ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

কথায় আছে, ‘বাঙালি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝেনা।’ এটি প্রবাদ বাক্য হলেও বাস্তবে দাঁতের যত্ন না নেয়া হলে যেমন মুখশ্রী নষ্ট হয়, তেমনি নানান সমস্যায় জর্জরিত হয়ে এক সময় দাঁতটাকেই উঠিয়ে ফেলতে হয়। ফলে কোন কিছু খাওয়ায় যেমন সমস্যা ঘটে, তেমনি কথা বলায়ও সমস্যা ঘটে। আমি নিজেই অলস প্রকৃতির লোক হওয়ায়, সময় মত দাঁতের যত্ন নিতে পারিনি, তাই বাধ্য হয়ে দুইটি দাঁতকে উঠিয়ে ফেলতে হলো।

দাঁতের যত্ন বলতে যা বুঝায় তা হলো, খাওয়ার শেষে ব্রাশ করা, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিয়মিত ব্রাশ করা, কোন কারণে দাঁতের মাড়ি ফুলে গেলে বা দাঁতে পাথর জমে গেলে বা দাঁতে ব্যাথা অনুভব করলে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়া, তাদের পরামর্শ নেয়া, প্রয়োজনে দাঁতের এক্সরে করা, প্রতি বছরে দাঁতের স্কেলিং করা- এ সবই দাঁতের যত্নের আওতায় পড়ে।

20773546_1277997925663197_2119830022_o

.

দাঁতের যত্নের ব্যাপারে আমরা কমবেশি অনেকই উদাসীন। কেননা দাঁতে কোন কারণে কিছু ব্যাথা অনুভব করলেই আমরা ছুটে যাই পার্শ্ববর্তী কোন ফার্মেসী বা মেডিসিনে কোন ডাক্তার এর নিকট। এক সময় দন্ত চিকিৎসক অনেক কম ছিলেন। যদি ২/৪ জন রোগী নেহায়েত ঠেকায় পড়ে দন্ত চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হতেন, ডাক্তার সাহেবও তাদের থেকে বেশ ভাল কিছু টাকা হাতিয়ে নিতেন। তার কারণও ছিল, কদাচিৎ ২/৪ জন রোগী গেলেও সব সময় রোগী পাওয়া যাবেনা সেটা দন্ত চিকিৎসকগণ ভালোভাবেই জানতেন। তাই খরচটা একটু বাড়িয়েই নিতেন। ফলে যা ঘটার তাই ঘটতো। রোগীরা বাহিরে এসে প্রচার করতেন দন্ত চিকিৎসকের নিকট যাওয়া যাবেনা, কারণ উনারা অনেক বেশি টাকা নেন। একবার গেলেও দ্বিতীয়বার সেই রাস্তায় পা মাড়াতেন না অনেকে।

এ বিষয়ে অতীতে আমারও একটি অভিজ্ঞতা আছে। যে কারণে ১৫/২০ বছর আমি দাঁতের ডাক্তার এর কাছে যাই নাই। মানুষ এখনও দাঁতের বিষয়ে সচেতন হয়নি, এখনও দাঁতের মাড়ি ফুলে গেলে বা ব্যাথা করলে ছুটে যায় ব্যাথা নিরোধক ঔষধ আনতে, অথবা কাছাকাছি কোন মেডিসিন ডাক্তারের কাছে। এ মহামারী থেকে মুক্তি পেতে হলে দন্ত চিকিৎসকগণ তাদের রোগীদের আকৃষ্ট করতে হবে, তাদের সাথে সদাচারণ ও বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে এবং খরচও কম নিতে হবে। তাহলে ক্রমশঃ মানুষ দাঁতের চিকৎসা ও চিকিৎসক সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি দেবে।

এ বিষয়ে আমারও একটি পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। আমার দাঁতের সমস্যা থাকা সত্বেও আমি ১৫/২০ বছর দন্ত চিকিৎসক এর ধারে কাছেও যাই নাই। ঐ মেডিসিন ডাক্তারের পরামর্শক্রমে ঔষধ চালিয়ে যেতাম। প্রশ্ন হলো কেন দাঁতের ডাক্তারগণ রোগী পাচ্ছেন না? কারণ, এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার অভাব রয়ে গেছে।

20806939_1277998112329845_942369420_o

.

এ প্রসঙ্গে একটি সত্য ঘটনা মনে পড়ে গেল। তখন মাত্র উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতি উপজেলাতেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। তাতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের পোস্টিং দেয়া হয়েছে। আমি যে উপজেলার কথা বলছি সে উপজেলায় ডাক্তারগণ তেমন কোন রোগী পেতেন না। এই নিয়ে ডাক্তারদের ভেতর নানান গবেষণা চলছে- দেশে কি রোগী নেই?

