ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

প্রতি বছর ঈদের আগে এক চির চেনা খেলা নতুন করে শুরু হয় । গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছেন না । টাকা নাই । বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করান । বাহানা করে সরকারের কাছে ধার চাইতে থাকেন । শ্রমিকরা আন্দোলন করেন । কখনো কিছু পাওয়া যায় – হয় পুলিশের মার, নাহয় হুমকি-ধামকি, ভাগ্য খুব ভাল হলে বেতনের সামান্য অংশ, সবচেয়ে বড় পাওয়া ঈদের পরে চাকরি বহাল থাকার নিশ্চয়তা । শ্রমিক নেতারা বেশী কিছু পেয়ে ম্যানেজ হন । গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন কাঠামোর বিষয়টি এখনও অমিমাংসিত ।

নারী শ্রমিকদের অবস্থা অধিকতর শোচনীয় । পদে পদে নিগ্রহ আর বঞ্চনার স্বীকার হতে হয় । ন্যায্য পাওনা পেতে কখনো টাইম কিপার কিংবা সুপারভাইজারদের পাশবিক লালসা মেটানোর প্রয়োজন পড়ে । সূর্য ওঠার আগেই নোংরা অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান ( কিছুটা সম্মান করে মেস-বাড়ী বলা যেতে পারে ) ছেড়ে একযোগে পিঁপড়ের দলের মতো রাস্তার দু’ধার ধরে হাতে অ্যালুমিনিয়াম কিংবা প্লাস্টিকের খাবারের ছোট একটি ক্যারিয়ার ( যাতে দুপুরের জন্য যৎসামান্য খাবার ) নিয়ে শক্ত ও টেকসই প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পায়ে শত শত কিশোরী, যুবতী, মাঝখানে কিছু প্রৌঢ় নারী দের কর্মস্থলের দিকে ছুটে চলা ( বাসে চড়া যাদের জন্য অতি উচ্চ ঘরানার বিলাসিতা ) ঢাকা ও আশেপাশের চির পরিচিত দৃশ্য । সন্ধ্যা হতে রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত উল্টো পথ ধরে ঘরে ফেরা যেখানে খানিকটা ‘ কর্মবিরতি ’ জোটে। অবশ্য শিপমেন্টের আগের কয়েকটা দিন এই কর্মবিরতি পরিণত হয় ওভারটাইম নামক অত্যাচারে । কোন কারনে লোকসান হলে শ্রমিকদের বেতন ভাতা বন্ধ থাকে কিন্তু কখনও বেশী লাভ হলে সামান্য প্রণোদনা দেয়ার নজির কখনো দেখা যায়না । অবশ্য মালিকদের ভাষায় লাভ থাকে সামান্যই । শ্রমিকদের প্রতিবাদের মোকাবিলা করার জন্য আছে সরকারি মাস্তান-পুলিশ আর নিজেদের পোষা গুন্ডা বাহিনী । প্রচণ্ড ভাবে ঠেঙ্গিয়ে হাড়গোড় ভেঙ্গে দেয়ার পাশাপাশি বেশি বাড়াবাড়ি কারীদের জন্য আছে পরিকল্পিত / অপরিকল্পিত হত্যা বা গুম করে দেয়ার ব্যবস্থা । শ্রমিকদের উশৃংখলতার শাস্তি হবে কিন্তু মালিক শ্রেণীর অপকর্মের শাস্তির কোন বিধান রাখা যাবেনা । নিষ্ঠুর নির্লজ্জ শোষকের হাতে বঞ্চিত শোষিতের নিপীড়িত হবার একটি নগ্ন সত্য আমাদের এই তৈরি পোশাক শিল্প ।

বাংলাদেশের সবচাইতে বড় রপ্নানি আয়ের খাত এই তৈরি পোশাক শিল্প । জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে এই রপ্তানি আয়ের অবদান অনস্বীকার্য । জাতির সীমাহীন বেকারত্বের অভিশাপ অনেকাংশ লাঘব এই শিল্পের কল্যাণে । পুরুষ শাসিত সমাজে নিপীড়িত, অবহেলিত বিশেষ করে সুবিধা বঞ্চিত স্তরের নারীগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আজ স্বাবলম্বী ।

