ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

৮ মার্চ, নারী দিবস। যেনতেন নয়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নানা ব্যঞ্জনায়, নানা উপমায় বিশ্ব ব্যাপী দিবসটি পালিত হয়েছে। পিছিয়ে ছিল না বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কমের ব্লগও। তবে ঘাটতি ছিল নারী ব্লগারের।

নারী দিবসেই যেন নারীকে মূল্যায়ন করা হবে, তাদের মর্যাদা তুলে ধরে জয়গান গাওয়া হবে। আর বছরের বাকি দিন গুলো? এবার দেখা যাক ব্লগের পোস্টগুলো–(১) নারীর মাঝেই যত কল্যান-সুখ শান্তি স্বর্গ— আতাস্বপন (২) নারী দিবসে আবহমান চেতনা— আসাদুজজেমান (৩) মহিলা, নাকি নারী? — জয়নাল আবেদীন (৪) আন্তর্জাতিক নারী দিবস: সর্বস্তরের নারী ও আমাদের সমাজ — সোহেল আহমেদ পরান (৫) ৮ ই মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস— মো: আসাদুজ্জামান (৬) ”প্রীতিলতা” বাঙালি নারী স্বাধিকারের পথিকৃত— নাজমুস সাকিব সাদি (৭) নারীর প্রতি অমানবিক প্রবৃত্তি ও নির্মমতার শেষ কোথায়—সুমিত বণিক (৮) নারী ও লৈঙ্গিক রাজনীতি — ফারদিন ফেরদৌস (৯) সমাজের চোখে নারী এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবস— রোদেলা নীলা (১০) আন্তর্জাতিক নারী দিবস: অধিকার, মর্যাদায় নারী- পুরুষ সমানে সমান— আজমাল হোসেন মামুন। (১১) আন্তর্জাতিক নারী দিবস: নারী মেয়ে মানুষ নয়, মানুষ — কাজী রাশেদ।
পোস্ট গুলোতে নারীর প্রতি ব্লগারদের নিজস্ব মতামতসহ পরিবার, সমাজ, ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি চুলচেরা বিশ্লষণ করা হয়েছে। এখানে রোদেলা নীলা ব্যতীত অন্যরা পুরুষ। স্বাভাবিক ভাবে যে সব পুরুষ এখানে নারী বন্দনা করেছেন, তারা নারীর প্রতি নিবেদিত-প্রাণ বলা যায়। বিশ্ব নারী দিবসে কাকে সচেতন করা দরকার ছিল- নারীকে নাকি পুরুষকে? এ প্রসংগে একটি বাস্তব ঘটনা মনে পড়ল–
২০০৪ সালে কোন এক সকালে আমার চতুর্থ শ্রেণির ভাইগনাকে তার সমাজ বই থেকে পড়াচ্ছি: ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর অধিকার, মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বিশ্বব্যাপী এ দিনটি পালন করা হয়। পারিবারিক ক্ষেত্রে নারীকে নির্যাতন করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ পড়া থামিয়ে ভাইগনা বলল- “এগুলো আমাকে পড়িয়ে কী হবে। এ তো আপনার আর আব্বুর পড়া দরকার।”” আমি ঠাটা- পড়া মানুষের মত বসে রইলাম আর ভাবলাম ৯/১০ বছরের একটা শিশু যা বুঝতে পারল আমাদের কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারলনা। বরং লেসন থেকে কোমলমতি এই শিক্ষার্থী এটুকু অর্জন করল যে, নারীর প্রতি পুরুষ বা বড়রা সহিংস আচরণ করে, তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়।

