ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

মানুষ জেগে ওঠে। এবং মানুষকে আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠতে হয় এক সময়। যেমনটা জেগে উঠেছেন গুন্টার গ্রাস। ৮৫ বছর বয়সে। নোবেল পুরষ্কারের তোয়াক্কা করেননি। সত্য কথা যা বলা দরকার, বলে ফেলেছেন ডানে-বায়ে না তাকিয়ে। কেউ যদি পুরস্কারটা এখন কেড়ে নেয়, তাতে তার কিছু যায় আসে না। জীবনে তো একবার মরতেই হবে। কাপুরুষের মতো আত্মহত্যা নয়, কিংবা ক্ষয়ে-ক্ষয়ে মরা নয়, মরতে হবে লড়ে। আর ইতিহাসের পাতা? সেতো বীরদের জন্যই। একজন আধমরা নোবেল বিজয়ীর চেয়ে একজন প্রতিবাদী ক্ষুদিরাম যে গান হয়ে বাজে আবহমান বাংলার ঘরে-ঘরে!

একটি নতুন সংগঠনের জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে। এঁদের নাম ব্লগারস। এরা নিজের পয়সা খরচ করে, অনলাইনে, মাথা খাটিয়ে লিখে যায়। কারো কোন ধার না ধারে। লেখার সম্মানী এরা কল্পনাও করে না। উল্টো- আড্ডা সমাবেশে গাঁটের পয়সা খরচ করে এরা জীবনের স্বপ্ন দেখে, জীবনের কথা বলে। এদেরকে দেখে কেউ সালামও দেয় না। চেয়ার এগিয়ে দিয়ে কেউ এক কাপ চায়ের অফারও করে না। কেউ ভাবতে পারে এরা ‘বোগাস’, তাই ‘ব্লগারস’ নামটিও এরা উচ্চারণ করে সন্তর্পণে।

এঁদের বুকে আগুণ। এরা বিস্ময়ের বাজি ফোটায় আপন সীমানায়। কেউ জানে না, কেউ দেখেও না। এরা ব্যানার উচিয়ে কারো থেকে চাঁদা নেয় না, চাঁদার আবদারও করে না। এঁদের নেই কোন ইশতেহার, নেই ঘোষণা পত্র। কিন্তু এঁদের লক্ষ্য এক। এরা বিশ্ব নাগরিক। তাই মানুষের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী এঁদের কাম্য। এরা বিশ্বলোকে তাকিয়ে ভুলে যায় না নিজের অস্তিত্ব, কিংবা শিকড়। তাই এরা কথা বলে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সব অমানবিকতা আর অশিষ্টাচারের বিরুদ্ধে।

সব মানুষ এঁদের আপন। নিজেদের আলাদা, উঁচু দরের ভেবে এরা কোন আত্ম অহমিকায় ভোগে না। এঁদের কোন অফিস ঘর নেই, নেই কলম-কালি-দলিল-দস্তাবেজ। এরা সাঙ্ঘাতিক, কেউ-কেটা নয়। ঘরের বাইরে যেতে পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে এঁদের কোন মাতামাতি নেই। দাড়ি-গোফ, চুল-সজ্জা নিয়ে এঁদের কোন উতকন্ঠাও নেই। এরাই আমাদের এ সময়ের সাহসী সন্তান! এঁদের সংখ্যা এখনো অনেক অল্প। কিন্তু এঁদের প্রখর আত্ম সম্মান বোধ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, রসবোধ, হৃদয়ের চাঞ্চল্য আর উদারতায় প্লাবিত হচ্ছে আশেপাশের সবাই।

এরা নারীপুরুষে পার্থক্য করে না। এরা জাত-ধর্ম নিয়ে ভাবিত নয়। বিশ্ব এঁদের হাতের মুঠোয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখায় এরা বিচরণ করে স্বচ্ছন্দে। সাজানো বইয়ের লাইব্রেরীতে এরা বুঁদ হয়ে তত্ত্ব কপচায়
না। সমাজতন্ত্র, না পুঁজিবাদ- এ নিয়ে ফালতু বিতর্কে এরা গা ভাসায় না। এরা বিবেচক- তাই ধর্ম-অধর্মের বাকবিতণ্ডায় সময় ক্ষেপণ করাকে যৌক্তিক মনে করে না। এরা সবাইকে বন্ধু ভাবে, তাইতো ফেইসবুকেও ওরা বন্ধু খোঁজে!

এঁদের প্রতিবাদ অভিনব। এরা স্লোগানে-স্লোগানে বাতাস ভারি করে তোলে না। এঁদের ম্লান মুখের মৌণ ভাষা বুঝে নিতে হয়। এঁদের এই মৌণতা সুনামি’কেও হার মানায়। এঁদের অপেক্ষা সে দিনটির জন্য, যেদিন এই মৌণতা শ’তে-হাজারে-কোটিতে বিস্ফোরিত হবে। ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব অনাচার, দূরাচার আর দুঃশাসনের গ্লানি! আপাত অক্ষম এই আমিও থাকলাম সেদিনটির অপেক্ষায়!!

নিউইয়র্ক, ১১ই এপ্রিল ২০১২