ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

সন্তানদের খাওয়ালে, পড়ালে, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পোশাক পরিচ্ছদ দিলেই সুসুন্তান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে বলা যায়না। তাদের সু-সন্তান হিসেবে গড়তে হলে, প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হল, তাদেরকেই সু-বাবা বা মা হিসেবে প্রমাণ রাখতে হবে। সু বাবা মা হতে হলে, প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হল ধৈর্যশীল, সু-শিক্ষায় শিক্ষিত, নিষ্ঠা ও ন্যায় পরায়ন, সৎ ও সততা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি মমত্ববোধ। এর যে কোন একটিও অনুপস্থিত থাকলে ‘সু’ শব্দটি প্রযোজ্য হবে না।

একজন মা সংসারে অনেক পরিশ্রম করেন। দশ মাস দশ দিন পেটে সন্তান ধারণ করেন। তাদের লালন পালন করেন, স্বামী ও সন্তানের যত্ন নেন, রান্না বান্নাসহ সংসার গুছিয়ে রাখেন, অতিথি আপ্যায়ন করেন তার সাধ্যমত। কিন্তু সেই কোন মা যদি হোন বদরাগী, স্বামীবিদ্ধেষী, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার প্রয়াসে যদি হোন স্বার্থপর তাহলে এই মা তার সন্তানকে কী শিক্ষা দিবেন? সন্তানকে পড়া বা কাজ করার তাগিদ দিতে গিয়ে, বুঝে বা না বুঝে সন্তানদের মুখমন্ডলে চর থাপ্পর মারা বা অন্য কিছু দিয়ে আঘাত করা, মেয়ে সন্তানদের চুলের মুঠি ধরে দেয়ালের সাথে বার বার আঘাত করা, তা হলে সে সন্তান তার মায়ের থেকে কী শিক্ষা নেবে?

সে ক্ষেত্রে বাবা যদি হোন ধৈর্য্যশীল, ন্যায়পরায়ণ, স্ত্রীর নানান অপবাদেও থাকেন অটল, স্ত্রীর অসৌজন্যমূলক কথা বা আচরণ উপেক্ষা করে শুধুমাত্র সন্তানদের সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষে সন্তানদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন, তাদের সহবৎ শিখানো হয়, যদি বাবা হোন সত্যবাদী, ন্যায়নিষ্ঠা, কোন অসৎ কর্মে জড়িত না থাকেন, বাবার আয় ব্যয় সম্পর্কে সন্তানদের জানিয়ে দেয়া হয়, তাহলে অবশ্যই সেই সন্তানেরা মিতব্যয়ী হতে বাধ্য। অকারণে কখনোই বাবার অর্থ অপচয় করতে উৎসাহিত হবেনা, সন্তানদের সুখ ও দুঃখে বাবা যদি হোন সহমর্মি , বড়দের সাথে ও ছোটদের সাথে কী রকম আচরণ হবে তা যদি শিক্ষা দেয়া হয় কিংবা সন্তানদের যদি কোন বিষয়ে মিথ্যা আশ্বাস না দেয়া হয়।

এভাবেই যদি সন্তানদের আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয় তা হলে সে সন্তান কী সু-সন্তান না হয়ে পারে? ওরাও তখন বাবার মত সৎ, সততা, সত্যবাদী, ন্যায়নিষ্ঠা, ও ধৈর্যশীল হয়ে ওঠে। ওদের মনে বিশ্বাস জন্মে বাবার সামর্থ্য অনুযায়ী তারা সব পাচ্ছে বা পাবে। এ সন্তানেরা তখন চেষ্টা করে টিউশনি বা কিছু একটা পার-টাইম জব করে পরিবারকে সাহায্য করা। তার মানে তাদের নিজস্ব ব্যয় নির্বাহ করা। এরাই হলো প্রকৃত সু-সন্তান। সমাজ ও পরিবেশের কারণে কখনো পথ বিচ্যুতি ঘটলেও আবার ফেরৎ আসে তার নিজের পথেই বা বাবার তৈরী করা দেখানো পথেই।

অপরদিকে বাবা যদি হয় বদমেজাজি কিংবা হয় রুক্ষভাষী, অধৈর্য্য, সন্তানদের প্রতি আচরণ যদি হয় অসৌজন্যমূলক কিংবা সততার অভাব থাকে, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়, ছোটদের প্রতিও মমত্ববোধেরর অভাব। যে বাবা সব সময় চায় সন্তানরা তাকে ভয় করে চলুক, তার হুংকারে পরিবারের সবাই সন্ত্রস্ত থাকুক। সেই বাবা যদি কারণে- অকারণে সন্তানদের গায়ে হাত তুলে, সামান্য কারণেই যদি বেধরক পেটানো হয়, কখনো বা হাত পা ভেংগে দেয়া হয়, তখন সোহাগী মা যদি সন্তানকে রক্ষা করতে এসে স্বামীর হাতে সন্তানদের সামনেই অত্যাচারিত হতে হয়, তা হলে সেই দুর্ভাগা সন্তানরা এমন শিক্ষিত বা অশিক্ষত বদমেজাজি বাবার নিকট থেকে কী শিক্ষা নিবে?

