ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

ব্লগ, ব্লগার, ব্লগিং নিয়ে পৃথিবীর আর কোন দেশে এতটা বিতর্ক আছে কিনা জানা নেই।জানার ইচ্ছেও নেই। কিন্তু আমাদের দেশে যতটা না বিতর্ক তার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতায় আক্রান্ত। অবশ্য এ পর্যন্ত যত জন ব্লগার “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিহত হয়েছেন, তাদের কারোরই লেখা আমার পড়া হয় নাই। তারা যদি সত্যি সত্যিই ধর্মকে কটাক্ষ করে লিখেন, অবশ্যই তা আপত্তিকর। আপনি ধর্ম মানেন আর নাই মানেন- অন্যের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করার কোন অধিকার আপনার নেই। কোন বৈজ্ঞানিক পরিক্ষা- নিরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রমান ছাড়াই ধর্ম এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সব থেকে প্রভাবশালী মতবাদ। ধর্ম নিয়ে বিতর্ক করা যাবে, কিন্তু কোন সমাধানে পৌঁছা যাবে না। ফলে এ সব নিয়ে অযৌক্তিক কথা না বলাই ভাল। তবে ধর্মে যদি কুসংস্কার, ধর্মান্ধতার লেবেল থাকে, তা রিমুভ করতে আপনার অবদান থাকতে পারে। ধর্মকে ধরাশায়ী করেছেন স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতব্বর। তিনি যে সব প্রশ্ন উত্থাপণ করেছেন তার জবাব দিতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষক যে বই লিখেছেন তা রীতিমত হাস্যকর। এ ধরনের হাস্যকর জবাব মাঝে মধ্যে ইসলামী ওয়াজ বিক্রেতা ডাক্তার জাকির নায়েকের মুখে শুনি।

কেন ব্লগিং করছি? অথবা কেন ব্লগার হিসেবে নিবন্ধিত হলাম? আমার মতে, একজন ব্লগার প্রথমে একজন সচেতন পাঠক, দ্বিতীয়ত: লেখক। তবে পাঠকের লেখক হয়ে ওঠায় থাকে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। যেহেতু ব্লগারের লেখার পেছনে অর্থনেতিক কর্মকাণ্ড অনুপস্থিত, ফলে অর্জিত জ্ঞানের নির্যাসটুকু তার প্রেরণা। লেখকের করোটিজাত চিন্তা-চেতনা ভাষা বন্দী হয়ে হাজার মানুষের সামনে সমালোচনার জন্য উপস্থাপিত হওয়া এবং যোগ্যতার মাপকাঠিতে তা উৎরে যাওয়া— একজন ব্লগারের সার্থকতা।

নি:সন্দেহে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমের ব্লগ সাইট একটি অসাধারণ ও আধুনিক সংযোজন। এখানে একজন লেখক যা খুশি তা-ই লিখতে পারেন না। রয়েছে সেন্সর বোর্ড। তারা আপনাকে বিবেচনাধীন রাখতে পারেন বছরের পর বছর। অথচ এটা না করে ব্লগটিম একটি নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে আপনার অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারেন। এ ধরণের সৌজন্যবোধ এখন পর্যন্ত ব্লগটিম দেখাতে পারেনি।

বিডি ব্লগের সবচে’ উজ্জ্বল অংশ (ব্যক্তিগত বিবেচনায়) মন্তব্য বক্সটি। লেখককে লেখক হয়ে উঠতে এর মত নার্সিং সেন্টার আর হয় না। এ ধরনের আইডিয়ার জন্য ব্লগ কর্তৃপক্ষ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। এখানে লেখক লেখকের বন্ধু- সমালোচক। বানান ভুল সংশোধন থেকে শুরু করে, বাক্যের গঠণ বিন্যাস, ভাষা রীতি, তথ্য- উপাত্তের সম্মিলন ঘটিয়ে একটি পোস্ট তৈরির যাবতীয় কলাকৌশল হাতে-কলমে শিখিয়ে দেয়া হয় অথবা শেখানোর প্রচেষ্টা চলে। যারা নবীন তাদের ভুল-ত্রুটিগুলো উপেক্ষা করা হয়, প্রশংসাসূচক উৎসাহ দেয়া হয়। অর্থাৎ নবীনকে যোগ্য করে তুলতে প্রবীণ যেন একটুও কার্পণ্য করেন না। বিপরীতে, যারা একটু পোক্ত-লেখক তাদের প্রতি তীর্যক বাণ, আলপিন দিয়ে পশ্চাৎদেশে খোঁচা মারা, যুক্তি-তর্কের মারপ্যাঁচ দিয়ে নাকানি-চুবানি ইত্যাদি পুরষ্কার হিসেবে মন্দ নয়। এ সব ছাড়া আবার তাদের লেখাটিও যেন ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে না। এই যে বৈরী ও বন্ধুসুলভ আচরণ বিডিব্লগের অলঙ্কার।

’সিটিজেন জার্নালিজম’ বা ’নাগরিক সাংবাদিকতা’ – এ বিষয়ে আমার কোন ধারণা ছিল না। যে কেউ সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিতে পারেন যদি তার সংবাদের উৎস, সংবাদ পরিবেশনের কৌশল ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা ও বেসিক যোগ্যতা থাকে। তা হলে আমজনতাও সাংবাদিক হতে পারেন! তাই তো দেখছি। এবং এই সফলতার ষোল ভাগ প্রশংসার দাবিদার বিডিব্লগ।

লেখা বা রচনা একটি শিল্প (art)। অন্যের সামনে পরিবেশনযোগ্য লেখা তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। অথচ এই কঠিন কাজটিও সিটিজেন জার্নালিস্টরা হেসে-খেলে করে যাচ্ছেন। তাহলে কি একটু সুযোগ বা স্পেস দিলে আমরাও পারি। আসলেই পারি। জয় হোক বিডি ব্লগের। জয় হোক ব্লগারের। নিরাপদ থাকুক ব্লগিং।