ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া উভয়ই আমাদের দুই কূলের নেত্রী। একজন জলে থাকলে, আরেকজন ডাঙায়। একজন নদীর ওপারে থাকলে, আরেকজন এপারে। একজন রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইলে, আরেকজন ভাটিয়ালি। একজন যদি বলেন আমি মুক্তিযোদ্ধা, আরেকজন বলবেন আমি রাজাকার। একজন যদি বলেন দেশ এখন প্রভাতের আলোর মুখ দেখছে। আরেকজন নির্দ্বিধায় বলবেন দেশের এখন বারোটা বেজে তেরোটা বাজার উপক্রম! একজন যদি বলেন আমি শান্তির কপোত ওড়াবো, তখনই আরেকজন বলবেন- কপোতের ডানা আমি ভেঙ্গে দেবো! হাসিনা যদি বলেন কৃষকের ঘরে ঘরে এখন প্রগতির আশ্বাস! খালেদা বলবেন- দেশের কৃষক কূলের আজ নাভিশ্বাস! একজন যদি বলেন ‘আমার সোনার ছেলেদের হাতে এখন কেবল বই-খাতা’। আরেকজন তখন পত্রিকার ছবি তুলে ধরে বলবেন- এই লাঠি-রামদা হাতে ছেলেগুলো কার ছেলে-ভাগ্নে গো?

গত কুড়িটি বছর কিংবা তারো আগে থেকে খালেদা-হাসিনার এই বৈপরীত্য দেখে দেখে অভ্যস্থ বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের মানুষ এখন ধরে নিয়েছে- জল আর তেল যেমন একত্রে মেশে না, এই দুই নেত্রীর কথাও আর কোনদিন এক হবে না। কারন……। কারন দু’জনেই দুই জগতের বাসিন্দা। কিন্তু এদের স্বপ্ন এক। এরা দু’জনেই একই চাঁদের পাল্কি চড়ে ঘুরে-ফিরে আসেন বাংলাদেশের চির অবহেলিত, আধ পেটা, দীন-হীন কৃষক মজুরের স্বপ্নের সোনার বাংলায়। একদা যেখানে ছিল গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ। ছিল ভায়ে-ভায়ে ভ্রাতৃত্ব, পিতার স্নেহ, আর চির সোহাগী মায়ের স্নেহের আঁচল!
মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন ছাড়া মানুষের জীবন অর্থহীন। যে যতই অন্ধকার, আর নিরন্ন কুঠিরে থাকুক স্বপ্ন তাকে দেখতেই হবে। স্বপ্ন ছাড়া বাহুতে জোর আসে না। জোস আসে না পুরুষের পৌরুষে। স্বপ্ন ছাড়া নারীত্বের কমনীয়তা পেখম মেলে না। স্বপ্ন মানুষকে জেগে উঠতে, ভেঙ্গে ফেলতে, বদলাতে আর সৃষ্টিতে তাড়িত করে। তাইতো হাসিনা এবং খালেদা আমাদের স্বপ্ন দেখান! আমরা স্বপ্ন দেখতে বাধ্য হই। এ স্বপ্ন দেখাতে তারা জীবনের রিস্ক নেন, অঢেল অর্থ খরচ করেন। নিজের গাঁটে না থাকলে হাত পাতেন প্রতিবেশি, পরবাসী বন্ধু-বান্ধবের কাছে। তবু তারা স্বপ্ন দেখান, এবং বাংলাদেশের মানুষ অনন্যোপায় হয়ে স্বপ্নের ছেঁড়া তেল-চিটকে বালিশে প্রতিদিন মাথা রাখে!

স্বপ্নের জোশে অঘোষিত হরতাল নেমে আসে। অসহায় রোগী কাতরাতে থাকে শহরের পথে এম্বুলেন্সে! সন্তানের জন্ম দিয়ে কত মাতা বেঘোরে প্রাণ হারান ট্রাফিক জ্যামে! কত ব্যবসায়ী কর্মচারীর বেতন দিতে না পেরে গুটিয়ে দেন তার জীবন-নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন! কত শিল্পপতির শিল্প কারখানায় নেমে আসে লে-অফ! এদের পক্ষে আইন-আদালতের দ্বারস্থ হন না হাসিনা-খালেদা কেউই। তবু দেশে নতুন-নতুন ব্যাঙ্ক হয়। পুঁজি লগ্নির জন্য মাফিয়া সদৃশ কূবের’রা দু’নেত্রির দ্বারস্থ হন। সে সব ব্যাঙ্ক ফটকা বাজারে অর্থ ঢালে। নিজের এবং ব্যাঙ্কের অর্থ খুইয়ে হাজার-হাজার মানুষ পথে বসে! সরকার ব্যাঙ্কগুলোকে নিরন্ন মানুষের ট্যাক্সের পয়সা অনুদান দিয়ে আবার চাঙ্গা করে। হরতালের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ‘বলদ জনগন’ লঞ্চে, বাসে, ট্রেনে ওঠে পঙ্গপালের মতো। আর সে লঞ্চ-বাস ডুবে-এক্সিডেন্টে মারা যান এরাই। তখন হয়তো স্বপ্ন দেখানোর মহরত শেষে নেতানেত্রীরা শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে খানিকটা আহলাদে জড়িয়ে পড়েন!

দেশের এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও মানুষ এদের কথা শোনে, জড়ো হয় নতুন কিছু পাওয়ার আশে। কিন্তু আমি এদেরকে খুঁটিয়ে-খুটিয়ে দেখি। এদের কিছু-কিছু উক্তি এবং কার্যকলাপ হাসির উদ্রেক করে। বালখিল্যতা ধরা পড়ে। তথাপি নিজেকে থামাই!

খালেদা জিয়ার খিল-খিল হাসি
গোলাম আযম, সাঈদী গং দের মুক্তির শ্লোগান বেলুনে উড়তে দেখে ফাগুনের সেই সোনা ঝরা বিকেলে খালেদা জিয়া খিল-খিল করে হাসছিলেন। কিন্তু মুখে তিনি একটি বারের জন্যেও এই আলবদর কমান্ডারদের মুক্তি দাবি করলেন না! খালেদা জিয়া তার একাত্তরের অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো এই রক্তচোষাদের জানেন। তাই কেবল ভোটের প্রয়োজনে তিনি এই রক্তচোষাদের জোটে ভিড়িয়েছেন। খালেদা জিয়া তার খিল-খিল হাসিতে এই ম্যাসেজটুকুই দিয়েছেন জাতিকে। ধন্যবাদ খালেদা জিয়াকে!

শেখ হাসিনার আশাবাদ
শেখ হাসিনা গতকাল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জাতি তাকে আরেকবার ভোটে নির্বাচিত করলে ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে অমিমাংসিত সমুদ্র চুক্তিটিও তিনি বাগিয়ে আনবেন। ধন্যবাদ শেখ হাসিনাকে। দেশের কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করে তিনি এখানে ‘যদি’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। অন্য সময় হলে হয়তো বলতেন- জনগন অবশ্যি আওয়ামী লীগকে আবার ভোটে নির্বাচিত করবে! এখানেও শেখ হাসিনা যে হাঁসির ঝলক উপস্থাপন করেছেন, যে কোন মানুষের অন্তরে তা ছায়াপাত করবে!

নিউইয়র্ক, ১৫ মার্চ, ২০১২