আল্লাহতালা যদি সেই সন্তানকে সু-সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য না করেন। যদি কোন কারণে সেই সন্তান তার বাবা মাকে অপমান করে বা এমন কথা বলে যা কষ্টের পাহার সমতূল্য, তাহলে কী এর জন্য দায়ী সন্তান? না তার বাবা? এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দায়ভার বাবার। যদি প্রায়শ্চিত্য কিছু করতেই হয় সেটাও তার বাবার, কারণ বাবা হিসেবে তিনি যেহেতু সু-বাবা হতে পারেন নি, সেহেতু সন্তানকেও সু-সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেননি।

এমন একটা পরিবারে মা যতই ভদ্র, ধৈর্যশীলা বা শিক্ষিতা হোন না কেন এ পরিবারে তিনি অকার্যকর। কেন না ভদ্র ও শিক্ষিতা হওয়ার কারনে স্বামী থেকে আর অসম্মানিত হতে চান না। আল্লাহতালা স্ত্রীর কর্তৃত্ব স্বামীর উপর ন্যস্ত করেছেন তাই কপট সমাজ পুরুষ তান্ত্রিক বৈশিষ্টকে আকড়ে ধরে রেখেছেন। একজন মা ধর্মীয় শিক্ষায় স্বামীর বিরুদ্ধে কিইবা করতে পারেন? বড় জোর রাগ করে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যেতে পারেন। সেখানেও শুনতে হয় মা এর কটুকথা। এক সময় সেই স্বামী স্ত্রীর গায়ে আর হাত তুলা হবেনা এমন শর্ত মেনে স্ত্রীকে নিজালয়ে নিয়ে আসে কিন্তু কুকুরের লেজ যেমন ঘি দিয়ে মালিশ করলেও সুজা হয়না তেমনি বদমেজাজি স্বামীও কোনদিনও সংশোধন হতে পারে না। আবার সেই বাবা একই আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

মা এর জাতিকে শ্রদ্ধা করাই প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু কোন কোন মা যদি স্বীয় স্বার্থে সন্তানদের উপর খর্গ চালায় সেই সন্তান তখন কী করবে? কতদিন সেই মা’কে সহ্য করবে? তারপরও সহ্য করতে হবে । সহ্য যে সন্তানদের করতেই হবে। গর্ব মা’য়ের, দশ মাস দশ দিন সেই সন্তানকে পেটে ধরেছেন। তাই মায়ের কথা বা সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে সন্তানদের মেনে নিতে হবে সে যত বড় শিক্ষিত বা চাকুরীজীবী হোক না কেন। এই যদি হয় একরুখা, স্বামী বিদ্ধেষী ও বদমেজাজি মা’দের আচার আচরণ এবং নিজ কর্তৃত্ব কে বজায় রাখার প্রয়াসে ছেলে ও বাবার মাঝে সংঘর্ষ ঘটানোর পয়তারা করে, আর সেই সন্তান যদি মা’কে ভালবেসে কিছু না বুঝে উনার কুমন্ত্রণা অনুুযায়ী কখনো বাবার বুকে কথার ছুড়ি বসিয়ে দেয়, সে জন্য কে দয়ী হবে? সন্তানরা সংসারের রাজনীতি কতটুকুই বা বুঝে? যখন বুঝতে পারে তখন আপসোস ব্যতিরেকে কিছুই করার থাকেনা। অথচ বাবার বুকে জমা হয় কষ্টের পাহাড়। যা নীরবেই হজম করে সময় অতিবাহিত করেন।

এ জাতীয় মা’দের কারণে অনেক সময় সৎ, সততা ও নিষ্ঠাবান, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, শান্ত স্বভাবের শিক্ষিত একটি ছেলে বা মেয়ে তাদের জ্ঞান ও গুণের স্বরূপ হারায়। তাই সন্তানকে সু-সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে, বাবা- মা উভয়কেই সু-বাবা মা হতে হবে।

লেখকঃ মোঃ জহিরুল হোসাইন খান নাছিম।