ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

উপরের যে ছবিটি দেখছেন, মনে হতে পারে এদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে! হ্যাঁ এরা পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে প্রকৃতির কড়াল থাবা থেকে বাঁচতে চায়! বিরূপ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে বাংলাদেশের মানুষ। নিত্য দারিদ্র এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করেও তাদের বাঁচতে হয়। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এ দেশে আজ যখন মানুষ আর হায়েনারূপি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সংঘাতে জনপদ রক্তাক্ত। তখন মানুষই পথ করে নেবে- এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস! মানুষ জানে কি করে বিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদের টিকে থাকতে হয়। ২০৫০ সালের পৃথিবীর বৈসাদৃশ্যগুলো বাংলাদেশে এখনি প্রকট! মানবতা আর নৈতিকতার সব দেরাজ বন্ধ হতে চলেছে যে দেশে। সে দেশের মানুষদের কাছ থেকেই শিক্ষা নিতে হবে পৃথিবীর আর সবাইকে, ২০১২-মে মাসের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন এ বার্তাই জানিয়ে দিচ্ছে সমগ্র বিশ্ববাসীকে।

বাংলাদেশে এখন হরতাল চলছে। এ হরতালে জনজীবন রুদ্ধ! মানুষ জানে না- কেন, কিসের প্রয়োজনে এ রাজনৈতিক অস্থিরতা! একজন আব্দুর রশিদ গাড়ি চালিয়ে জীবন নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন। সংসারের কথা ভেবে গাড়িটাকে পিকেটারদের হাত থেকে রক্ষা করতে যেয়ে পারলেন না। গাছের সঙ্গে আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে প্রাণ হারালেন। বেগম জিয়া আর হাসিনা দু’জনের ক্ষমতার স্বাদ মেটাতে নির্মম বলি হলেন! এম্বুলেন্সের পেছনে বাবার মৃত দেহ দেখে ছয় বছরের শিশুর প্রশ্ন- তার বাবা এভাবে ঘুমিয়ে আছে কেন? বেগম খালেদা জিয়া কি এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন? পারবেন না।

দোযখ থেকে ডাইনী নেমে এসেছে বাংলাদেশে। এ দেশে এখন ডাইনীদের উলঙ্গ নৃত্য চলছে। এদের এক হাতে মানুষের মণ্ডু। আর এক হাতে রক্তাক্ত খড়গ! কে কখন বলি হয় কেউ জানে না। কোন নারী তার স্বামী হারাবে, কোন সন্তান তার পিতা হারাবে কেউ জানে না। এক হিংস্র-প্রেত পূরীর পরিবেশ। এ ডাইনীদের সামনে দাঁড়িয়ে সাহসে সত্য কথা বলবে, এমন মানুষও আর সে দেশে নেই! সবাই যেন ইয়াবা আর ফেন্সি সেবন করে আখেরাত পর্যন্ত ঘুমের ভান করে পড়ে আছে। এ সব ডাইনীর পেছনে নর্তণ-কূর্দণ করছে একদল পৈশাচিক হায়েনা। এরাও মানুষের রক্তসেবী। ডাইনীর উচ্ছিষ্ট পেয়ে এরাও ঘোরের তালে নাচছে। এদের ডঙ্কার আওয়াজে মসজিদের মুয়াজ্জিনের আযানও আর শোনা যায় না!

রক্তের হোলি খেলায় মেতে ঊঠেছে একদল ক্ষমতা পিশাচ মানুষ! আর কত লাশ পেলে আপনাদের রক্তের তৃষ্ণা মিটবে? আর কত মায়ের বুক খালি হলে আপনাদের ক্ষমতার দরজা সারা জীবনের জন্য খুলে যাবে? যে হিংস্র বাঘের পিঠে চড়ে আপনারা ক্ষমতার দৌড়ে মাতাল হয়ে ছুটছেন- বিশ্বাস করুন এ হিংস্র বাঘের থাবায় আপনারাও প্রাণ হারাতে পারেন! আপনারা কি ওয়ান ইলিভেন ভুলে গেছেন? আপনারা কি মনে করেন- কোথাও আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে না? হয়তো আপনাদের বরযাখ-কিয়ামত কোন কিছুতেই বিশ্বাস নেই! কিন্তু মনে রাখুন প্রকৃতির বিচার বলে কিছু আছে। প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে কেউ রেহাই পায় না!

