ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

মোবাইলের ঘ্যানঘ্যানানি ঘুম ভেঙ্গে গেল জিকুর।

ওফ! কেন যে এত সকালে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিলাম।

কেন আর, সকাল ৮:০০টায় ক্লাশ। তবে ৮:০০টা বাজতে এখন ৪৫ মিনিট বাকি, বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে হচ্ছে কে জানি হাত পা মেসেজ করে দিচ্ছে, আর চোখের পাতা দুটি নিচের দিকে আলতো করে ধরে রাখছে। আহ! কি শান্তির বিছানা।

রেডি হয়ে ক্লাশে যেতে লাগবে ৩০ মিনিট, কাজেই এই শান্তির শয্যায় আর একটু সময় দিলে দোষের কি? মোবাইলের এলার্ম বন্ধ করে জিকু আবার গা এলিয়ে দিল বিছানায়।

এরই মধ্যে কখন যে আবার ঘুম-ঘোরে চলে গিয়েছিল জিকু। তবে দ্বিতীয়বার যখন ঘুম ভাঙল তখন ক্লাশ শুরুর বাকি ১০মিনিট! ব্রাশ নিয়ে দৌড় দিল ওয়াশ রুমের দিকে। তাড়াতাড়ি প্যান্ট-শার্ট পরে দৌড় ক্লাশের দিকে। জিকু যখন ক্লাশে
পৌঁছল তখন ক্লাশটাইম ১০মিনিট পার হয়ে গেছে। আর ততোক্ষণে কাঙ্খিত attendance এর মৃত্যু ঘটেছে! জিকু ক্লাশে ঢুকল বিষণ্ণ মনে, স্যারকে অনুরোধ করেও লাভ নেই, attendance আর হবে না। ৮:০০ টার ক্লাশ ৮:০০টায় শুরু হয়েছে। জিকু ইজ ঠু-লেইট।

বন্ধুরা জিকুর ৮:১০এ ক্লাশে আসার সাফল্যে দাঁত বের করে হাসি দিয়ে অভিবাদন জানালো। ক্লাশে বসে পড়লো জিকু, কিন্তু attendance হারা ক্লাশে তার মনোযোগ নেই।

না, স্যারের ওপর কোন অভিমান নেই জিকুর। স্যার সততা শিখাতে চান, তারা চান আমরা আরও কর্মঠ হই। আমরা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মত কাজ করতে শিখি।

কিন্তু স্যারদের এই আশীর্বাদ কেন জানি আমাদের উপর কাজ করে না। আমরা ২৩ বছর বয়সী ছাত্র-ছাত্রী হয়ে থাকি, ২৩বছর বয়সী মার্ক-জুকারবার্গ হতে পারি না। হ্যাঁ, আমি সেই মার্ক-জুকারবার্গ এর কথা বলছি যেই ছেলেটি মাত্র ২৩ বছর বয়সে ফেইসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগের সাইট বানিয়ে বিশ্বকে আর একটি নতুন বিশ্ব উপহার দিয়েছে।

জিকু ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা নয় তাতে কি? জিকুর একটি ফেইসবুক একাউন্ট আছে। সেই একাউন্টে সে প্রতিদিন লগইন করে। তবে লগইন করতে গিয়ে একটু জিরিয়ে নিতে হয়, অনেক সময় চা-নাস্তা খেয়ে এসে দেখতে পায় তার ফেইসবুক হোমপেইজে ঢুকেছে। হলের ৪১০টাকার ইন্টারনেট লাইনের এই গতি। কিন্তু যেই মানুষগুলো হলে এই লাইন এর ব্যাবসা করে তাদের গলা টিপে জিকু বলতে পারে না “আয়, হাই স্পিড কাকে বলে শিখাই”, কি করে বলবে? তারাও সরকার এর কাছ থেকে ১৮,০০০টাকায় 1Mbps ব্যন্ডঊইথ স্পিড কিনে নেয় এক মাসের জন্য, যেই দেশের মানুষের বাৎসরিক মাথাপিছু আয় ৫১,৮২১ টাকা, সেই দেশে 1Mbps স্পিড কিনতে মাসে ১৮,০০০টাকা লাগে, সেই দেশের মানুষ হাই স্পিড ইন্টারনেট এর আশা করবে কিভাবে? তবু আমার দেশ, ডিজিটাল দেশ হতে যাচ্ছে! জিকু জানে না, কোনদিকে ডিজিটাল হচ্ছে তার দেশ, যেই দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মানসম্মত ইন্টারনট ব্যবহারের সুযোগ পায় না…..