তবে কলঙ্ক মিশ্রিত এই অর্জন নিয়ে আমাদের আত্মতুষ্টিতে ভোগা নিজেদের অসচেতন সঙ্কীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ । ইউরো – ডলার এর মোহনীয় সুবাসে চাপা পড়ে যায় শ্রমিকের ঘামের স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ । বেকারত্ব দূরীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল প্রবাহে অবদান রাখার দোহাই দিয়ে গার্মেন্টস মালিকগন এমন ভাব করেন যেন দেশের সকল মানুষের অন্ন জোটে তাদের দয়ায় । একটা ব্যাপার তারা স্বীকার করবেন কিনা জানিনা গার্মেন্টস শিল্পের আয়ের শতকরা আশি ভাগ চলে যায় এই খাতের প্রয়োজনীয় আমদানি ( কাঁচামাল, যন্ত্রাদি আমদানি ) ব্যয় মেটাতে । নিট আয় থাকে বিশ শতাংশ । স্বল্পতম মূল্যে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ও নিখুঁত শ্রমের বাজার এই বাংলাদেশ । তাইতো নিয়মিত উৎপাদনকারী হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড ডেনিম, আরমানি, গুচি র পোশাকের পাশাপাশি বিশ্ব ক্রীড়া উৎসবে আডিডাস, নাইকি র জার্সি র একটা বড় অংশের চাহিদা মেটানোর কৃতিত্ব পাচ্ছে এই দেশ । গার্মেন্টস প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সহজলভ্য স্বল্পতম মুল্যের শ্রম বাজার হিসেবে সবচাইতে লোভনীয় এই বাংলাদেশ । এরচেয়ে সস্তায় আর কোন দেশ এত ভালো পোশাক দিতে পারেনা ।

দেশী বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নীতিকথার চাপে পড়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গুলোর শ্রম অধিকার, occupational health, শ্রম নিরাপত্তা নামক কয়েকটি প্যারামিটার এর লোক দেখানো বুলি আওড়ানোর প্রেক্ষিতে ঠেলায় পড়ে eye wash করার মত কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় মাঝে মধ্যে শ্রমিকদের কল্যাণে । শ্রম-আইন, শ্রম-নীতি, শ্রমিক-অধিকার যেখানে মে দিবসেই সীমাবদ্ধ সেখানে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবীমার প্রসঙ্গ ওঠানো নিতান্তই ঔদ্ধত্য প্রকাশের পর্যায়ে পড়ে ।

গার্মেন্টস শ্রমিকরা আরও বড় দায়িত্ব পেলেন । সরকারের বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতির কিছু অংশ তাদের মেটাতে হবে । রপ্তানি আয় এর উৎসে কর দ্বিগুণ করা হয়েছে বর্তমান বাজেটে । রপ্তানিকারক ও শিল্প মালিকগণ এ নিয়ে তাদের নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন / ফেডারেশনের ব্যানারে । তবে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যদি উৎসে বর্ধিত কর দেয়ার বিষয়টি বলবৎ থাকে, তাঁরা নিজেদের আয়ের অংশ থেকে সামান্যতম ছাড় দেবেন না । তাহলে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের বর্ধিত কর মেটানোর সহজতম বিকল্প ব্যবস্থার বলি হবেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা ( রপ্তানি খাতের বৃহত্তম আয়ের দায় যাদের মাথার ওপর) । হয়তো তাদের পারিশ্রমিকের অংশ থেকে যোগান দেয়ার সুকৌশলে একটা পন্থা বের করবেন নয়তো কম শ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে ঘাটতি মেটাবেন অথবা কর্ম-সময় বাড়াবেন ।

বিবেকবান জাতি হিসেবে আমরা চাইব না তাদের রক্ত আমাদের প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হউক ।