ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

প্রায় দেড় যুগ আগে ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকায় একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান হয়। সে অভ্যুত্থানে নাইম ভাই বেড়িয়ে যান। এটি ছিল আজকের কাগজ’-এর পর নাইম ভাইয়ের আরেকটি সফল প্রয়াস। তবে নাইম ভাইয়ের বেড়িয়ে যাবার সঙ্গে-সঙ্গে এর হাল ধরেন বর্তমান প্রথম আলো’র সম্পাদক মতি ভাই (মতিউর রহমান)। তবে মতি ভাই-ও সেখানে খুব বেশি দিন স্থায়ী হননি। দলবলে বেড়িয়ে তিনি শুরু করেন প্রথম আলো, যা এখন পাঠক নন্দিত। আর নাইম ভাই-ও বেশ খানিকটা বিরতি দিয়ে শুরু করেন তার তৃতীয় প্রয়াস “আমাদের সময়”।

মতি ভাইয়ের কাছে আমি ঋণী। চবি’তে পড়ার সময় একাধারে ছাত্রকর্মী এবং সাপ্তাহিক একতার হকার। সেই সুবাদে ঢাকায় এসে সিপিবি অফিসে তার সঙ্গেই দেখা করি প্রথমে। তিনি হয়তো ভুলেও গেছেন। তার একটি চিরকুট নিয়ে আমি দেখা করেছিলাম নিতাই’দার প্রজন্ম ম্যাগাজিনে ১৯৯০ সালের মাঝামঝি। আর সেখানে অনুবাদের কাজ থেকেই আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি।

যাই হউক স্নেহ ভাজন তরুণ সরকার তখন কাজ করতেন ভোরের কাগজে। নাইম ভাইয়ের চলে যাওয়ার (অথবা প্রস্থানে বাধ্য করার) বিষয়ে এক আড্ডায় তরুণ বলেছিলেন- এটি প্রজন্মের সঙ্ঘাত। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী প্রজন্ম, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের সাফল্য দেখতে চায় না বলেই এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনার অবতারণা! তার এ মন্তব্য সে সময় আমার মনে দাগ কাটলেও কখনো গভীরে তলিয়ে দেখিনি।

বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় “সঙ্ঘাত” শব্দটি আমরা সবসময় এড়িয়ে চলি। আমরা বরং এর বিপরীত শব্দ, অর্থাৎ “সমঝোতা”র রাস্তা খুঁজি। এই কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের অফিস আদালতে কর্মকর্তা পদে কোন তরুণ-যুবক খোঁজে পাওয়া যেত না। বয়স না বাড়লে, চুল না পাকলে বিজ্ঞ বলে কাউকে আমরা কদর করতে জানতাম না। দাড়িওয়ালা, কিংবা বয়স্ক লোকের কথা যতই যুক্তিহীন কিংবা অকাট হউক, তা ক্ষতিকর হলেও আমরা মেনে নিতাম।

সমাজ বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আজ বাংলাদেশেও পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। বিশেষত ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ আমূল বদলে গেছে। বাংলাদেশের মেধাবী তরুণরাই আজ দেশের চালিকা শক্তি। বাংলাদেশের এই তরুণরা এ শক্তি অর্জন করেছে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ ’৯০-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও আজ এদের অবদানই সবচেয়ে বেশি।

