ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু…”।

সিলেট থেকে শিলং ঘুরতে আর দেখতে যাবার ক্ষেত্রে সম্ভবত কবিগুরুর এ কথাটি একেবারেই সত্যি। বাংলাদেশ শুধু নয়, সিলেটেও এমন লোকের সংখ্যা হাতে গোণা যারা মাত্র চার ঘন্টা দূরত্বের পথ শিলং গেছেন। অথচ ব্রিটিশ আমলের বেঁচে থাকা মাঝারি গোছের ব্যবসায়ীদের অন্তত দশ জনের একজন শিলং গেছেন ব্যবসা কিংবা ছেলেমেয়ে মানুষ করার কাজে। শিলংয়ের মিশনারী স্কুলগুলোতে লেখাপড়ার সুখ্যাতি ব্রিটিশ আমল থেকে।

আমাদের শিলং ভ্রমণের পরিকল্পনা একেবারে আকস্মিক। বলা নেই, কওয়া নেই হুট করে মাত্র তিন দিনের ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়া। ২৩ মার্চ বৃহস্পতিবার (২০০০ সাল) ধানমন্ডির ভারতীয় হাই কমিশন থেকে ভিসা নিয়ে এলাম মাত্র ১০ দিনের জন্য। ভ্রমণ খরচের জন্য মাত্র ১০০ ডলার এনডোর্স করলাম। কিন্তু আমাদের ভ্রমণকাল ছিল এর চেয়েও সংক্ষিপ্ত। বিশেষ করে আমার কাজের হুড়োহুড়ির কারনে ভ্রমণের এই পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত মাটি হয়ে যায়নি।

শুক্রবার রাতে উপবনে চড়ে সিলেট পৌঁছে পরদিন সকালে রওয়ানা। আমাদের দেড় বছরের শিশু অনন্যাকে নানীর কাছে রেখে সকাল আটটায় আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।

২৬শে মার্চ রোববার
আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। সরকারি ছুটির দিন। সিলেট শহরের শিবগঞ্জে তামাবিল বাস স্ট্যাণ্ডে পৌঁছে গেছি সকাল-সকাল। পৌণে নয়টায় বাস ছাড়লো। লোকাল বাস, ভাড়া জনপ্রতি মাত্র ১৯ টাকা। সিলেট থেকে তামাবিল দূরত্ব ৫৬ কিলোমিটার (প্রায় ত্রিশ মাইল)।

পথের ছোট-ছোট হাট-বাজারে মাইক বাজছে। কোথাও রঙিন কাগজের নিশান, মাঠে বালক-বালিকাদের ছোটাছুটি। সামিয়ানার নীচে কোথাওবা টেবিল-চেয়ার পাতা। দরবস্ত বাজার থেকে ১৫/২০ জন বাড়কি শ্রমিক বাসে উঠেছেন, এরা নদী থেকে পাথর তোলার কাজ করেন। এদের কয়েক জনের আলাপ ছিল কৌতূহলোদ্দীপক। একজন আরেকজনকে বলছে, আজ বোধ হয় ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’।

আসলে দেশের বহুলোকের কাছে স্বাধীনতা কিংবা বিজয় দিবসের বার্তা পৌঁছায়নি।

সকাল সোয়া দশটায় আমরা পৌঁছলাম তামাবিল। বাসস্ট্যাণ্ড থেকে পায়ে হেঁটে ৫ মিনিটের রাস্তা। আমরা এখন বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন অফিসে। এখানে পাসপোর্টে সীল মারা হলে আমরা গেলাম রাস্তার উল্টোপাশে কাস্টমস অফিসে। সেখানে কর্মকর্তাদের সঙ্গে খানিক্ষণ আলাপ এবং চা পর্বের মাধ্যমে পৌণে এগারোটা বেজে গেল। অবশ্য তাতে তেমন ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। কারন ভারতের কাস্টমস অফিসাররা আসেন বেলা এগারোটায়।

আরো পাঁচ মিনিট হেঁটে আমরা ভারতের ডাউকি চেকপোস্টে। বাংলাদেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ত্বরিৎ গতিতে কাজ হলো এখানে। সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান, সাবেক সচিব নুরুল হোসেন খান যাচ্ছেন সস্ত্রীক। তাদের জন্য শিলং থেকে আসা একটি মিনি-ভ্যান আগে থেকে সেখানে প্রস্তুত ছিল। ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি তাদের গাড়িতে আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন। আমিও উঠেছিলাম গাড়িতে। কিন্তু গাড়িটি এতো ছোট ছিল যে, সেখানে ড্রাইভারের আসনের পর আর মাত্র তিনটি আসনে আয়েশে বসা যায়। এর বেশি বসতে গেলে বিপত্তি। তাদের আরামের কথা বিবেচনা করে আমি সানুনয়ে ডাউকি থেকে বাস অথবা জীপে শিলং যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। ভদ্রলোক আপত্তি করলেন না।

