ষে, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারত এবং বাংলাদেশের মানুষ মাফিয়াদের শাসন থেকে মুক্তি চায়। মানুষ চায়- রাজনীতিবিদরা মাফিয়াদের তাবেদারি করবেন না, সেবক হবেন জনগণের। আজ সার্থান্ধ ও দল-উপদলে বিভক্ত মানুষকে সংগঠিত এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে উজ্জীবিত করার জন্য এমন একজন ম্যান্ডেলার জন্ম বাংলাদেশে হলে, এই ষোল কোটি মানুষের নেতা পরিণত হবেন ১৬০ কোটি মানুষের নেতায়। কারন মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের মধ্যে সর্বাধিক ঊর্বরা। এই বাংলাদেশ বুদ্ধি আর সাহস যোগিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে এই উপমহাদেশকে গত দু’শ বছরের সঙ্কট আর সঙ্কোচে!

মুভি ইনভিক্টাস (invictus)
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাস্ট্রে মুক্তি পাওয়া ক্লিন্ট ইস্টউডের পরিচালিত ছবি ইনভিক্টাস মূলত একটি স্পোর্টস মুভি। জন কার্লিনের লেখা বই- “প্লেয়িং দ্যা এনিমিঃ নেলসন ম্যান্ডেলা এন্ড দ্যা গেম দ্যাট চেঞ্জ দ্যা নেশন” ছবিটির ভিত্তি। ছবিতে মর্গ্যান ফ্রিম্যান এবং ম্যাট ড্যামন যথাক্রমে অভিনয় করেছেন ন্যালসন ম্যান্ডেলা এবং ফ্রাঙ্কুইস পিয়েনার-এর নাম ভূমিকায়। ইনভিক্টাসের আভিধানিক অর্থ “অপরাজেয়”। টাইটটাইটেলে ব্যবহৃত হয়েছে উইলিয়াম আর্নেস্ট হ্যানলি’র (১৮৪৯-১৯০৩) বিখ্যাত কবিতা “ইনভিক্টাস”। ছবিটি যেমন সত্য ঘটনার ওপর নির্মিত, তেমনি কবিতারও রয়েছে সত্যিকার ইতিহাস!

২৭ বছর কারাবাসের পর ১৯৯০ সালে মুক্তি পেলে নেলসন ম্যান্ডেলার সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল কালোদের মন থেকে সাদা’দের ভয়ভীতি দূর করা এবং সাদা-কালোর ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা রাগবি বিশ্বকাপের আয়োজক। দেশটি এই আয়োজন সফল করতে পারবে কি-না, না কি গত পঞ্চাশ বছরের সাদা-কালো হাঙ্গামার ধারাবাহিকতায় সবই ব্যর্থতায় পর্যবশিত হবে! আন্ডারডগ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়তো সেমিফাইনালে যাবার ক্ষমতা নেই। তথাপি চ্যম্পিয়ণ হতে পারলে এই একটি খেলাই হবে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য যথেস্ট! ম্যান্ডেলা সেই সপ্নে বিভোর! বৈঠক করলেন সাদা কোচ পিয়েনারের সঙ্গে আর তাকে শোনালেন “ইনভেক্টাস” কবিতাটি। যে কবিতা তাকে উজ্জীবিত করেছে তার দীর্ঘ কারা-জীবনকে। সাদা-কালো খেলোয়াড়ের টীম কোচ ২৮ বছর বয়সী পিয়েনার মনযোগে শোনলেন কবিতাটি!

Out of the night that covers me,
Black as the pit from pole to pole,
I thank whatever gods may be
For my unconquerable soul.
In the fell clutch of circumstance
I have not winced nor cried aloud.
Under the bludgeoning of chance
My head is bloody, but unbowed.
Beyond this place of wrath and tears
Looms but the Horror of the shade,
And yet the menace of the years
Finds and shall find me unafraid.
It matters not how strait the gate,
How charged with punishments the scroll,
I am the master of my fate:
I am the captain of my soul.

পিয়েনারের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো রাগবি’তে। সারাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে করলো বিজয়ের উল্লাস! বিজয়ের আনন্দে কালোদের মন থেকে দূর হলো সাদা’দের প্রতি অবিশ্বাস!

একটি কবিতা’ই যথেস্ট
একটি জাতিকে উজ্জীবিত করার জন্য একটি কবিতাই যথেষ্ট। উইলিয়াম আর্নেস্ট হ্যানলি’র বাঁ পা’টি পক্ষাগাতে আক্রান্ত হয়। বারো বছর বয়সে ডাক্তাররা উপদেশ দিলেন বাঁ পা’টি হাঁটু থেকে না কাটলে সারা শরীর আক্রান্ত হয়ে যাবে। একটি পা নিয়ে শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও তিনি কর্মচঞ্চল জীবন অতিবাহিত করেন। বাঁচেন ৫৩ বছর। ২৬ বছর বয়সে তিনি লেখেন তার এই বিখ্যাত কবিতা, যা এখন অক্সফোর্ডের ইংরেজি সাহিত্যে পড়ানো হয়। আসুন আজ সবাই মিলে উচ্চারণ করি- “আই অ্যাম দ্যা মাস্টার অফ মাই ফেইটঃ আই অ্যাম দ্যা ক্যাপ্টেইন অফ মাই সউল”!

নিউইয়র্ক, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১২