মার্ক-জুকারবার্গ এর জন্ম যদি এই দেশে হত তবে সে এই স্পিডের ইন্টারনেট লাইন চালিয়ে বাঙ্গালী মার্ক-জুকারবার্গ হয়ে থাকত, ফেইসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক-জুকারবার্গ হতে পারত না।

যেই বাঙ্গালী হতভাগা ছাত্রদের রাতে ঘুমাতে হচ্ছে ছারপোকাকে সঙ্গী করে, সারা রাতভর তাদের রক্ত খেয়ে সকালে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে ছারপোকার দল। আর সকালের সেই ছারপোকার যন্ত্রণাবিহীন ঘুমকে উপভোগ করতে গিয়ে ক্লাশ মিস করছে।

এতসব এলোমেলো চিন্তার মাঝে জিকুর প্রথম ক্লাশ শেষ হয়ে গেছে। স্যার চলে গেলেন।

আজ টানা ক্লাশ, ১:৩০ থেকে আবার ল্যাব শুরু হবে। ল্যাব চলবে ৪:৩০ পর্যন্ত। কিন্তু জিকুকে আজ একটু তাড়াতাড়ি ল্যাব থেকে বের হতে হবে, ৬:০০ টার মধ্যে ছোট বোনকে নিয়ে কলেজ হোস্টেলে পৌছে দিয়ে আসতে হবে।

ল্যাবের নির্ধারিত সময় শেষ হবার আগেই, ৩:৩০টায় জিকু ল্যাব স্যারের কাছে গেল ছুটির জন্য, কিন্তু দুর্ভাগা জিকু সব কারণ বলে দিয়েও স্যারের মন গলাতে পারল না। নাহ! ডেস্কে ফিরে টুলের উপর বসে পড়ল জিকু, মনে মনে স্যারের সাথে তর্ক শুরু করে দিল!

স্যার, এখন আমার কোন বান্ধবী অনুরোধ করলে ঠিকই ছুটি দিয়ে দিতেন। ছেলেদের বেলায় সমস্যাটা কোথায়? তবে কি ছেলেরা সব দ্বায়িত্বপালনের জন্য, আর মেয়েরা সম-অধিকার রক্ষার জন্য?

নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো জিকু, চিন্তার পথ পরিবর্তন করে নিল। নাহ! মেয়েরা যে কিছু করে না তা নয়, তারাও ভালো রেজাল্ট করতে পারে। তারাও ল্যাবে কাজ করে, আর মাঝে মাঝে অসাবধানতা বসত chemical নিয়ে ভোগান্তির শিকারেও পরে!

এইতো কিছুদিন আগে এক বান্ধবী প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে হাতে সালফিউরিক এসিড ঢেলে ফেলেছিল। সেইদিন যদি মেয়েটি সাহায্যের জন্য কাউকে না পেত তাহলে কি অবস্থা হত? সালফিউরিক এসিড তার সুন্দর হাতে স্মৃতির কালো রেখা আঁকতো!

