ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

ছবির নাম “ কোপা শামছু ”। ঢাকাইয়া এই ছবির ভিলেন শামছু। শামছু শুধুই কোপায়। প্রতিপক্ষ একটু তেরিবেরি করলেই “ কোপ দে রে ” বলে হুংকার দিয়ে নিজেই শুরু করে, এক কোপে কল্লা নামায় তো আর এক কোপে হাত। অবস্থা বুঝে ব্যাবস্থা। ছবির হিরো নীতিবান পুলিশ ইন্সপেক্টর আরমান। এই ইন্সপেক্টর আরমান এর হাতে ক্রস ফায়ারে ( সত্যি সত্যি ক্রস ফায়ার, অস্ত্র উদ্ধারে গুলি-পাল্টা-গুলি টাইপের না, এটা ছিল মদের কারখানা উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশের ডাইরেক্ট একশন ) মারা পড়ে শামছুর আদরের ছোট ভাই কালিয়া। শামছু ভাইয়ের রক্ত ছুঁয়ে কছম খেয়ে ইন্সপেক্টরের মা, বাবা, ছোট বোন কে কুপিয়ে ফিনিশ করে ফেলে। আর শামছুর প্রভাবশালী গড ফাদারের কুট চালে চাকরি হারিয়ে পথে পথে ঘুরতে থাকে আপোষহীন সাবেক পুলিশ অফিসার আরমান। নকল ইয়া লম্বা লম্বা চুল-দাড়ি সমেত কিম্ভূত চেহারায় একটু পরপর গগনবিদারী আর্তনাদ করে “ সময় হয়না ক্যান রে, সময় হয় না ক্যান ? ” ঘটনা এগিয়ে চলে যথানিয়মে… নায়ক-নায়িকা, গান ইত্যাদি……। অবশেষে সময় আসে, ধৈর্য ধরার ফল হাতেনাতে পাওয়া যায়। “ সময় হইছেরে ” বলে হুংকার দিয়ে মোক্ষম মতো “ কোপা শামছু ”কে টুকরো টুকরো করে বিশাল ডেকচিতে ভরে ডেকচির মুখে ঢাকনার উপর বসে পড়ে শুকরিয়া মোনাজাত ধরে চিৎকার করে বলে “ হে পরওয়ারদেগার আমিন ”। তারপর যথারীতি মিলনাত্মক সমাপ্তি।

আমরা এখন কোপা শামছু ’দের যুগে বাস করছি। এটা কোন বিষয় না। অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন ভালো, এটাই বড় কথা। আমাদের “ আইনশৃঙ্খলার মালিক ” স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যেহেতু বলেছেন তাহলে এর উপর কথা নাই। তবে এই ফিল্ম থেকে কি শিক্ষা পাওয়া গেল ? ধৈর্য ধরতে হবে। তবেই না সময় হওয়ার মতো সময় আসবে। হোক না ফিল্মের কথা, ঢালিউড ফিল্ম ও তো জীবনের প্রতিচ্ছবি। এই সহজ কথাটি বাংলার জনগণ বুঝতে চায়না। এরা সব বিষয়েই অস্থির। আমাদের মন্ত্রীগণ এই জন্য খুবই ত্যাক্ত বিরক্ত।

(ধৈর্য ছাড়া উপায় নাই)

এক পদ্মা সেতু নিয়েই তো পাবলিক তুলকালাম বাধিয়ে ফেলল। বিশ্ব ব্যাংক পেছাল, তো “ গেল গেল ” বলে হায় হায় করে উঠলো সবাই। বাংলার জনগণ জানেনা এরা পদ্মা সেতুকে ছাড়লেও সেতু এদের ছাড়বেনা। সরকার ঘোষণা দিলো নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু হবে। বিরোধী দল ট্রাম করলো তারা ক্ষমতায় গেলে দুইটা পদ্মা সেতু করবে। এর উপর ওভার ট্রাম পড়লো – চারটা সেতু বানানো কোন বিষয় না। আর কদিন গেলে শোনা যাবে, বাংলাদেশের সব নদীর উপর দিয়ে একটা করে “ পদ্মা সেতু ” হবে ইনশাল্লাহ !!! অসহিষ্ণু জাতি এইবার জানতে পারল পদ্মা সেতু একটা নয় এক গণ্ডা সেতু বানানো কোন ঘটনা না।

