ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

ছোটবেলা থেকেই পড়ার একটা বাতিক ছিল। হাতের কাছে যা পেতাম তাই পড়তাম, বুঝি বা না বুঝি। না বুঝার ঘোরে যা কিছু পড়েছি তার অনেক কিছুই আজ বিস্মৃত। এ রকম একটি ঘটনা। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। আব্বার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিলাম একটা বই কিনব বলে। সাপ্তাহিক বাজারের ফুটপাথ থেকে কেনা বইটির নাম–আরব্য রজনী। প্রায় একশ’র মত গল্প ছিল ওটাতে। জ্বীন-পরীর গল্পগুলো বেশি ভাল লাগত। আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করেছিলাম- প্রত্যেকটি গল্পে নারীঘটিত ব্যাপার ছিল। নারী, মদ আর জ্বীন- পরী ছিল আলিফ লায়লার মৌল উপাদান। কয়েকটি ঐতিহাসিক চরিত্রের মধ্যে বাদশা হারুন-অর-রশিদ ছিলেন অন্যতম। আমার কেনা আরব্য রজনী ‘তে একটা গল্পের নাম ছিলঃ এক দিনের বাদশা আবুল হোসেন।

বাদশা হারুন-অর-রশিদ নৈশ ছদ্মবেশে প্রজাদের অবস্থা স্বচোখে দেখতে বের হতেন। তাঁর আরো একটি স্বভাবজাত নিয়ম ছিল- রাতের খাবার কোন একজন মুসাফিরকে সঙ্গে নিয়ে খাওয়া। শুনতেন তার মনের কথা, চেষ্টা করতেন কোন ইচ্ছা পূরণ করতে। এরই ধারাবাহিকতায় একদিন বাদশার সাথে পরিচয় ঘটে জনৈক আবুল হোসেনের। নৈশভোজ শেষে বাদশা জানতে চাইলেন- তার কোন অভিলাষ আছে কি না? আবুল হোসেন অকপটে জানালেন তিনি একদিনের জন্য হলেও বাগদাদের খলিফা (বাদশা) হতে চান। পরের দিন তাই হল। এবার দেখি আবুল হোসেনের পরিবর্তে জাকির হোসেন কী করেন! জাকির হোসেন অবশ্য বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হতে চান।

[ রাত দ্বিপ্রহর, প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুর এক প্রান্তে জনৈক ছদ্মবেশী ]

ছদ্মবেশীঃ আসসালামু আলাইকুম।
পথিকঃ ওয়া আলাই কুমুসসালাম।
ছদ্মবেশীঃ আপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছ। জনাবের কাছে আমার একটা
আর্জি ছিল।
পথিকঃ জ্বি, বলুন।
ছদ্মবেশীঃ আমি রাতের খাবার কোন না কোন মেহমান সঙ্গে নিয়ে খাই। আজ তেমনই কারো জন্য অপেক্ষা করছি। সৌভাগ্যবশত: আপনার সাক্ষাত পেলাম। আজ আপনি আমার মেহমান হলে কৃতজ্ঞ থাকব।
পথিকঃ কিন্তু আপনার পরিচয় তো জানা হল না। তাছাড়া আপনার পান্থশালা কত দূরে?
ছদ্মবেশীঃ আমাকে ভুল বুঝবেন না, জনাব। আমার পরিচয় নিশ্চয়ই জানবেন। আমি এখান থেকে সামান্য দূরে থাকি।

(পথিক মনে ভাবলেন, অনেকটা পথ হেঁটেছি। ক্ষুদপিপাসায় ক্লান্ত।ভনিতা না করে…)
পথিকঃ চলুন জনাব।
ছদ্মবেশীঃ ধন্যবাদ, আমাকে অনুসরণ করুন।

