ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

একটু আগে মানিক ভাইয়ের কল পেয়ে হৃৎপিণ্ডটা আবার আরেকটু কেঁপে উঠলো। মুখ থেকে কথা বেরুচ্ছে না মানিক ভাইয়ের! এক সময়ের রাজনৈতিক ছড়াকার। সোডার বোতল খুললেই যেমন প্রচলিত সমাজ আর ঘুনে ধরা রাজনীতির বিরুদ্ধে ফস-ফস করে অগ্নিঝরা কথার ধোঁয়া উড়তে থাকে। বুঝতে পারলাম টেলিফোনের ওপর প্রান্তে কান্নার রোল! এ প্রান্ত থেকে আমি অভয় দিতে থাকি মানিক ভাইকে- বলুন, প্লিজ বলুন, যত খারাপ সংবাদই হোক বলুন! শেষমেশ কি-না এই সংবাদ, মিনার ভাই আর নেই। এই মানিক রহমান ২০-২২ বছর বয়সে বিচিন্তার প্রুফ রিডার থেকে শুরু করে এর একাউন্টেন্ট, ব্যবস্থাপক, কখনো প্রক্সি রিপোর্টার।

১৯৯১ সালে চবি থেকে বেরিয়ে, রাস্তায়-শ্লোগানে এরশাদের পতন ঘটিয়ে, ঢাকায় যখন জীবিকার অন্বেষণ করছি; এক দুপুরে দেখা হয়ে যায় মিনার ভাইয়ের সঙ্গে কাকরাইলের অফিসে। মিনার ভাই বললেন একটি লেখা দিতে। আমার জীবনের প্রথম রিপোর্ট- চবি’তে জামাত-শিবিরের উৎপাত সংক্রান্ত। এর দুয়েক দিনের মধ্যেই আমার প্রথম চাকরি আজকের কাগজে। সেদিনই প্রথম পরিচয়- এক দ্রোহী তরুণ মিনার ভাইয়ের সঙ্গে! মিনার ভাইয়ের সব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সব সময় একমত ছিলাম না। কিন্তু তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জীবনে আপোষ করেছেন বলে শুনিনি।

দৈনিক পত্রিকায় কাজের তাড়ায় এরপর মিনার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হতো কখনো-সখনো। তবে খোঁজ খবর পেতাম তার অনুজ মেহেদীর কাছ থেকে। মেহেদী তখন বাংলাবাজার পত্রিকার খন্ড কালীন রিপোর্টার। মিনার ভাই শেষাবধি পাড়ি জমিয়েছেন আমেরিকায়।

২০০১ সালে নিউইয়র্কে এসে প্রথম তিন মাসে সাত চাকরি বদল। এর মধ্যে এক ফাঁকে ‘এখন সময়’ নামে একটি সাপ্তাহিকে মাস খানেকের চাকরি। পত্রিকাটি যেদিন বেরুতো, তার আগের দিন মিনার ভাই আসতেন বিকেলে। ঝটপট লিখে দিয়ে যেতেন, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো নিয়ে। সে সময় পত্রিকাটিতে ধারাবাহিকভাবে বেড়িয়েছিল- তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে মিনার মাহমুদের বন্ধুত্ব, ভালবাসা আর প্রণয়ের কতকথা! আমার শরীরে তখনো বাংলাদেশের কাঁদা মাটির সোঁদা গন্ধ। মিনার ভাই আমাকে বললেন মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা- ” জহির, এই আমেরিকায় অনেকে আপনাকে অর্থ-কড়ি দিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন, সেই আপনার সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী যে আপনাকে জীবন-জীবিকার পথ চিনিয়ে দেবে।” এই পরামর্শটি আমার জীবনে অসম্ভব কাজে দিয়েছিল। তাই এখনো আমি আওড়াই, নতুন যারা আসে তাদের উদ্দেশ্যে। গত ২০১০ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে মিনার ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হাডসন নদীর পাশে বদইন পার্কে। আমার ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মানিক ভাই নিয়ে এসেছে মিনার ভাইকে। মানিক ভাই আমাকে ইঙ্গিতে বলেছিল- আমি একজনকে নিয়ে আসবো। আমি আকাশ থেকে পড়লাম মিনার ভাইকে দেখে! কিন্তু এ কী, মিনার ভাইয়ের শরীরটা আর আগের মতো তাগড়া নেই! দূর্বল, মনে হয় যেন হাতে কাঁপছে! মানিক ভাই জানালো, মিনার ভাইর বউটি তাকে খুব সোহাগ করে, প্রতি রাতে ফোন করে খোঁজ নেয়- ঔষধ নিয়েছে কি না! মিনার ভাই আমাদের থেকে আজ অনেক দূরে! আশির দশকের যে প্রজন্মটি আমাদের নির্ভয়ে কথা বলতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে- দুঃশাসন, সাম্প্রদায়িকতা আর অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জেগে উঠতে, নিঃসন্দেহে মিনার ভাই তাদের অন্যতম। তারই অকৃত্রিম বন্ধু নাঈম ভাই, আবু হাসান শাহরিয়ার, ইমদাদুল হক মিলন কিংবা মইনুল হাসান সাবেরদের ঘাড়ে এই প্রতিবাদের আরো কিছু বোঝা তুলে
দিয়ে চির বিদায় নিলেন মিনার ভাই। লাল সালাম তোমায়!!

নিউইয়র্ক, ২৯ মার্চ ২০১২