ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

যদি একটি প্রশ্ন রাখা হয়– কোন শিক্ষা পৃথিবীকে শাসন করছে? উত্তর হবে : স্বশিক্ষা। গতানুগতিক একাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থেকে মানুষ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি, আপন প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দ্বারা যা কিছু অর্জন করে তাই স্বশিক্ষা।
সভ্যতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী উপাদান হচ্ছে ভাষা। ভাষার কথ্য রূপ সৃষ্টির সুদীর্ঘ কাল পরে লেখ্য রূপ সৃষ্টি হয়েছে। শুরু হয়েছে একাডেমিক শিক্ষার। কিন্তু একাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থা শুরুর অনেক আগেই স্বশিক্ষা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। একাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ও বিস্তারের তাগিদে মানুষ আবিষ্কার করেছে কাগজ, কালি- কলম, তৈরি করেছে মুদ্রণ যন্ত্র, বই- পুস্তক ও অবকাঠামো। কালের কষাঘাতে একাডেমিক শিক্ষা এখন বানিজ্যিক শিক্ষায় পর্যবসিত হয়েছে।

একদিনের জন্যও বিদ্যালয়ে না গিয়ে যারা পৃথিবীকে পাল্টে দিতে সক্ষম হয়েছেন তাঁদের তালিকা দীর্ঘ নয়। গুটি কয়েক মানুষ এই অসাধ্য সাধন করেছেন। মৃত্যুর পরও তাঁরা আদর্শ, নৈতিকতা, ভালবাসা, উদারতা ও জীবনমুখী শিক্ষা দ্বারা পৃথিবীতে অমর হয়ে রয়েছেন। পূর্ব দিক থেকে শুরু করলে এই তালিকায় রয়েছেন: কনফুসিয়াস, গৌতম বুদ্ধ, শ্রী কৃষ্ণ, লালন, ঈসা (আ), মুসা (আ), মুহম্মদ (স), জরথস্ত্র প্রমুখ। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- এদের প্রত্যেকের জন্ম বিষুব রেখার আশে-পাশে।

প্রশ্ন হতে পারে, এরা কীভাবে শিখলেন? কোথা হতে শিখলেন? এদের শিক্ষা-গুরু কে? যেহেতু আমি অলৌকিকতায় বিশ্বাসী নই, তাই আমার জবাব হচ্ছে– প্রকৃতি (the nature)। প্রকৃতি-ই তাঁদের শিক্ষা-গুরু, প্রকৃতি তাঁদের পুস্তক, প্রকৃতি-ই তাঁদের বিদ্যালয়, মহা বিদ্যালয় সর্বোপরি বিশ্ব বিদ্যালয়। তাই তো কবি সুনির্মল বসু যথার্থই বলেছেন, ” বিশ্ব- জোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র”…..। মানুষের নিজস্ব কোন জ্ঞান নেই। সে জ্ঞানের পরিবাহী মাত্র। আবার জ্ঞান আসমান কিম্বা অনুরূপ কোন স্থানে জড়ো করা নেই যেখান থেকে মানুষের কাছে আসে। জ্ঞানের উৎস ভূমি হচ্ছে – প্রকৃতির বস্তুনিচয় (object)। মানুষের কাছে এ পর্যন্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের যতগুলো শাখা-প্রশাখা রয়েছে সব গুলো প্রকৃতি- জাত।

চীন, জাপানের কোটি কোটি মানুষ কনফুসিয়াস-মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত। গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ও আদর্শ পূর্ব তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে শাসন করছে। তিনি তো স্রষ্টার অস্তিত্বহীনতার প্রবর্তক। অর্থাৎ তাঁর প্রচারিত ধর্মে সৃষ্টিকর্তার স্থান নেই। একজন সাধারণ মানুষ হয়ে এ ধরনের মতবাদ প্রকাশ ও প্রচার করা অসাধারণ মানসিক দৃঢ়-চেতার পক্ষেই সম্ভব। শ্রী কৃষ্ণ তাঁর প্রেমময় জীবন ও কর্ম দ্বারা মানুষকে ধার্মিক করেছেন। লালনের চার্বাক দর্শণ বিশ্ববাসীকে আলোড়িত ও আন্দোলিত করে। তিনি হলেন একাডেমিক শিক্ষিতদের থিসিস ব্যাংক। সংক্ষিপ্ত জীবনের অধিকারী ঈসা ( আ.) বিনয়ী-পুরুষ। নিজ জাতির মুক্তির জন্য সকল অন্যায় অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে ক্রুশে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। রহস্য-পুরুষ ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। তিনি ধর্ম- দর্শণে এমন এক আগ্রহের সৃষ্টি করেছেন যা আজো রহস্যাবৃত। “লা ইলাহা ইল্ ল্লাহ” তিনিই সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেছিলেন। মানুষ মানুষকে পুজা করবেনা, আল্লাহ-ই একমাত্র উপাস্য –এই ছিল তাঁর মৌলিক শিক্ষা। বর্তমান ইরান তথা পারস্যে জরথস্ত্র মতবাদ প্রচলিত ছিল। এরা অগ্নি উপাসক হলেও প্রাক-ইসলামী অনেক আইন কানুন তাদের থেকে এসেছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর ও অসভ্য একটি জাতিকে নিরক্ষর মুহম্মদ (স.) অত্যন্ত সার্থকতার সাথে ধর্ম ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়েছিলেন। এভাবে পৃথিবীর সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে স্বশিক্ষিত ক্ষণজন্মা মানুষগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।

একাডেমিক কাঠামোবদ্ধ শিক্ষা মানুষকে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। পক্ষান্তরে স্বশিক্ষা মানুষকে উদার, মানবিক ও যোগ্যতম ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে তোলে। স্বশিক্ষার জয় হোক।।