যাইহোক, উনারা গ্রামে গ্রামে সোর্স লাগালেন, জানতে পারলেন গ্রামের পল্লী চিকিৎসকদের মাধ্যমেই রোগীরা চিকিৎসা করে থাকেন। খরচ কম, ছোট বড় অপারেশনও করে থাকেন। সমস্যা না হলে ডাক্তারের নাম যশ বেড়ে যায়; আর মরে গেলে আল্লাহ নিয়ে গেছেন, হায়াত ছিলনা ইত্যাদি। তখন উপজলার ডাক্তারগণ একটা বুদ্ধি বের করলেন, যদি ঐ পল্লী চিকিৎসকদের বিনা খরচে ১৫ থেকে একমাসের জন্য চিকিৎসা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া যায় তা হলে হয়তো রোগী পাওয়া যেতে পারে। যে ভাবনা সেই কাজ, প্রশিক্ষণ শুরু করে দিলেন। প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল, কিভাবে ছোট বড় অপারেশন করতে হবে। অপারেশন করতে হলে জানতে হবে কোন অঙ্গের সাথে কোন অঙ্গের যোগাযোগ রয়েছে। সামান্য এদিক-সেদিক হলে কি কি ক্ষতি হতে পারে বা মেডিসিন সেবনের ডোজ কম বেশি হলে কি ধরনের কুফল বয়ে আনতে পারে এসব। পল্লী চিকিৎসকগণ তো মহা খুশি! এরপর যা ঘটলো একটা ফোরা অপারেশন করতে হলেও তারা রোগীকে পঠিয়ে দিচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

দন্ত চিকিৎসকগণ কিন্তু এখনও সেভাবে রোগী ভিড়াতে পারছেন না। এ জন্য প্রয়োজন দাঁতকে সুস্থ্য রাখতে হলে কি করতে হবে সে বিষয়ে জনগণের মাঝে প্রচারের ব্যবস্থা করা।

20813250_1278002175662772_1892763256_o

.

এই তো গত ২রা আগস্ট তারিখে আমার প্রতিবেশি এক ভদ্রলোকের সাথে মসজিদে কথা হয়। উনার কুশল জানতে চাইলে উনি বললেন, না ভাই ততটা ভাল নেই। প্রশ্ন করলাম কেন? উনি জানালেন কয়েকদিন আগে আমার দাঁতে ব্যাথা শুরু হয়েছে, মারি ফুলে গেছে তাই একজনের পরামর্শে দাঁতের ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। উনি আমাকে হা করতে বলে কি যেন দেখলেন, একটা প্রেসক্রিপশন আমাকে ধরিয়ে দিলেন, আর বললেন, ‘আপনার দাঁতটা উঠায়ে ফেলতে হবে। ব্যাথা ও মাড়ি ফুলা কমার জন্য ঔষধ লিখে দিলাম। নিয়মিত খেয়ে ভাল হলে চলে আসবেন। দাঁত উঠাতে আমাকে দিতে হবে ১০০০/- টাকা। প্রেসক্রিপশন এর জন্য সামনে ৪০০/- টাকা জমা দিয়ে যাবেন।’

আমি প্রতিবেশীকে বললাম দাঁতের বিষয়টা কনফার্ম হওয়ার জন্য আমি একজন ডাক্তারের ঠিকানা দিচ্ছি সেখানে যান। প্রথমেই দন্ত চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলায়, তিনি যেতে অনীহা প্রকাশ করছিলেন। যা হোক আমি বললাম আপনার ইচ্ছা হলে আর আমার প্রতি বিশ্বাস থাকলে আপনি ডেন্টাল সার্জন ডাক্তার ফেরদৌসী আক্তার, (Floss and Gloss Dental care, 339, South Goaran, Haoway Goli, Khilgaon, Dhaka), তার কাছে যেতে পারেন। তিনি পরের দিন সেখানে গেলেন। ফিরে এসে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। উনার দাঁতের এক্সরে করান ১০০/- টাকার বিনিময়ে ভালোভাবে তা দেখে নতুন করে একটি প্রেসক্রিপশন করে দিলেন আর বললেন, ‘আপনার দাঁতটি এখন ফেলতে হবেনা। এই ঔষধগুলো সেবন করেন। ইনশাআল্লাহ সেরে যাবে।’ উনার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কত দিতে হবে? উনি বললেন এক টাকাও না। প্রতিবেশী ব্যাক্তিটি আমাকে বললেন, উনিও তো বলতে পারতেন দাঁতটি উঠিয়ে ফেলতে হবে। উনি তো উনার ব্যবসার জন্যও বলতে পারতেন।

পাঠকগণ এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, সব ডাক্তার রক্তচোষা হয়না। মানুষের সেবা করার জন্যই তাদের সৃষ্টি। তাই সকল ডাক্তারদের প্রতি আমি অনুরোধ জানাবো। ডাক্তার ফেরদৌসী আক্তার এর মত সেবামূলক মন নিয়ে চিকিৎসা করুন। মানুষ দোয়া করবেন। আল্লাহও আপনাদের উন্নতির দ্বারে পৌঁছে দেবেন। ব্যবসা নয়, মানুষের সেবাই হোক আপনাদের মুখ্য উদ্দেশ্য।