ভাষা আন্দোলন দিয়েছে আমাদের অসাম্প্রদায়িক, ভাষা ভিত্তিক জাতিয়তাবাদী সাংস্কৃতিক বোধ। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ দিয়েছে আমাদের অপরিসীম সাহস এবং ত্যাগের মানসিকতা। এবং গণতন্ত্র দিয়েছে আমাদের মুক্তির প্রেরণা (ফ্রিডম)। মুক্তিযুদ্ধের এই অবদান সম্পর্কে জ্যোতি বসুর একটি উক্তি আজ স্মরণ করতে চাই। সম্ভবত ১৯৯৭ সালের দিকে পশ্চিম বাংলার মূখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু একবার এসেছিলেন তার পৈত্রিক ভিটে নারায়ণগঞ্জের বারদি গ্রামে কলকাতা থেকে সোজা হেলিকপ্টারে। তখনকার পররাস্ট্র মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদ তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন বারদি’তে। মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে জ্যোতি বসু তার বক্তৃতায় বলেছিলেন- পশ্চিম বঙ্গের খেটে খাওয়া মানুষ বাসে-রেলে উঠলে এখনো পেছন দিকে ধাবিত হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৃষক-মজুর মলিন পোশাকে বাসে রেলে উঠলে পেছনে ধাবিত হয় না, বরং সামনে দাঁড়ায় সাহসের সঙ্গে। এটাই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফল। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ মানুষকে যে সাহসী এবং সম্মানিত করেছে, গণতন্ত্রের আন্দোলন দিয়েছে তাকে আরো তেজ-বীর্য।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষ হয়েছে সাহসী, সংগ্রামী এবং জীবন সম্পর্কে আরো আশাবাদী। কিন্তু সব সাফল্যের পেছনে থেকে যায় কিছু জটিলতা, কিছু বন্ধ্যাত্ব। ১৯৫২ সালের বিজয় অর্জনের পরও আমরা সাম্প্রদায়িকতাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে পারিনি। ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জনের পরও আমরা নির্মূল করতে পারিনি বিভেদাত্মক ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি। আবার ১৯৯০-এ গণতন্ত্রের বিজয় অর্জনের পরও আমরা ছুঁড়ে ফেলতে পারিনি স্বৈরাচারী রাজনীতি। এক এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে ভর করেছে “স্বৈর রাজনীতি”।

গত কুড়ি বছরে যে গেছে ক্ষমতায়, সেই হয়েছে “রাবণ”। বাংলাদেশে তাই সাম্প্রদায়িক এবং স্বৈর রাজনীতি জোট বেঁধেছে, এবং এরা টিকে থাকতে চাইছে। এর বিপরীতে বিপুল সংখ্যক তারুণ্যের এক সমাবেশ আমি লক্ষ্য করি। এদের হাতে বায়ান্নো, একাত্তর, আর নব্বই-এর পতাকা। এদের সাহস আর শক্তিময়তা হার মানাবে অতীতের সব মাইলস্টোন’কে। অতীতের একশ’কে এরা ধারন করে একের মধ্যে। এদের হাতে নতুন প্রযুক্তি, নতুন মাধ্যম, নতুন মূল্যবোধ। এরা জানে কি করে এ সব হাতিয়ারকে কাজে লাগাতে হয়।

অবশ্য প্রজন্মের এই সঙ্ঘাত কেবল বাংলাদেশে নয়। পুরো বিশ্ব জুড়ে আজ পরিবর্তনের যে দামামা বেজে উঠেছে, তাতে শংকিত সকল সনাতন পন্থীরা। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক উইলিয়াম ডেরেসিঊইজ William Deresiewicz এটাকেই আখ্যায়িত করেছেন “প্রজন্ম বোমা” নামে। গত বছরের নভেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন- তিনটি কারনে এই প্রজন্ম বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে। প্রথমতঃ তরুণ প্রজন্ম নিজেরাই আত্মনির্ভরশীল হতে চাইছে, কারন চাকুরির বাজার মন্দা। দ্বিতীয়তঃ তারা এই বৈশ্বিক পরিবর্তন চায় নিজেরা উদ্যমী হওয়ার কারনে, তৃতীয়তঃ তারা ওয়াল স্ট্রীট অকুপাই করতে চায় এই পরিবর্তন পাকাপোক্ত করতে!

মানুষ কখন উদ্যমী হয়, যখন তার মধ্যে শক্তি এবং সাহস থাকে। বাংলাদেশে এই শক্তি এবং সাহসের স্ফূরণ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমকে যুক্তিনির্ভর ব্যবহারের সব কলা কৌশল এখনকার প্রজন্মের আয়ত্তে। এখন কোন পত্রিকায় কে কি লিখলো, আর তা গলাধঃকরণের জন্য সে বসে নেই। এখনকার প্রজন্ম নিজেই খুঁজে নিচ্ছে সত্যকে নিজের মতো করে। তার মধ্যে যে “ইন্ডিভিজুয়ালিজম” (ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ) জাগ্রত হয়েছে, তা কেন্দ্রীভূত হয়েছে শত-সহস্র শক্তির ভরকেন্দ্রে!

নিউইয়র্ক, ৭ মে ২০১২