ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

শিলং-এর মানুষ। এদের সঙ্গে হিন্দি অথবা ইংরেজীতে কথা বলতে না চাইলে খাস সিলেটি ভাষা ব্যবহার করতে পারেন।

২৭ মার্চ, সোমবার

আমরা চললাম মাওসমাই গুহায়। গুহায় প্রবেশের আগে আমরা প্রত্যেকে একটি করে টর্চ হাতে নিলাম। তিন ব্যাটারির টর্চই অন্ধকারের একমাত্র ভরসা। একসঙ্গে একজনের অতিরিক্ত হাটা যায় না। প্রায় ৫০ মিটার গুহার ভেতরে কিছু-কিছু জায়গায় চড়াই রয়েছে। গুহার ডান দিকে একটি সরু পথ নাকি ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। ধারনা করা হয় আগ্নেয়গিরীর গলিত লাভা এ ধরনের টানেল তৈরি করেছে। বিশ্বের এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে লাভা টানেল পরবর্তিতে পাতালের নদী রূপ নিয়েছে। যাইহোক মাওসমাই গুহার লাভা টানেলটি চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় আমরা আর সেদিকে যাইনি।

গুহার ভেতর কোথাও আলোর ঝলকানি, আসলে সেগুলো পাথর ঠিকরে আলো বের হচ্ছে। আবার কোবরার মতো ফনা তুলে আছে পাথরের খাড়ি। কিছুটা বিস্ময় আর রোমাঞ্চ। গুহা দেখা শেষ হলে আমরা ছুটে চললাম খাংখারাং পার্ক অভিমুখে। ভারত সরকারের বন বিভাগ এ উদ্যানটি তৈরি করে রেখেছে। আসলে উদ্যানটি নিয়োজিত ছায়াছবির শ্যুটিং-এর জন্য। উদ্যান দেখতে ২ টাকা, আর ছবি তুলতে ক্যামেরা পিছু ১০ টাকা। আমরা কেবল ২টাকার টিকিট কিনলাম। আসলে ১০ টাকার টিকিট প্রতারণার ফাঁদ ছাড়া কিছুই না। বাস্তবে ২ টাকার টিকিট বিক্রির জন্যই ১০ টাকার টিকিটের ঘোষণা। টিকিট বিক্রির এটাও এক ফন্দি বটে! আমাদের সঙ্গে কয়েকজন ক্যামেরার টিকিট কিনে শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে ফিরেছেন। আসলে দেখার মতো আছে কেবল একটি কৃত্রিম ঝর্ণা।

উদ্যান দেখা শেষ হলে আমরা গেলাম বিশাল আকৃতির একটি গ্রানাইট পাথর দেখতে। পাথরের চমৎকারিত্ব এর গড়নে। আকৃতি বাস্কেটের মতো। কেউবা বলে সুপরির মতো। এর নাম ‘মট্রপ’।

এই এলাকায় প্রচুর কমলা লেবুর চাষ হয়। আমরা একটি কমলালেবুর বাগান দেখলাম অদূরে। এখানে পাহাড়ের চূড়া থেকে বাংলাদেশের ছাতক দেখা যায়। আমাদের গাইড এ্যানি বলছিল ছাতকের সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আর কাগজ কলের কথা।

গাড়িতে আমাদের পরিচয় হয় কলকাতা পোর্ট অথরিটির কর্মকর্তা পদ থেকে অবসর নেয়া এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। তার আদি নিবাস চট্টগ্রামে। স্ত্রীও চট্টগ্রামের নন্দন কাননের মেয়ে। চট্টগ্রাম থেকেই তিনি মেট্রিক পাশ করেছেন। মট্রপের কাছে নেমে এই বৃদ্ধ দম্পতি আনমনে তাকাচ্ছিলেন বাংলাদেশের দিকে, আর আঙ্গুল ঈশারা করছিলেন। নস্টালজিয়া তাদের পেয়ে বসেছিল কি-না কে জানে।

সাতবোন ফল

বেলা গড়িয়ে চলেছে। আড়াইটা বাজে। আমরা চলে এসেছি সাতবোন ফলের পাশে। একটি নয়, সাতটি ঝর্ণাধারা পাশাপাশি। বর্ষাকালে নির্গত হয় এক সঙ্গে। শীতকালে কিছুটা ক্ষয়িঞ্চু, তবে অস্তিত্ব আছে। ঝর্ণাকে সামনে রেখে, চারপাশ কাঁচের সুন্দর একটি পর্যটন কেন্দ্রে আমাদের দূপুরের আহার সারতে হবে। যা-ই খান জনপ্রতি ৫০ টাকা বিল। দোতলার বেলকনিতে ঝর্ণার শো-শো শব্দ আর মায়াময় দৃশ্য দেখতে-দেখতে আমাদের আহার পর্ব শেষ হলো। শুকনো মওসুমে ক্ষীণ প্রবাহেই ঝর্ণার এতো আওয়াজ, বর্ষায় না জানি কেমন অপরূপ হয়ে ওঠে এই সাত বোন ফল। এক ঘন্টার বিরতি শেষে আমরা রওয়ানা দিলাম সাড়ে তিনটায়। ততক্ষণে বাসের বাঁ দিকটায় সূর্য হেলে পড়েছে। সেই একই পথ ধরে বিকেল পাঁচটায় আমরা এসে পৌঁছলাম শিলং-এ। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে আবার হোটেলে। প্রস্তত হলাম সিনেমা দেখার, ‘কুচ-কুচ হোতা হ্যায়’।

