ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

‘‘ মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়লে জন্মহার ও বাড়বে ’’। বিজিএমই এর কথা। সুতরাং মাতৃত্বকালীন ছুটি ২৪ সপ্তাহ্ তো করা ঠিক হবেই না বরং বর্তমান শ্রম আইন অনুযায়ী ১৬ সপ্তাহ ও রাখা ঠিক হবে না।

মাতৃত্ব কালীন ছুটি বাড়লে অনেক বড় বিপদ। দক্ষ শ্রমিকের সংকট তৈরি হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। যেখানে মোট রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশই আসে এই শিল্প থেকে ( যদিও তার প্রায় ৮০ শতাংশ ই আবার চলে যায় পোশাক শিল্পের আমদানি ব্যয় মেটাতে ) ।

গার্মেন্টস মালিক দের কাছে এমনিই দেশবাসীর অনেক ঋণ। একথা তাঁরা অহরই মনে করিয়ে দেন যে কোন ছুতোয়। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন; বেকারত্ব লাঘব করছেন; পুরুষ শাসিত সমাজের সুবিধা বঞ্চিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত বিশাল নারী গোষ্ঠীর উল্লেখ যোগ্য অংশ আজ স্বাবলম্বী; বেকারত্ব কমে যাওয়ায় সমাজে অপরাধের মাত্রাও কমে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাঁদের সকল অবদান আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি। এই শিল্পের প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমরা মাঝে মাঝে যৎসামান্য (!) দায় মেটানোর চেষ্টা করি। একদিকে ন্যায্য-অন্যায্য সরকারী পৃষ্টপোষকতার আশীর্বাদপুষ্ট এই শিল্প। অন্যদিকে আমাদের শ্রমিক স্বল্পতম মজুরিতে শ্রম দেন ( যদিও গার্মেন্টস মালিকদের মতে তাঁদের বেতন প্রাপ্যের চেয়ে বেশি )। নির্ধারিত বেতম কাঠামো মানা হয় না সবগুলো প্রতিষ্ঠানে, যেখানে বোনাস আর প্রণোদনার প্রসঙ্গ তোলাটা স্পর্ধার পর্যায়ে পড়ে। লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে শ্রমিকের পাওনা বকেয়া রাখা এখন মালিকদের একটি অলিখিত গ্রহণযোগ্য অধিকার। নারী শ্রমিকেরা অনেক বেশি নিগ্রহ, বঞ্চনা আর বৈষম্যের শিকার। নিজেদের প্রাপ্য আদায় করতে তাঁকে অনেক সময় বেশি মুল্য দিতে হয়। তাঁর সম্ভ্রম টুকু অনেক ক্ষেত্রে শ্রম হিসেবে বিবেচিত হয় সুপারভাইজার অথবা টাইমকিপার এর পাশবিক লালসার কাছে। শ্রম আইন, শ্রমিকের অধিকার এখানে “ মে দিবস ” নামক একটি উপহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

সংসারের আয়ের সংস্থান করতেই কেটে যায় দিনের বারো থেকে ষোল ঘণ্টা। বাকী সময়টুকু শিশু পরিচর্যা, ঘর সামলানো, স্বামীর ভাল মন্দ (!) দেখাশোনার ফাঁকে নিজের বিশ্রামের কথা চিন্তা করাটা নিতান্তই বিলাসিতা।

শ্রমিক মায়ের পাশাপাশি মুল্য দেয় তাঁর শিশু। শ্রমজীবী মায়ের কর্ম ব্যস্ততায় অপরিহার্য মাতৃদুগ্ধের দিনভর বিকল্প হিসেবে তার ভাগ্যে জোটে দুর্মূল্যের বাজারের সামান্য চিনির পানি মাত্র।

মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্মগত অধিকার। শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধির জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই – এটি এখন শুধুমাত্র জ্ঞানের কথা নয়। সমাজের অশিক্ষিত মানুষ ও এখন তা বিশ্বাস করেন। জন্মের প্রথম ছয় মাস “ এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং ( exclusive breast feeding ) ” বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়ে পরে এক সময় লেখা যাবে। সচেতন মানুষদের তা আলাদা করে বিশ্বাস করানোর কোন প্রয়োজন পড়েনা। শিশুর যত্নের পাশাপাশি এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং নির্বিঘ্ন ও নিশ্চিত করতে কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্ব কালীন ছুটি ৬ মাস করার প্রস্তাব করে শ্রম আইন সংশোধন করার প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। পুঁজিপতিরা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিজিএমই এর নেতৃত্বে তাঁরা এর বিরুদ্ধে যুক্তি দেখাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ( ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, কোরিয়া ) অধিকতর স্বল্প দৈর্ঘ্যের মাতৃত্বকালীন ছুটির উদাহরণ দিয়ে যাচ্ছেন। তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করালে দেখা যাবে অপেক্ষাকৃত উন্নত সে সকল দেশে কর্মক্ষেত্রে দিবা যত্ন ( day care ) কেন্দ্র সুবিধা সহ অনেক বেশি নারী ও শিশুবান্ধব ব্যবস্থা থাকে যেখানে আমাদের দেশে হাতে গোনা কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে দেয়ালে শিশুর ছবি আর মেঝেতে কয়েকটি পুতুল রেখে লোক দেখানো একটি কক্ষ সাজানো হয় যেগুলো স্টোর রুম হিসেবেই প্রধানত ব্যবহৃত হয়। আর প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যায়ে শিশুসেবা দানকারী রাখার কোন প্রশ্ন ও আসে না। শ্রমিকের ঘামের দাম এত কম দিয়ে মালিকের লাভের পাল্লা এত ভারীও সেসব দেশে হয়না।

আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের মনোভাবে মনে হয় তাঁরা চাইছেন না কোন নারী শ্রমিক গর্ভধারণ করুক। কারণ সন্তান জন্ম দিতে গেলেই আসবে মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রসঙ্গ। তাঁদের সুবিধার জন্য একটি কাজ তাঁরা করতে পারেন। তাঁরা নিয়ম করতে পারেন চাকুরী করতে চাইলে বিবাহিত নারী শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক বন্ধ্যা হতে হবে যাতে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কোন ভাবে কেউ মা হতে না পারেন আর সে ক্ষেত্রে নিজেদের নির্বাচিত কিছু সরকারি বা বেসরকারি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে। চাইলে কর্তৃপক্ষ “ বন্ধ্যা করণ ” কাজটির দায়িত্ব নিতে পারেন সে ক্ষেত্রে। প্রয়োজনীয় ব্যায় সেই নারী শ্রমিকের বেতন থেকে কেটে নিলেই হবে। আর অবিবাহিতাদের এমন কিছু শর্তের বেড়াজালে ফেলে চাকুরী দেবেন যাতে চাকুরী হারানোর ভয়ে কেউ বিয়ের কথা চিন্তা না করে। চিন্তার কিছু নেই, তারপর ও শ্রমিক পাওয়া যাবে কারন বাংলাদেশ সস্তাতম শ্রমের বাজার নিয়ে গর্ব করে !

পুঁজি ব্যবহার করে নারীর সৌন্দর্য, ব্যবহার করে নারীর মেধা, ব্যবহার করে নারীর কর্মদক্ষতা। তার পর ও পুঁজির ক্ষুধা কমে না, পুঁজির প্রয়োজন মেটাতে নারী কি ক্রমে তার মাতৃত্বও বিসর্জন দেবে ???

চলতি অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণার পরপর গার্মেন্টস শিল্পে বিরাজমান অরাজকতা নিয়ে লেখা একটি পোস্ট-
রপ্তানি আয়ের উৎসে কর দ্বিগুণ- পরিশোধের দায় শ্রমিকদের না তো?