ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

গণতন্ত্রের মানস কন্যা অং সান সুচি নোবেল বক্তৃতা দিলেন ১৬ জুন, শনিবার নরওয়ের অসলো সিটি হলে । নোবেল জয়ীদের সহজাত মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনা । বক্তৃতাটি ১৯৯১ সালে দেয়ার কথা ছিল । সামরিক জান্তার হাতে গৃহবন্দী নেত্রী নিজ হাতে বিশ্বের সবচাইতে মূল্যবান পুরস্কার নেয়ার লোভ সামলালেন । তার পক্ষে পুরস্কার নিয়েছিলেন তাঁর স্বামী ও দুই পুত্র । বিশ্ববাসী বঞ্চিত হল গনতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রীর মুখ নিঃসৃত মূল্যবান বানী থেকে । ২১ বছর পর সুযোগ আসলো তাকে নতুন করে সম্মান জানানোর সেই সাথে দীর্ঘদিনের অতৃপ্তি ঘুচলো ।

দেশ, মুক্তিকামী জনতা, গন-অধিকার এক কথায় “ গনতন্ত্র ” তার কাছে সব কিছুর ঊর্ধ্বে । নোবেল শান্তি পুরস্কার নিজ হাতে নিলেন না । মৃত্যুপথ যাত্রী স্বামীকে দেখার আবেগ সামলালেন বুকে পাথর বেঁধে । দেশ মাতৃকার টান সামলাতে পারলেন না । নিজের প্রাণপ্রিয় পুত্রদ্বয় যেখানে আরো তুচ্ছ ।

সু চি ইউরোপ সফরে যাত্রা শুরু করেন ১৩ই জুন আর দাঙ্গা শুরু হয় ৮ই জুন । সহিংসতার মাত্রা তখনো উদ্বেগজনক। ততদিনে, সরকারি হিসাব মতে অন্তত ২০-২৫ জন রোহিঙ্গা নিহত আর কয়েকশো ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই । সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে । বিজিবি দ্বারা অনুপ্রবেশে বাধাগ্রস্ত হয়ে সীমান্তে আটকা পড়েছে অথবা নাফ নদী, বঙ্গোপসাগরে ভাসছে কয়েকশত রোহিঙ্গা যার মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু । জীবন হাতে নিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আত্মগোপন করে আছে কিংবা নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে জীবন বাচাতে ছুটোছুটি করছে মিয়ানমারেরই অন্য কোন রাজ্যে ।

অসলো সিটি হলে তাঁর মূল্যবান অনেক উক্তি ছিল যার কোনটাতেই মিয়ানমারের জাতিগত দাঙ্গা নিয়ে তাঁর উদ্বিগ্নতা খুব একটা প্রকাশ পায়নি । তবে সমস্যা সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন বোঝা যায় একটি উক্তিতে –
“ বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ আর ভোগান্তির আগুন জ্বলছে । আমার নিজ দেশে, উত্তরাঞ্চলে হানাহানি বন্ধ হয়নি আজ ও । আমার এখানে আসার যাত্রা শুরুর কয়েকদিন আগেও পশ্চিমের রাজ্য গুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হত্যা ও অগ্নিসংযোগ চলছিলো ” ।
সমসাময়িক, যথাযথ কিন্তু অতি সাধারণ এক উপলব্ধি । বিশ্বের যে কোন প্রান্তের একজন সচেতন মানুষ এ খবর জানেন । আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম গুলোতে প্রতিদিন ই কিছু না কিছু প্রকাশিত হচ্ছে ।

তিনি গনতন্ত্রের মানসকন্যা । মিয়ানমারের গনতন্ত্রায়নের আপোষহীন নেত্রী । ৫০ বছরের সামরিক শাসনের কলঙ্ক থেকে দেশটি আজ মুক্ত হতে চলেছে তার ই অকুতোভয়, দৃঢ়চেতা, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বে । মিয়ানমারের জনগনের কাছে তিনি পরম পূজনীয় । তাঁর একটি আহ্বান, অনুরোধ তারা তথা রাখাইন গোষ্ঠী সহজে উপেক্ষা করবে না বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই । যদিও ব্যাপারটা এতোটা সহজ নয় ( এই দাঙ্গার পেছনে আরো অনেক অদৃশ্য নিয়ামক কাজ করছে ) তার পরেও তিনি যদি একটি বার রাখাইন বৌদ্ধ সম্প্রদায় এর উদ্দেশ্যে এই হানাহানি বন্ধের ডাক দিতেন তারা তাঁর কথা আমলে না নিলেও বিশ্ব তাঁর মহান নেতৃত্বের একটি তাৎক্ষণিক নজির দেখতে পেত । তাঁর নোবেল বক্তৃতার মাধ্যমে জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর, ইউএস, তথা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে আহ্বান জানাতে পারতেন আপাতত দাঙ্গা থামানোর কার্যকর ব্যাবস্থা নিতে । মিয়ানমারের অবিসংবাদিত নেত্রী তা জানেন না সেটা ভাবা ভুল হবে । তিনি হয়তো রোহিঙ্গা মুসলিম দের রক্ষা করার পক্ষে কোন কথা বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিরাগভাজন হতে চান না । সামনে আসছে নির্বাচন, গনতন্ত্রের সুমিষ্ট ফল হাতছাড়া না হয় আবার ।