ঐশ্বরিয়ার গলা পেঁচিয়ে শাহরুখের সেই গানটি এখনো আমার অনুঢ়নন হয়- ‘কেয়া করো হায়ে, কুচ-কুচ হোতা হ্যায়’।

২৮ মার্চ, মঙ্গলবার

আমাদের ভ্রমণের তৃতীয় দিন। আবার ঘড়ির ঘন্টা শুনে ঘুম ভাঙ্গার পর নাস্তা সারা। মেঘালয় ট্যুরিজমের উদ্দেশ্যে হাটা। গিয়ে দেখি আজ লোকজন তেমন আসেনি। অনেকে গ্র“প কওে যার যার মতো টেক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ শিলংয়ের ভেতরের পর্যটন স্পট গুলো ঘুরে দেখবো। এ্যম্বেসেডর টেক্সিগুলো আকারে বেশ বড়ো। একজন ব্যাংকার ভদ্রলোক প্রস্তাব দিলেন আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চান। ফারহানার সম্মতি পেলে আমারও কোন আপত্তি নেই বলে জানালাম। ব্যাংকার ভদ্রলোক গুজরাটের, চাকরি করেন স্টেটস ব্যাংক অব ইণ্ডিয়ায়, গোয়াহাটিতে। ছেলের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হওয়ায় তাকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। যাই হোক সকাল আটটায় আমাদের যাত্রা শুরু হলো। পাঁচ ঘন্টায় আমাদের সারতে হবে সাতটি ট্যুরিস্ট স্পট।

প্রথমেই হায়দরী পার্ক
অসম্ভব সুন্দর একটি পার্ক। আসামের সাবেক গভর্ণর হায়দার সাহেবের নামে। রং-বেরংয়ের বাহারি ফুলের এত আয়োজন আমি আর কোথাও দেখিনি। আমরা ছবি তুললাম, ঘুরেও দেখলাম। পার্কের ভেতরেই চিড়িয়াখানা। ময়ুর, হরিন, গড়িয়াল, এমনকি পেঁচাও আছে। চারদিকে উঁচু-নীচু পাহাড়, যেন এক খণ্ড বেহেশতি উপত্যকা। পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা আবার টেক্সিতে।

ডন বসকো চার্চ
এই গীর্জাটি শিলংয়ে খ্রীস্ট ধর্মের আর্বিভাব এবং বিকাশের স্মৃতি বহন করছে। একটি টিলার উপর, সাজানো-গোছানো। ডন বসকো ছিলেন একজন পশ্চিমা ফাদার। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হওয়ার কারনে এখানে খ্রীষ্ট ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল আঠার শতকের মাঝামাঝি। এখনো কেবল শিলং নয়, উত্তর-পশ্চিমের সব ক’টি রাজ্যে খ্রীষ্ট ধর্মের বিকাশ অব্যাহত আছে। পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন পাদ্রীরা। শিলংয়ে মোট জনসংখ্যার ৩৫ ভাগ খ্রীস্টান বলে জানালেন এক অধিবাসী।
[/হায়দরী পার্ক]

শিলং পিক

এখন আমরা এসেছি শিলং পিক দেখতে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সদর দফতরের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের টেক্সি। দেখতে পেলাম বিশালাকৃতির একটি রাডার পাহাড়ের চূড়োয় ঘুরছে অনবরত। মনে প্রশ্নবিদ্ধ হলো শক্তির এই প্রদর্শন ও প্রয়োজনীয়তা আসলে কোথায়। আমার জানামতে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুঁড়িতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হেড কোয়ার্টার। তাহলে শিলংয়ে আরেকটি বেস রাখার তাৎপর্য কোথায়? যাই হোক আমাদের টেক্সি শিলং পিক-এ পৌঁছতে পুরো কুড়ি মিনিট সময় নিল। পাহাড় ঘুরে-ঘুরে একেবারে শিলংয়ের মাথার উপর উঠে যাওয়ার এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। পিকটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচু। এখান থেকে পুরো শহর দেখা যায়।

এলিফেন্ট ফল

এরপর আমরা এলাম এলিফেন্ট ফল-এ। কোন এক সময় ঝর্ণায় আছড়ে পড়ে একটি হাতি মারা গিয়েছিল বলেই এই নাম। সারা বছর এ ঝর্ণায় পানির প্রবাহ স্বাভাবিক। এর বৈশিষ্ট হলো- পাথরের তাকে-তাকে আছড়ে পানি গড়িয়ে পড়ে কয়েক হাজার ফুট নীচে। ফারহানা এখান থেকে গাছের গুঁড়িতে তৈরি একটি পাখি কিনলো চল্লিশ রুপি দিয়ে। স্থানীয়রা ঘরে বসে এটিকে পাখির রূপ দিয়েছেন। পয়সা কামানোর শিল্পসম্মত উপায়!