এক কালের বানিজ্য মন্ত্রী বলেন, কম খান । সংসদ উপনেতা বলেন, আমরা এক বেলা কম বাজার করব। উভয় ক্ষেত্রেই ধৈর্যের গুণ-গান। ধৈর্য ধরলে সব কিছু পানির দামে বিক্রি হবে আর পদ্মা সেতু হবে হাতের ময়লা। সেদিন ডিমঅলা চাচা বললেন, “ বাজান, কয়দিন আগে এক মন্ত্রী কইল কম খাইলে বলে খাওনের দাম কমব, অহন আরেকজনে কয় বাজার কম কইরা করতে, কুন দিন আরেকজন কইব থাল্ উত্তাইয়া থোঅন লাগবো ( থালা উপুড় করে রাখতে হবে )… তয় যদি ‘ জিনিস-হত্রের ’ দাম একটু কমে ”। মূর্খ ডিম বিক্রেতাকে কে বোঝাবে সবুরের মাহাত্ত্ব ?

সাবেক রেল মন্ত্রী কালো বিড়াল বস্তা থেকে টেনে বের করার ঘোষণা দিলেন। জনসাধারণ কটা টাকা দেখেই কালো বিড়াল বলে ফালাফালি শুরু শুরু করে দিল। এরা মন্ত্রী সাহেবকে রেলওয়ের কালো বিড়াল বের করতে দিল না। নিজের থলে থেকে বিড়াল অবমুক্ত হওয়ার মিথ্যা অপবাদ নিয়ে মন্ত্রী এখন খামাখা দপ্তর বিহীন। আর সাদা-কালো বিড়াল নিয়ে টিভিতে পাবলিকের অযথা হাউ কাউ শুনে বাসার বুয়া কুলসুমের মা খুবই চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বলে “ আমরার বাসার মতো ব্যাবাকতের বাসাতই কালা বিলাই এর ডিশটাব ? ”

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর ধৈর্য মোটামুটি শীর্ষ পর্যায়ে ( জ্ঞান পর্যায়ে সেটা কোন বিষয় না )। টিপাই মুখ ভারতের নিজস্ব বিষয়। সে দেশের উপর দিয়ে বহমান নদীর মালিক তারা। তারা বাঁধ দিয়ে নদীতে মাছ চাষ করুক, বিদ্যুৎ বানাক না হয় আস্ত নদী গায়েব করে দিক সেটা তাদের বিষয়।

শ্রমিক নেতা নৌ মন্ত্রী সাহেব, টলারেন্স দেখান যোগ্য নেতার মতোই। মানুষ চাপা দিয়ে সাফা করে দিচ্ছেন গাড়ি চালকরা। আর গরু ছাগলের ছবি চিনতে পারলেই মন্ত্রী তাদের হাতে স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিচ্ছেন। এরকম গরু-ছাগল চেনা এক চালককে একটি প্রতীক দেখিয়ে জিগ্যেস করা হল,
_ বলেন তো, এই ছবি দিয়ে কি বুঝানো হয়েছে ?
_ জি, ছেলে হোক মেয়ে হোক দুইটি সন্তানই যথেষ্ট।
_ কিভাবে বুঝলেন ?
_ ছবিতে দেহা যায়…মনে করেন… এই যে দুইটা বাইচ্ছা হাত ধইরা হাইট্টা যাইতেয়াছে।
_ মাশাল্লাহ, আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ ! তা সামনে স্কুল আছে এটা কিভাবে বুঝবেন ?
_ স্কুলের আশেপাশে আসলে দেহা যায়… মনে করেন… বাইচ্ছারা কান্দে ব্যাগ, বই-খাতা নিয়া দোড়াদুড়ি পাড়তাছে।
_ ভেরি গুড, তখন চলন্ত গাড়ির চালক হিসাবে আপনার কি করা উচিত ?
_ আমি আর কি করমু, যা করার হেরাই করবো। ফাল পাইড়া সইরা যাইব।
_ গতি কমিয়ে সাবধান হবেন না ? যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে ?
_ কিছু হইলে আল্লার হুকুমেই হইব। হায়াত না থাকলে কেউ গাড়ির নিচে পড়তেও পারে। আল্লা-ভরসা।
বাহ্ বাহ্ ! ইনি আমাদের সাবেক এক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দর্শনে বিশ্বাসী।