দু’ জন জনপথ ধরে হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে তারা উঁচু প্রাচীর ঘেরা এক বিশাল বাড়ীর সামনে এসে পৌঁছলেন। পথিক এ বাড়ীতে কখনো প্রবেশ না করলেও চিনতে পারলেন। হাই সিকিওরিটি তোরণ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে না করতে জিজ্ঞেস করল-
পথিকঃ এ তো বঙ্গভবন?
ছদ্মবেশীঃ আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আ. হা.. আমি আপনাদের বেতনভুক্ত সেবকমাত্র। নি:সঙ্কোচে চলে আসুন।
এই প্রথম কোন রাজপ্রসাদে পথিকের প্রবেশ। জনগণের টাকায় কেনা প্রাসাদের জৌলুস দেখলেন। আর ভাবলেন, সেবকের যদি এমন চাকচিক্যময় জীবন- যাপন হয় তাহলে এরা প্রভু হলে কী করতেন! যা হোক, অবান্তর ভেবে লাভ নেই। পথিক নিজেকে সামলে নিলেন। দু’জনে খেতে বসলেন। খাওয়ার ফাঁকে–
প্রেসিডেন্টঃ জনাব, আপনার নামটা কিন্তু জানা হয় নাই।
পথিকঃ দু:খিত, আমার নাম জাকির হোসেন। আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।
— এই সম্ভোধনটি আমার শিষ্টাচারের সাথে খাপ খায় না। কি করেন আপনি?
—আমি ভবঘুরে।
— এটা কোন পেশা নাকি?
—না, তা নয়। তবে এটা আমার উওারাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত।
— মানে?
— আমার বাবা কোন কাজ করতেন না। পিতামহ থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি তার দুধ- ভাতের উৎস।
— আপনার ছেলে-মেয়ে?
— দু:খিত, আমি এখনও বিয়ে করিনি।
— কেন? আপনার তো যথেষ্ট বয়স হয়েছে।
— জনাব, ভবঘুরের জন্য সংসার নয়। এরা স্ত্রী- সন্তানদের প্রতি যত্নবান নন।
— হ্যাঁ, আমাদের রেল মন্ত্রীও এতটা দেরিতে….। থাক ও সব।

( ইতোমধ্যে খাবার খাওয়া শেষ হল। সুদর্শনীয় কাচের গ্লাসে রঙিন তরল পদার্থ পরিবেশিত হল)
— নিন, একটু চুমুক দিন। ভুল বুঝবেন না। ইহা সরাব নয়। পারস্য দেশের ফলের নির্যাস। লোকে আমাদের শুধু শুধু ভুল বোঝে। এগুলো কেবলমাত্র হজম সহায়ক।
— জ্বি, আচ্ছা ( গ্লাস হাতে তুলে নিতে নিতে…)
— এবার আপনি আপনার একটা ইচ্ছার কথা বলুন যা আমার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব।
— আমি একদিনের জন্য বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হতে চাই।
( মনে মনে প্রেসিডেন্ট প্রমাদ গুনলেন। তাই বলে নিজের ক্ষমতা হারানোর উপক্রম। বুকে সাহস সঞ্চয় করে বললেন)–
— আগামি কাল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আপনি বাংলাদেশের প্রসিডেন্ট পদে অধিষ্টিত থাকবেন। তবে আপনি এই অল্প সময়ে কী কী পদক্ষেপ নিতে চান তা শেয়ার করলে কাজ এগিয়ে নিতে সুবিধা হবে।
— আপনার মহানুভবতা ও উদারতার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। আমি ব্যক্তিগত কোন সুবিধা নেব না। শুধু দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য মহান সংসদে কয়েকটি আইন পাস করাব। আপনি এ ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যক্তিবর্গ দ্বারা আমাকে সহযোগিতা করলে চির কৃতজ্ঞ থাকব।
— অবশ্যই।
( লাল টেলিফোন নিয়ে সংসদ সচিবকে বললেন পরের দিন সকাল দশটায় অধিবেশন ডাকতে, আইনমন্ত্রীকে সকাল আটটার মধ্যে বঙ্গভবনে উপস্থিত থাকতে বললেন এবং অন্যান্যদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন)
— আপনার ক্ষণস্থায়ী বাদশাহী জীবন সোনার হরফে লেখা থাক এই কামনা করে বিদায় নিচ্ছি। খোদা হাফেজ।