স্টেট মিউজিয়াম

এবার আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো স্টেট মিউজিয়ামে। এটি অত আকর্ষণীয় ও আকারে বিশাল না হলেও এই পার্বত্য এলাকার আদিবাসী ও আবাদীবাসী (পরবর্তিতে মিশে যাওয়া) নাগরিকদের সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। সীমিত সাধ্যের আয়োজনে এখানকার মানুষদের জীবন ধারা সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করা যায়। মনে হলো- আমাদের প্রত্যেকটি জেলা শহরে এ ধরনের মিউজিয়াম থাকলে মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা আরো শানিত হতো। যদিও কেবল চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বগুড়ার মিউজিয়াম আছে। সর্বত্র থাকলে ভালো হতো।

গল্ফ লিঙ্ক

কিছুটা টিলা এলাকায় বিস্তির্ণ এক মালভূমি। এতবড় গল্ফ লিঙ্ক আমি আগে কখনো দেখিনি। দিগন্তজুড়া সবুজ। সীমানায় উঁচু-নীচু গাছের দেয়াল বেশ মনোমুগ্ধকর। ভারতের বড়-বড় গল্ফের আসর নাকি এখানেই বসে।

ওয়ার্দা লেক

আমরা এবার গেলাম ওয়ার্দা লেক-এ। বেশ বড় একটি লেক। তবে একে কেন্দ্র করে মনোরম একটি উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমলে।

এবার ফেরার পালা

আমাদের ফেরার সময় হয়ে গেছে। তরুণ টেক্সি চালক বললো- আজ বৃষ্টি হতে পারে। আমি বললাম- এত সুন্দর আকাশ, তুমি বৃষ্টির দেখা কোথায় পেলে? চালক উত্তর দিলো- ‘মেয়েদের ভালবাসায় যেমন বিশ্বাস নেই, শিলংয়ের আবহাওয়ারও তেমন কোন বিশ্বাস নেই। এই রোদ তো এই বৃষ্টি।’ ছোকরাটি বলে কী! আসলে আজ বিকেলে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা। তরুণ টেক্সি চালকের তাড়াহুড়ো ছিল।

আমাদের তাড়া ছিল বেলা তিনটার সোমো (মহেন্দ্র জীপ) ধরার। সন্ধ্যার আগে-আগে ডাউকি সীমান্ত পাড়ি দিতে চাই। হোটেলের পয়সা মিটিয়ে ঝটপট সোমোতে উঠতে গেলাম বড় বাজারে। এত সুন্দরের মাঝেও বড় বাজারে দারিদ্র্যের বিভৎস রূপ উঁকি দেয় ভয়ঙ্কর মাত্রায়! বাজারের মধ্য দিয়ে আমাদের হাঁটতে হয়েছিল খানিকটা পথ। মনে হয়েছিল হত দারিদ্রের স্বরূপ বাংলাদেশকেও টেক্কা দেয়।

সোমো ছাড়তে কিছুটা বিলম্ব হলো। যাবার পথে পাহাড়ি খাড়াই-উৎরাই দেখে যে ভয়-শংকা দানা বেঁধেছিল, ফেরার পথে আর তা থাকলো না। তিনটের গাড়ি ডাউকি এসে পৌঁছলো পাঁচটায়। খোলা ছিল কাস্টমস-ইমিগ্রেশন সব অফিস। আনুষ্ঠানিকতা সেরে তামাবিল থেকে আমরা রওয়ানা দিলাম সন্ধ্যা ছয়টায়। সিলেট এসে পৌছলাম রাত আটটায়। সেই আবার কর্মমুখর জীবনের শুরু। তথাপি ভ্রমণের অতৃপ্তি রয়েই গেল। সে কারনে লালন হয়তো বলেছেন-

কোথায় আছে রে দিল দরদী সাঁই

এখনো না দেখলাম যারে, চিনবো তারে কেমন করে

ভাগ্যেতে আখেরে তারে দেখতে যদি পাই।

… … … … … … … … … … … … … … … … … …

দেহের মাঝে আরশী নগর, কী দেখতে যাও দিল্লী শহর…

(ভ্রমণকাল ২০০ সাল)
সিলেট টু শিলং-তিন
সিলেট টু শিলং-দুই
সিলেট টু শিলং-এক