ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী আদম-হাওয়াকে বেহেস্ত থেকে বিতাড়িত করে আল্লাহ চারজন ফেরেশতাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাদের খবরদারি করার জন্য। এরা হলেন- জিব্রাইল, মিকাইল, আজ্রাইল এবং ইস্রাফিল। জিব্রাইলের কাজ হলো মানুষের কথা এবং কাজ তদারক করা, মিকাইলের কাজ মানুষের রুটি রুজির বন্দোবস্ত করা, আজ্রাইলের কাজ মানুষের জান কেড়ে নেওয়া, এবং সর্বশেষ ইস্রাফিলের কাজ কেয়ামতের বাঁশি বাজানোর জন্য সদা প্রস্তুত থাকা।

এক জোড়া আদম হাওয়ার জন্য আল্লাহ যে দফতর নিয়োগ দিয়েছিলেন, সেই আদম-হাওয়া এখন ৬০০ কোটি। কিন্তু প্রধান চার ফেরেশতা তাদের দফতর নিয়ে এখনো একই উদ্যোম ও শক্তিতে কাজ করে চলেছেন। তাদের বেতন-ভাতাই নেই, বৃদ্ধির তো প্রশ্নই উঠে না! আল্লাহ ইচ্ছে করেই তাদের জন্য কোন পুরস্কার-তিরস্কারের বিধান রাখেননি, পাছে এরাও মানুষের মতো লোভের বশবর্তী হয়ে শাসনতান্ত্রিক কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে!

এই জিব্রাইলের বর্ণনা বাইবেলেও আছে। তবে খ্রিষ্টানরা তাকে বলে গ্যাব্রিয়েল। উপরের বর্ণনা নিছক স্মরণ করিয়ে দেয়া যা আমরা সবাই জানি। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ্য রাখুন- আল্লাহ কতটা বুদ্ধিমানের মতো মানুষের কাজের পাশাপাশি তার মুখের কথার উপরও খবরদারি বজায় রেখেছেন! এবং আল্লার দফতর গুলোর মধ্যে এটি কতই না গুরুত্বপূর্ণ। তাইতো ছোট বেলায় আমার মা বলতেন- কথা বলার সময় খুব সাবধান হবি। কারন ‘মানুষের জবানে কয়, জিব্রাইলে লেখে’।

এই সেদিন রবীন্দ্রনাথের শেষ দিনগুলোর ওপর একটি লেখা পড়ছিলাম। তখন ভারত বর্ষে শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হিন্দুর হাতে লাঠি, আর মুসলমানের কোমরে চাকু। একদল আরেক দলের ঘরে আগুণ দেয়। আগুণে পুড়ে ছাই হয় অসহায় শিশু ও মহিলা। পরিস্থিতিতে কাতর রবীন্দ্রনাথ তার শয্যা পাশে ডাকেন মুসলমান বাবুর্চি গেদু মিয়াকে। প্রায় মৃত্যু শয্যায় কাতর রবীন্দ্রনাথ গেদু মিয়াকে বলছেন- “চোখ কান খোলা রেখো। বুদ্ধিমান লোক সুযোগ বুঝে য্যুত মতো কথা বলে”।

কথার এতোটাই মূল্য! তাইতো জাতীয় সংসদে অন্তত আধা ডজন রিপোর্টার নিয়োগ দেয়া আছে। যাদের একমাত্র কাজ সংসদ সদস্যরা যা বলবেন, তা অক্ষরে অক্ষরে লিপিবদ্ধ রাখা। এরাই জাতীয় সংসদের জিব্রাইল। সংসদ সদস্যরা কোন অসংসদীয় উক্তি করলে স্পিকার তা রিপোর্টিং থেকে ‘এক্সপাঞ্জ’ অথবা বাদ দিতে পারেন। এখন প্রশ্ন করতে পারেন- এই অসংসদীয় উক্তিগুলো কি? সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি না মেনে যে সব উক্তি করা হয়, সেগুলোই অসংসদীয়। কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদে অনুপস্থিত এমন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। এটা যেমন বিরোধী দলীয় সাংসদদের ক্ষেত্রে বর্তায়, তেমনি যে কোন নাগরিকের ক্ষেত্রেও। কারন দেশের প্রতিটি নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। নাগরিকের এই অধিকার সংবিধানে সুরক্ষিত।

তাহলে আমরা বলতে পারি সেদিন জাতীয় সংসদে স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিটি সহ যারা-যারা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের বক্তব্যকে টুইস্ট করে তাকে জাতির সামনে অপমানিত করতে চেয়েছিলেন তারা সবাই সংসদের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুন্ন করেছেন। তারা প্রকাশ্যে অধ্যাপকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করলে তাদের বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননার অভিযোগ আনা হতে পারে।
চাই একটি মানববন্ধন

অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদকে অপমানিত করার চেষ্টা হয়েছে। আসলে তিনি আরো জনপ্রিয় হয়েছেন। বরং যারা তাকে অপমানিত করার চেষ্টা করেছে, তারাই ইতিহাসে কলংকিত হয়ে থাকবে। সেদিন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্মী দিতে দেখে আমার আশংকা হয়েছে। কারন এই দু’মুখো সাপদের কোন নীতি নেই। ক্ষমতার প্রয়োজনে এরা একদিন সাকা চৌধুরীর সঙ্গে হাতও মেলাতে পারে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদের মতো হয়তো অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকেও কোন দুর্বৃত্তের হাতে জীবন সঁপে দিতে হতে পারে। তাই যেন না হয়। সে কারনেই আজ অধ্যাপক আবু সাঈদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। একটি মানব বন্ধন আজ জরুরি। যার স্লোগান হবে- “অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদের মর্যাদা, পুরো জাতির মর্যাদা”। তা না হলে এই ভদ্রলোকটি যে আলো জ্বালাবার ডাক দিয়েছেন এই প্রজন্মকে, সে আলো জ্বলে ওঠার আগেই অন্ধকারে নিপতিত হবো আমরা সবাই!!

নিউইয়র্ক, ৫ জুন ২০১২