পর দিন সকালে নতুন প্রেসিডেন্ট তার কাঙ্খিত রাজ কার্য শুরু করলেন। আইন মন্ত্রীকে নতুন আইন গুলোর বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দেখতে বলা হল।
—মন্ত্রী মহোদয়, আইনগুলো আজই মহান সংসদে পাস করিয়ে নিবেন। এবং বিলগুলোতে আমি যেন সূর্যাস্তের আগেই সই করতে পারি।
— জ্বি, স্যার। অবশ্যই আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
— কোন অসঙ্গতি পেলেন?
— অসঙ্গতি নয় স্যার, তবে প্রথম আইনটি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রবল আপত্তির মুখে পড়বে।
— অতি সাম্প্রতিক তনুর ঘটনায় ওরা কি কোন বিবৃতি দিয়েছে? ওরা কি মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে?
— না, স্যার।
— তবে? রাষ্ট্র বড় নাকি তথাকথিত অ্যামনেস্টি বড়? রাষ্ট্রের চেয়ে কোন সংগঠন, সংস্থা বড় নয়। নতজানু নীতি পরিহার করুন।
— সরি স্যার। আমি আসছি।
— অবশ্যই সূর্যাস্তের আগে।

যথাসময়ে আইনগুলো সংসদে উঠলো।
১ম আইনটি– ধর্ষণ বিরোধী আইন। এতে বলা হয়েছেঃ
পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র যেখানেই নারী ধর্ষণের শিকার হোক না কেন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে ধর্ষকের যৌনাঙ্গ/ লিঙ্গ কর্তন করা হবে।
যে এলাকায় একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যাবে বা ক্লু বিহীন করতে তাকে মেরে ফেলা হলে- ঐ এলাকার সম্ভাব্য সকল পুরুষের ডিএনএ টেস্ট করা বাধ্যতামূলক।
ডিএনএ টেস্টের জন্য পুলিশ ধর্ষিতার শরীর থেকে/ যৌনাঙ্গ থেকে বীর্য, লালা, চুল, ফিঙ্গার প্রিন্ট ইত্যাদি নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করবে। এতে কোন গাফেলাতি/ অবহেলা পাওয়া গেলে দায়িত্ব প্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সাথে সাথে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। তিনি কোন আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন না।
ধর্ষণের ফলে সন্তান জন্ম নিলে, ধর্ষকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে অর্ধাংশ উত্তারাধিকার প্রাপ্ত হবে।

২য় আইনটি — দূর্নীতি বিরোধী আইন। এতে বলা হয়েছে ঃ
ঘুষ লেনদেন, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, শেয়ার কারসাজি, রিজার্ভ মানি চুরি, যে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়- ছয় করলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমের জড়িত সকল পক্ষের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।
সম্পদ হারানো পরিবারের স্কুলগামী সন্তানের সকল খরচ রাষ্ট্র বহন করবে।

৩য় আইনটি– রাষ্ট্র ধর্ম আইন। এতে বলা হয়েছেঃ
রাষ্ট্র কোন ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। সকল ধর্ম সমান মর্যাদা পাবে। সংখ্যাগরিষ্ট, সংখ্যালঘু, সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি শব্দ (ধর্মের সাথে) ব্যবহার করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে কিছু নেই। কারন রাষ্ট্র একটি নিরপেক্ষ সংগঠন।
আইনসমূহ মহান সংসদে পাস হয়ে বিল আকারে তা নতুন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য বঙ্গভবনে এসে পৌঁছাল গোধূলি বেলা। বিলে সিগনেচার করতে করতে প্রেসিডেন্ট অনুভব করলেন — বিছানা বেশ ভেজা। হঠাৎ উঠে বসলেন, এ কি কান্ড! এমন মধুর স্বপ্নে এ কোন স্বপ্নদোষ!!!