ঘটনাটা মনে পড়তেই জিকুর মনে কোথায় জানি এক টুকরো ব্যাথা জেগে উঠলো। না, বান্ধবীর হাতে এসিড পড়েছে তার জন্য নয়, জিকুর মনে অনেক ইচ্ছা ছিলো সে প্রজেক্টের কাজ করবে, তার সাবজেক্টকে নিয়ে কাজ করার প্রচণ্ড ইচ্ছা আছে জিকুর, তার সাবজেক্টকে সে ভালোবাসতে শিখেছে, এটা এখন তার কাছে প্রিয় বিষয়। কিন্তু জিকুকে প্রজেক্টের কাজ দেওয়া হয়নি! কারণ, তার রেজাল্ট খারাপ। এই দলে জিকু একা নয়। তার অনেক বন্ধুই প্রজেক্টের কাজের জন্য আবেদন করেও কাজ পায় নি। কারণ তাদের রেজাল্ট খারাপ!

কেন এমনটা হলো? ১ম বর্ষের ক্লাশ শুরু হওয়ার পর অনেকেই আবার ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে নতুন করে। তাদের ইচ্ছা আরও ভালো সাবজেক্টে পড়বে তারা। ফালতু সাবজেক্টে পরে কি হবে!

হ্যাঁ, অনেকে চলেও গিয়েছে। আবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা সাবজেক্টে(!)। এই নামকরা সাবজেক্টের ধারণাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংসের কারণ। এই ধারণা এল কোথা থেকে? আমাদের জীবন কি গুটিকয়েক নামকরা বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিষয় কি আমাদের জীবনের প্রয়োজনে গড়ে উঠেনি? তবে ১ম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা কেন নামকরা সাবজেক্টের আশায় নিজের সাবজেক্টকে অবমূল্যায়ন করে? পুনর্ভর্তির আশায় পড়ালেখা না করে ১ম বর্ষের রেজাল্ট খারাপ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গনে এসেও তারা শিখতে পারে না ক্যারিয়ার কোন বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজ তার ছাত্র-ছাত্রীদের শিখাতে পারেনা যে ভালো বিষয় জীবনকে বড় করে না, পরিশ্রম জীবনকে বড় করে,এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রীদের নিজের বিষয় নিয়ে কাজ করার আগ্রহ জাগাতে পারে না। এই শিক্ষার অভাবেই তারা একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও আবার চেষ্টা করে নামকরা সাবজেক্টে ভর্তির জন্য, নিজের সময় নষ্ট করছে, অন্যের সুযোগ নষ্ট করছে।

অবশেষে যখন তারা বুঝতা শেখে প্রকৃত শিক্ষা মানে ভালো রেজাল্টের সার্টিফেকেট নয়, আর ভালো সাবজেক্ট মানেই ভালো ক্যারিয়ার নয়, তখন তাদের কিছুই করার থাকেনা, রেজাল্ট খারাপ করার জন্য তাদের ভোগান্তির স্বীকার হতে হয়। কারন, আমার দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তার সকল ছাত্র-ছাত্রীর জন্য প্রয়োজনিয় শিক্ষা উপকরন রাখতে পারে না।

আসলে রেজাল্ট খারাপ এখানে বড় ব্যাপার না, সবাই যদি রেজাল্ট ভালো করে তাহলেও সবাইকে শিক্ষার উপকরন দিতে পারবে না আমার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

তবে তারা কি পরিশ্রম করতে জানে না? তারা কি ভালো করতে জানে না? জানে।। তারা GRE, TOEFL, IELTS দিচ্ছে, দেশের বাইরে যাচ্ছে, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, সেখানে তারা ভালো রেজাল্ট করছে, সেরা রেজাল্ট করে সতীর্থদের অবাক করে দিচ্ছে। তবে কেন এই হতভাগাদের প্রতিভার মূল্যায়ণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় না?

জিকুর অভিমান হয় দেশের কর্তাদের প্রতি যারা নিজের দলের নামকে ধরে রাখার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে। যাদের কার্যক্রমের জন্য এই দেশকে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ আমার দেশে এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধে শহিদের পরিবার ভিক্ষা করে খায়, এখনো এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা উপকরন পায় না।