ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এদেশে পোশাক শিল্প বিকাশে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে-সস্তা শ্রম বাজার। পোশাক শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশ নারী। এরা একটি সংসারের রুটি-রুজি সংস্থানের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আমাদের দেশের ডক্টরেটধারী অর্থনীতিবিদরা টেবিল ফাটিয়ে পোশাক শ্রমিকদের অবদানের কথা স্বীকার করেন বটে, কিন্তু তাদের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে যেনো বিড়ালের মতো মিউ মিউ করেন। আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিকরা অতটা উচ্চ শিক্ষিত নন বা অতটা অধিকার সচেতন নন যে, তারা তাদের সকল ন্যায্য প্রাপ্যটুকুর পক্ষে কথা বলতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে- মালিক পক্ষের পেটোয়া বাহিনী, ম্যানেজমেন্টের রক্তচক্ষুর শাসানি, কর্মী ছাটাই ইত্যাদি।

গার্মেন্টস মালিকরা এদেশেরই সন্তান। তাদের বিলাসী জীবন-যাপনের সুযোগ করে দিচ্ছে এদেশেরই সহজ সরল কাজ-পাগল মানুষ গুলো। কিন্তু তাদের সচেতনভাবে ঠকানো হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে না ন্যায্য মজুরি। চুরি করা হচ্ছে তাদের শ্রম-ঘন্টা। শ্রমচোরেরা অধীনস্তদের ঠকিয়ে বছরে পাঁচবার ওমরায় যাচ্ছে; সিঙ্গাপুর-দুবাই-মালয়েশিয়া যাচ্ছে ঈদ শপিং করতে, একসাথে অনেক জনকে হজ্জ্বে পাঠাচ্ছেন। শ্রমিকদের ঠকিয়ে মালিকদের এধরনের পরলৌকিক বিনিয়োগ কতখানি যুক্তিযুক্ত তা আমার অজানা।

বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলোতে পোশাক শ্রমিকরা ১৬-১৮ ঘন্টা কাজ করেন। এর মধ্যে ১২ ঘন্টা নিয়মিত ডিউটি, বাকীটা ওভার টাইম। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক কর্ম-ঘন্টা ৮। ১৬-১৮ঘন্টা ডিউটি করে বাসায় এসে বাজার করা, খাবার তৈরি করা ও খাবার খাওয়ায় কমপক্ষে ৩ ঘন্টা সময় ব্যয় হলে তাদের হাতে ঘুমানোর সময় থাকে না বললেই চলে। দিনের পর দিন অপর্যাপ্ত ঘুমে তাদের শরীর ভেঙ্গে পড়ে, মানসিক অবসাদ ও দৈহিক ক্লান্তি তৈরি হয়। দৈহিক অপুষ্টির পাশাপাশি মারাত্মক রক্তশুণ্যতা দেখা যায়, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। মাসে একদিন (সাপ্তাহিক) ছুটি হতে পারে। এর ফলে নারী শ্রমিকরা তাদের ছোট ছোট স্কুলগামী সন্তানদের দেখ-ভাল করতে পারেন না। এতে করে মা-বাবারা “সাপ্তাহিক মা-বাবা” য় পরিণত হন। মা-বাবা যখন রাত ১২টায় বাসায় ফেরেন তখন ছোট্ট শিশুটি ঘুমিয়ে থাকে, আবার সকাল সাড়ে ৭ টায় বাসা থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সময়ও সে ঘুমিয়ে থাকে।

সময়ের অভাবে নারী শ্রমিকরা শাক-সব্জি রান্না করে খেতে পারেন না। বেশির ভাগ সময় ডিম, ভাতের মধ্যে আলু সেদ্ধ দিয়ে ভর্তা আর ডাল– দিনের পর দিন চলে। অপুষ্টিতে ভোগার এটি একটি বড় কারণ। এমন কি সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি “সুখী” সংগ্রহ করতে তারা আশে পাশের ফার্মেসীগুলোতে ধরণা দেন। সরকারী হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার সৌভাগ্য তাদের হয় না। কারণ পর পর দু’দিন ছুটি তাদের কপালে জুটে না। অসুস্থ হয়ে যত দিন অ্যাবসেন্ট ততদিনের বেতন কাটা। যে কর্ম মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচতে দেয় না, তা কোন কর্ম নয়–অভিশাপ।

১০০% রপ্তানীমুখী গার্মেন্টসগুলো দু’ধরনের রেজিস্ট্রার বা ওয়ার্ক বুক মেইনটেন করে থাকে। এর মধ্যে একটি বিদেশি বায়ারদের দেখানো হয়। সেখানে শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন-ভাতা-ওভার টাইম আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী পরিশোধ দেখানো হয়। কেন এই লুকোচুরি? গরীবের হক (ন্যায্য পাওনা) বঞ্চিত করে রাজনৈতিক দলকে খুশি করা, ক্ষমতাসীন দলকে উপঢৌকন দেয়া সবই হচ্ছে, কেবল শ্রমিকের ঘাম গায়ে শুকিয়ে লবণ তৈরি হচ্ছে। পৃথিবীর মোট সম্পদের অর্ধেকের বেশি মাত্র ১% লোকের হাতে বন্দী। এ সম্পদ তৈরিতে, আহরণে ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের করুণ ইতিহাস। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বুঝিয়ে দেয়া কেবল মালিকেরই দায়িত্ব। —বখশিশ চাই না মালিক, পাওনাটুকু বুঝিয়ে দিন।—-

কৈফিয়ত: হাতেগোণা দু’চার জন মালিক তাদের অধিনস্তদের ঠকাচ্ছেন না এমনও নজির এদেশে আছে। তাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।