ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

আমার এক বন্ধু কবি শ্যামলী দেবনাথ খুব আক্ষেপ করে বলেছেন- “স্বর্গ-মর্ত করে যদি স্থান বিনিময়, তবুও জন্মলগ্ন থেকে পুত্র কন্যার থাকবে বৈষম্য, ধর্মশাস্ত্রে তো দেখি নারী শক্তিই অপরাজেয়, তবে কেন সংসারে কন্যা সন্তান অবহেলিত?”

কবি অনেক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে যে কথাগুলো বলেছেন তার ভিতর ১০০% সত্যতা রয়েছে। কিন্ত আধুনিক এই সভ্যতার যুগেও মানুষ এতো শিক্ষিত হয়েও কেন মেয়েরা এখনো সেই ভেদাভেদ দূর করতে পারেনি, এটাই আমার বোধগম্য নয়। এখনও প্রতিটি ঘরের মা তার ছেলেকে যেভাবে আদর-যত্ন করেন, সেভাবে তার মেয়েকে আদর-যত্ন করেন না, তা হলে কি দাঁড়ালো? মেয়েরাই মেয়েদের ভাগ্যহন্তা (ব্যতিক্রম ছিল, আছে, থাকবে)। এ ভেদাভেদ কিন্তু প্রতিটি ঘরের মায়েরাই শিশু জন্ম দেয়ার পর থেকেই করে থাকেন। কারণ মা’দের বদ্ধমূল ধারণা ছেলেরাই এক সময় বাবার অবর্তমানে বা বর্তমান থাকা অবস্থায় সংসারের হাল ধরে।

জানাটাও মিথ্যে নয়। একটি মেয়েকে একটি ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলে, বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছেলে মেয়েটির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান। তখন মেয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন। শুধু স্বামীই নয়, স্বামীর পরিবারবর্গও অন্যায়ভাবে এ কাজটি করে থাকেন। ফলে মেয়ে চাকুরেজীবী হলেও তার উপার্জিত অর্থের মালিকানা স্বামী ও তার পরিবার অঘোষিতভাবেই হয়ে যান। তারা মেয়েটির উপর নির্লজ্জের মত প্রভুত্ব খাটাতে চেষ্টা করেন। এ কাজে প্রধান উৎসাহদাতা হন ছেলের মা। অথচ এই মেয়ে জাতিরাই আক্ষেপ করে বলেন পুত্র ও কন্যা সন্তানের ভেদাভেদ আজও গুছলোনা! যে দেশে দুই দুই জন মহিলা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উনারাও মেয়েদের স্বাধীনতা এনে দিতে পারেন নি। অবশ্য যে স্বাধীনতা আমরা চাই, তার ভিতর এ স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি।

সবাই জানেন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে ছেলে সন্তানরাই সংসারের হাল ধরে থাকেন। একটি কন্যা সন্তানও যে এ কাজটি করতে সক্ষম তা কারো বিশ্বাস হতে চায়না। এর পিছনেও কারণ আছে, মায়েরা ভাবেন মেয়েরা চলে যাবে অন্যের ঘরে। তাই ভবিষ্যতে তাদের থেকে কিছুই পাওয়ার আশা করা যায়না, তবে ছেলেরা অবশ্যই মা বাবার জন্য কিছু করবে।

এ নিয়ম ও এমন বিশ্বাস এখনও সমাজে প্রতিষ্ঠিত বলে এমন বৈষম্য আমাদের নজরে আসে। এই বৈষম্য দূর করতে যা প্রয়োজন তা হলো- প্রত্যেক ঘরেই বাবা-মা তাদের ছেলে-মেয়েকে এমন ভাবে শিক্ষা দিতে হবে যে সবাই সবার স্থানে স্বাধীন। সংসার জীবনে একে অন্যকে তাদের নিজ নিজ পরিবারকে দেখভাল করতে পারে সেই জন্য সুযোগ দিতে হবে। যদি দু’জনই কর্মজীবী হন বা একজন কর্মজীবী হন তাহলে দুজনার আলোচনা সাপেক্ষে উভয় পক্ষের পরিবারকে আর্থিক মানসিক সকল দিক থেকে সাপোর্ট দিতে হবে।

মা-বাবাদের ছেলে-মেয়ের অর্জিত অর্থের প্রতি লোভ-লালসা ত্যাগ করার মন মানষিকতা তৈরী করতে হবে। ছেলের ঘরে কর্মজীবী বৌ এলে, ছেলে ও বৌ এর উভয়ের উপার্জিত অর্থ ছেলের পক্ষরা এককভাবে ভোগ করার মোহ ত্যাগ করতে হবে। তাছাড়া সরকারী ভাবে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই পৈত্রক সম্পত্তির বিভাজন সমান হারে করার আইন তৈরী করে তা প্রতিফলিত করতে পারলেই হয়তো সম্ভব হবে ছেলে ও মেয়ের বৈষম্য দূর করা।