ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

ধর্মীয় রীতি মানব সমাজে চালু হওয়ার আগে মৃতদেহ সৎকারের বিভিন্ন পন্থা মানব সমাজে চালু ছিল। আদিম সমাজে এমন সব নিয়ম চালু ছিল যা এক কথায় জঘন্য। যেমন– কোন একটি সমাজে কঠিন রোগ অথবা বার্ধক্যে উপণীত হওয়া ব্যক্তির আসন্ন মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকলে তাকে হত্যা করে মাংস আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী বন্টন করে খেত। এ ধরনের নিয়ম কেমন করে মানব সমাজে স্থান করে নিয়েছিল তা বলা মুশকিল।

ইহুদী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মে মৃতদেহ দাফন করার পদ্ধতি প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) এর সময়কাল থেকে শুরু হয়। ঘটনাটি এমন– আদম ( আঃ)- এর দুই পুত্র সন্তান কোন্দলে জড়িয়ে একে অন্যকে হত্যা করে। হত্যাকারী লাশ নিয়ে কী করবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না। এমন সময় দুটি কাক উড়ে এসে হত্যাকারির সামনে কোন্দলে জড়িয়ে একে অন্যকে ঠোকরাতে থাকে এবং একটি আরেকটিকে মেরে ফেলে। জীবিত কাকটি ঠোঁট দিয়ে মাটি খুঁড়ে মৃত কাকটি নিয়ে মাটি চাপা দেয়। হযরত আদম ( আঃ)- এর পু্ত্র এ থেকে একটি উপায় পেলেন এবং তিনিও মৃত ভাইকে অনুরূপ দাফন করলেন। এভাবে একটি কবর- সংস্কৃতি চালু হল।

সনাতন হিন্দু ধর্মে শবদেহ পোড়ানো হয়। এটি পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্মও গ্রহণ করে। ধারণা করা হয়, মৃতদেহ সৎকারের এ রীতিটি বেদ পরবর্তী যুগ থেকে চালু হয়। বেদ সংকলিত হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ অব্দের মধ্যে। কেন পোড়ানো হয়? যেহেতু আত্মা ব্যতীত দেহ মূল্যহীন। আবার পচনশীল দেহে আর কোন আত্মার আগমন ঘটবেনা, তাই। এছাড়াও হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পুনর্জন্মবাদে বিশ্বাসী। এ বিশ্বাসের মূল কথা হচ্ছে — কর্মফল অনুসারে মৃত্যুর পর জীব ( আত্মা) নতুন কোন দেহ প্রাপ্ত হয়ে পৃথিবীতে আসবে যত দিন না তার নির্বাণ ( মুক্তি) ঘটে। এ সব কারণে পুরাতন মৃতদেহটি অস্তিত্বহীন করাটা তাদের (বেদের ঋষিদের) কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। এ বিশ্বাস আরেকটি সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।

আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস যাই হোক না কেন, মৃতদেহের ওপর মানুষের আত্মার কর্মফলের কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে – মিশরীয় মমির কথা বলা যায়। কয়েক হাজার বছর পরও এগুলো অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় মানুষের অবিকৃত মৃতদেহ পাওয়া গেছে। অবশ্য পচনশীল অংশটুকু ঠিকই পঁচেগেছে।

মৃতদেহ সৎকারের প্রথাগত নিয়মের বাইরে আমরা একে মানুষের কল্যাণে ও পরোপকারে ব্যবহার করতে পারি। তা হল- মরণোত্তর দেহ দান। মৃতদেহ শুধু শুধু মাটির নীচে পঁচে যেতে না দিয়ে তা মানব কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। এ বিষয়ে কোন ধর্মীয় বিধি- নিষেধ আমার জানা নেই।

মরণোত্তর দেহ দানের মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানকে বেশ খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। শিক্ষার্থীরা ডামি শিক্ষার পরিবর্তে যদি প্রাকটিক্যাল শিক্ষা পায়, তবে তাদের মনোবল, সাহস বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ সহজ হয়। শিক্ষার্থীরা আরো যোগ্য হয়ে ওঠে। যোগ্যতাসম্পন্ন ডাক্তার তৈরিতে মরণোত্তর দেহ দানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমরা দেশ ও জাতি গঠনে অবদান রাখতে পারি। সন্ধানীর মাধ্যমে চক্ষু দান করে – অন্ধজনে আলো দিতে পারি। আমার মৃত্যুর পর যদি আমার চোখ ব্যবহার করে একজন দৃষ্টিহীন মানুষ পৃথিবীর রঙ- রূপ- সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারে এরচে আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে!

মানুষের মৃত্যুর ২৪ ঘন্টার মধ্যে কর্ণিয়া সংগ্রহ করতে হয়। এবং তা ফ্রিজিং করে ৭২ ঘন্টার মধ্যে অন্ধজনের চোখে স্থাপন করতে হয়। অনুরূপভাবে কিডনি, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা যায়। এভাবে আমরা আমাদের মৃতদেহ উৎসর্গ করে অন্ধব্যক্তি, মুমূর্ষূ ব্যক্তির শুধু উপকার নয় জীবনও রক্ষা করতে পারি। একটা কথা মনে রাখা উচিত- মানুষের ক্ষতি করা খুব সহজ, কিন্তু উপকার করা অ-নে-ক কঠিন। আপনি বার বছর চেষ্টা করেও একজনের উপকার করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু….।

মরণোত্তর দেহ দানের জন্য প্রয়োজন ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, মানসিক দৃঢ়তা ও পারিবারিক সহযোগিতা। এই তিনের কোন একটির ঘাটতি থাকলে আপনার মৃত্যু-পরবর্তী অবদান ম্লান হয়ে যেতে পারে। কাউন্সেলিং- এর মাধ্যমে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমাদের সমাজে কিছু কিছু মানুষ আছেন যাদের কাছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে মানব সেবা বা পরোপকারই একমাত্র উপাসনা বা ইবাদত। তাদের জন্য মরণোত্তর দেহ দান বাড়তি পাওনা।

আসুন পরোপকার ও মানব কল্যাণে মরণোত্তর দেহ দান করি।