একজন ইলিয়াস আলী নিখোঁজ। কিন্তু তাকে অজুহাত করে দুই নেত্রির ‘বাহাস’ এবং সেই থেকে সূচনা প্রতিহিংসার। এরা দু’জনেই নিজেদের ভাবছেন বাকপটু। দু’জনেই নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে যোজন দূরে! এক জায়গায় তাদের মিল- এরা কেউই জীবনের দায়িত্ব নিতে চান না। এরা মৃত এবং নিখোঁজ মানুষ নিয়ে রাজনীতি করতে ভালবাসেন। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!’ এ কথায় তারা বিশ্বাস করেন না। তারা নিজেদের প্রয়োজনে মানুষের জীবনকে ভাবেন সবচেয়ে মূল্যহীন এবং অপ্রয়োজনীয়।

এমন বাংলাদেশ আমাদের কাম্য ছিল না। আজ স্বাধীনতার ৪১ বছর পর মানুষ যখন আত্মনির্ভর হতে চাচ্ছে, যখন উঠে দাঁড়াতে চাচ্ছে, তখনই চারদিক থেকে চক্রান্ত আর প্রতিহিংসার খড়গ নেমে এসেছে। এ দেশ স্বনির্ভর হউক, এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিক, এ দেশের মানুষ দারিদ্র্যের রাহু থেকে নিজেদের মুক্ত করুক তা চায় না মাফিয়া সদৃশ কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ! কোথায় মানুষের বন্ধু হবেন রাজনীতিবিদ, তার পরিবর্তে মানুষের জীবনকে পুঁজি করে “সারভাইবেল অব দ্যা ফিটেস্ট” এর মল্ল যুদ্ধে সাধারণ-দূর্বল মানুষকে কাবু করার চেস্টা! কিন্তু তাতো সত্যি নয়! এদেশেই জনদরদী রাজনীতিবিদের জন্ম হয়। এ দেশের মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশের ভূখা-নাঙ্গা মানুষকে নেত্রিত্ব দেন। এ দেশেই জন্ম হয় শেরেবাংলা আর শেখ মুজিবের!

তাইতো ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের আর্টিক্যালে একজন জাকির কিবরিয়াকে উদ্ধৃত করে বলতে হয়- কালের পরীক্ষায় আমরা কখনো পরাজিত হইনি। ৩৭ বছর বয়সী জাকির বলেন-“We may be poor and appear disorganized, but we are not victims. And when things get tough, people here do what they’ve always done—they find a way to adapt and survive. We’re masters of ‘climate resilience.'” আমরা দরিদ্র এবং মনে হতে পারে আমরা বিশৃঙ্খল। কিন্তু আমরা কখনো দুর্দশাগ্রস্ত নই। এবং যখন পরিস্থিতি বেশামাল হয়, আমাদের জনগন সবসময় তাই করে যা করে তারা অভ্যস্থ। তারা বেঁচে থাকার উপায় উদ্ভাবন করে এবং বেঁচে থাকে। আমরাই আমাদের ভাগ্যবিধাতা!

দীর্ঘ নিবন্ধে অধ্যাপক আবু সাঈদের সাক্ষাতকারও নেয়া হয়েছে। স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে তিনি বলেছেন- “একদিন আমি ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিলাম। হাজারো গাড়ির হুড়োহুড়ি ব্যস্ততায় আমি পাচ-ছয় বছরের একটি শিশুকে প্রায় পিস্ট করতে যাচ্ছিলাম। শিশুটি রোড ডিভাইডারে ঘুমাচ্ছিল। গাড়িগুলো তারস্বরে হর্ণ বাজিয়ে ছুটে চলছিল শিশুটির মাথার ইঞ্চি খানেক ঘেঁসে। কিন্তু সে শান্তির ঘুম দিচ্ছিল বিশ্বের ব্যস্ততম ট্রাফিকের ভীড়ে। এটাই বাংলাদেশ। বিরূপ পরিস্থিতিতেও আমরা টিকে থাকতে পারি। এবং আমাদের চাহিদাও খুব-খুব সীমিত। এ কারনে আমরা মানিয়ে নিতে পারি অযাচিত অনেক কিছু!
Abdullah Abu Sayeed, a literacy advocate, explains it this way: “One day I was driving on one of the busiest streets in Dhaka—thousands of vehicles, all of them in a hurry—and I almost ran over a little boy, no more than five or six years old, who was fast asleep on the road divider in the middle of traffic. Cars were whizzing by, passing just inches from his head. But he was at peace, taking a nap in some of the craziest traffic in the world. That’s Bangladesh. We are used to precarious circumstances, and our expectations are very, very low. It’s why we can adapt to just about anything.”

নিউইয়র্ক, ২২ এপ্রিল ২০১২

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর লিঙ্ক