আজ রোববার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এ কারনে ডাউকি থেকে একটি মাত্র বাস যাবে শিলং। ছাড়বে বেলা সাড়ে এগারোটায়। বাসে চড়ে বসলামও। কিন্তু পাহাড়ি পথে বাস যাত্রা আরামদায়ক হবে না ভেবে ইতস্ততঃ করছিলাম। এরমধ্যে একটি পাজেরো জীপ এলো। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় সোমো। বলা যায় এলএক্স টয়োটা হাইল্যাণ্ডারের স্থানীয় সংস্করণ। বাস ছেড়ে জীপে চড়ে বসলাম আমরা।

আমাদের সঙ্গে শিলং-এর কলেজে পড়–য়া এক তরুণকেও পেলাম। লক্ষ্য করছিলাম- ছেলেটি খুবই বিড়ম্বনায় পড়ছে যখন কেউ তাকে জিজ্ঞেস করছে- ‘বাংলাদেশে কি ভালো কলেজ নেই’? ছেলেটির সহজ-সরল উত্তর- ‘ডিউ টু স্টুডেন্ট পলিটিক্স এণ্ড আদার সিচুয়েশন, মাই প্যারেন্টস সেন্ট মি টু শিলং’।

এরপর আবার প্রশ্ন- ‘কেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি উত্তর-পূর্ব ভারতের ইনসার্জেন্সির চেয়ে খারাপ’? এরপর ছেলেটি এক প্রকার বোবা।

পাইনার্সোলাতে সোমো বিরতি দিল। চা পানের ফাঁকে আমি ছেলেটিকে তার পড়াশুনার ব্যাপারে আরো জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে জানালো শিলংয়ের স্কুল-কলেজগুলোতে বাংলাদেশের অন্তত কয়েক হাজার শিশু-কিশোর-তরুন আছে। আমি এর বিসদ জানতে চাইলে ছেলেটি আমাকে জানালো বহুবিধ কারন। এরমধ্যে রয়েছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন জট, লেখাপড়ার নিম্নমান, ঢাকার ভালো হাতে-গোণা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতি উচ্চ টিউশন ফি এবং সরকারি ভালো স্কুল-কলেজে আসনের স্বল্পতা। আমাদের ভ্রমণ সঙ্গী মাহবুবও তাই কলেজের পর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও কাটাতে চায় ভারতে।

এদিকে আমাদের সোমো ততক্ষণে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন হাজার ফুট উপর দিয়ে চলছে। কেবল খাড়াই নয়, রাস্তার ২০/৩০ হাত পর-পর ভয়ানক মোড়। ভয় আর থ্রিল মিলে আমার স্ত্রী একেবারে আড়ষ্ট। তার খানিকটা বমি-বমির ভাবও হলো। যতই উপরে উঠছি ততই ঠাণ্ডা লাগছে। ভাগ্যিস কোট এনেছিলাম।

ডাউকি থেকে পাইনার্সোলা দেড় ঘন্টার গিরী পথ। পাইনার্সোলা থেকে শিলং আরো এক ঘন্টা। পুরোটাই চড়াই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শিলংয়ের উচ্চতা সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট। জীপ থেকে বাইরে তাকিয়ে দেখছি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মনকাড়া পাইন গাছের সারি। মাঝে-মাঝে রডো ড্রেন-ড্রেন। গাড়ি থেকে নীচের দিকে তাকালেই মন একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। স্যুৎ করে চোখ চলে যায় কয়েক হাজার ফুট নীচের গহবরে। আর শরীরটা তখন মৃত্যুর হিম-শীতল পরশ অনুভব করে। ফারহানা আমাকে আরো আড়ষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বাহুতে। বলতে চায় আমাকে অবুঝ মেয়েটির কাছে নিয়ে চলো, আমার সাধ মিটে গেছে। কথাগুলো আমার কান পর্যন্ত আর পৌঁছায় না। আমি কেবল পাহাড়ের ঢালুতে কিংবা নিবিড় অরণ্যের মাঝে নাগা বিদ্রোহীদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি। কয়েক পরতে পাহাড়গুলো ঘুমিয়ে আছে হিমালয়ের সীমানা পর্যন্ত। মনে হচ্ছে নজরুলের সেই বিখ্যাত গানের কলি- ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’….‘ঐ পাহাড়ের ঝর্ণা আমি ঘরে নাহি রই গো’…।

দেখতে-দেখতে আমরা শিলংযের কাছাকাছি এসে গেছি। বেলা দুটোয় আমরা পৌঁছে গেলাম শিলং-এর কেন্দ্রস্থল পুলিশ বাজারে। ভারতীয় হাইকমিশনে ভিসা নেয়ার সময় আমি জেনে নিয়েছিলাম শিলংয়ের মাঝারি মানের একটি- এম্বেসী হোটেলের ঠিকানা। হেঁটেই খুঁজে পেলাম হোটেলটি কযেকটি পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে। (চলবে)