আমরা নারী বন্দনায় চ্যাম্পিয়ন। এই বন্দনা বা পটানোর মধ্যে থাকে কামুক স্বার্থ। একজন নারীর শরীরের কোন অংশটুকু নারী, বিপরীতক্রমে পুরুষের শরীরের কোন অংশটুকু পুরুষ। সেক্স অর্গান ব্যতীত আর পার্থক্য কোথায়? নারী যে মানুষ সে কথাটি আমরা বেমালুম ভুলে যাই। ভুলে যাওয়াটা আমাদের মজ্জাগত। পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতা বংশ পরম্পরায় আমরা অর্জন করছি। এই প্রবণতার কারণে নারীকে যৌনসংগী, সন্তান উৎপাদক যন্ত্র হিসেবে পুরুষ বিবেচনা করে। অত্যন্ত তরল ভাবনা এটি। এখান থেকে বের হলে পারলে নারীর জন্য কোন দিবসের দরকার নাই। মানুষ হিসেবে নারী বেঁচে থাকবে স্বমহিমায়।

পুঁজিবাদের অলঙ্কার হচ্ছ “বিজ্ঞাপণ”। বিজ্ঞাপণের একটি নতুন শাখা হচ্ছে “দিবস” পালন। হরেক রকমের দিবস। অদূর ভবিষ্যতে পুঁজিবাদ হয়তো বিভিন্ন দিবস গুলোর জন্য একটি দিবস পালন করবে। “দিবস পালন “– কর্পোরেট বানিজ্যের নতুন সংস্করণ। বিভিন্ন দিবস পালনের নামে সারা বিশ্বে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বানিজ্য হয়ে থাকে। গত দু বছর ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরোয়াা অনুষ্ঠান “দিপাবলী” কে ভারতসহ বিশ্বের নামিদামী টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপণ দিয়ে জাতীয় অনুষ্ঠাণ ” হ্যাপি দেওয়ালি” তে পরিণত করেছে। আর একাজে কোটি কোটি টাকা লগ্নি করেছে ভারতের সব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান গুলো। উদ্দেশ্য হচ্ছে- মুনাফা অর্জন।

নারী দিবস পালন, আমার কাছে এটা নারীকে অবমাননার শামিল। নারী তো একদিনের জন্য নয়। প্রতিটি মুহূর্ত নারী পুরুষের ছায়া- সঙ্গী। একটি দিনের জন্য ঘটা করে তাকে সম্মান দেখিয়ে বছরের বাকি দিনগুলোতে অবহেলা, অমর্যাদা,অপমান প্রাপ্য হলে, দিবস পালন লৌকিকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। নারী অধিকার, মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব কেবল মাত্র পুরুষের। সুতরাং পুরুষকে নারী-অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সচেতন হতে হবে, অথবা সচেতনতা বাড়াতে হবে। পুরুষের জন্য আলাদা দিবস নেই কেন? কারণ সে কর্তৃত্বশীল? তার কি অধিকার, মর্যাদার বিষয়ে সচেতনতার দরকার নেই? পুরুষ কি গৃহে বা সমাজে নির্যাতিত হন না? প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার দিবস থাকার পর নারী দিবস, কন্যা দিবস, মা দিবস, খালু দিবস, আলু দিবস ইত্যাদি কর্পোরেট ভাওতাবাজি, বৈ কিছু নয়।

কন্যা- জায়া- জননী সম্পর্কের বাইরে নারী মানুষ। পুরুষের মতোই মানুষ। গৃহে, সমাজে, রাষ্ট্রে যোগ্যতা অনুযায়ী তার নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত। সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত নারী পুরুষের কাধে কাধ মিশিয়ে পথ চলছে, কোথাও ছন্দ পতন হয়নি। তার জন্য দরকার হয়নি, তথাকথিত নারী দিবসের। নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা উচিত- পুরুষকে লক্ষ্য করে। ঐ দিন পুরুষদের একত্রিত করে –পারিবারিক সহিংসতা, নির্যাতন, অবহেলা ইত্যাদি বিষয়ে তাদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। কিন্তু বাস্তবতা অন্য রকম।

পুুরুষ যত দিন না তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করবে, তত দিন নারীমুক্তি সম্ভব নয়। একদিকে নারীকে পণ্যে পরিণত করার কৌশল অবলম্বন করবে, অন্যদিকে রাজপথে নারীমুক্তির স্লোগান। স্ববিরোধী ও দ্বিমুখীতা– পরিত্যাজ্য।।