আমাদের অত্যন্ত ধৈর্যশীল বিদ্যুৎ মন্ত্রী ( তিনি কিন্তু আবার প্রধান মন্ত্রী ও ) অন্ধকারে নিমজ্জিত জনগণের দুর্দশা দেখে একটু অধৈর্য হলেন। জাতি কে তড়িৎ গতিতে আলোর দিশা দেখানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। আগেকার সরকারের দেশব্যাপি পোতা খাম্বায় যেখানে আন্ধারে মানুষ বাড়ী খায় সেখানে “ কি তামশা, সব ফকফকা ! ”-র আশীর্বাদ হয়ে এলো কুইক রেন্টালের তেলেসমাতি। তবে অকৃতজ্ঞ দেশবাসীকে তিনি হাড়ে হাড়ে চেনেন। মহাবজ্জাত এরা তাঁর এই অবদান নিয়ে জল ঘোলা করতে পারে তাই ইনডেমনিটি দিয়ে তিনি এদের হাঙ্কিপাঙ্কির পথ রুদ্ধ করে দিলেন। তবে বিদ্যুৎ সেক্টর ছাড়া আর সব বিষয়েই তিনি ধৈর্য নিয়ে ধীরে এগোচ্ছেন।

বাংলার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরা যুগে যুগে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। একজন ঘোষণা দিয়ে মাটির তলে ঢুকে কয়েকদিন সন্ত্রাসী খোঁজার পর তৃপ্তির হাসি হাসলেন, সেখানে সন্ত্রাসীতো দুরের কথা কাকপক্ষীর কোন অস্তিত্ব নাই। তিনি মাটির তলায় ফাঁদ পেতে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলেন কবে মাটির উপরের সন্ত্রাসী তলায় নেমে ফাঁদে পা দেবে। একজন ছিলেন অদৃষ্টবাদী, তিনি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতেন কবে আল্লাহপাক তাঁর একেকটা মালকে নিজের জিম্মায় নিয়ে নিবেন। আরেকজন বাংরেজ মন্ত্রী “ উই আর লুকিং ফর শত্রুজ ” বলে “ রং নাম্বার-সেইম সাইড ” মিশনে উদ্ধার হওয়া একে-৪৭ হাতে নিয়ে গর্বের হাসি সহকারে পোজ দিয়ে ছবি তুলে ধৈর্য ধরলেন অস্ত্র যেহেতু ধরা পড়লো, অস্ত্রধারীরা ও ধরা পড়বে। কান টানলে মাথা আসে।

ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এই জাতির অধৈর্য আচরণে খুবই নাখোশ। এইতো সেদিন তিনি বললেন “ বিগত সাড়ে তিন বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার কোন নজির নাই !.!.!.!.! আপনার ধৈর্য ধরুন ”। ধৈর্য ধরে দেখা যাচ্ছে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ডিবি’র কাছ থেকে আর আমিনবাজার-বড়দেশি গ্রামের ছয় কিশোর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সিআইডি’র হাত থেকে র‍্যাবের দায়িত্বে দেয়ার আদেশ দিলেন মহামান্য হাইকোর্ট। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে ডিবি আর সিআইডি কে মন্ত্রী গণ্য করেন কিনা জানা যায়নি। তবে মন্ত্রীর কথা মতো আমাদের এই বাহিনীগুলো অবশ্যই ব্যর্থ নয় যখন — ( নিচের এই অংশটি নিতান্তই এক গল্প, গুরুত্ব না দেয়ার অনুরোধ করছি )

“ একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। অপরাধী পাকড়াও করতে কারা সবচাইতে পারদর্শী। আমেরিকা, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, চীন, ভারত সহ বড় বড় দেশের আইন প্রয়োগকারী বাহিনী হাজির। রহস্যময় হত্যাকাণ্ড সহ জটিল জটিল ঘটনার হোতা সনাক্ত করা, দুর্ধর্ষ দেশী ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ধরার স্বীকৃতি সম্পন্ন হাই প্রোফাইল একেকটা দল। বাংলাদেশ ও আছে।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে ঘোষনা দেয়া হল, এই বনে একটি খরগোশ আছে, খুঁজে বের করতে হবে। সময় বেঁধে দেয়া হল। সবাই জঙ্গলে ঢুকে পড়েছেন। একদিকে বাসস্থান, খাদ্যাভ্যাস, চলাচল, আত্মরক্ষার কৌশলসহ খরগোশদের জীবনধারণ প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে খরগোশটিকে খোঁজা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দল ও পিছিয়ে নেই। এগোচ্ছেন ভিন্ন কায়দায়। যেদিক দিয়ে যাচ্ছেন খবর করে দিচ্ছেন। বন তোলপাড়, গাছ উপড়ে একাকার, এমনকি কোথাও কোথাও আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এদিকে সময় শেষ হয়ে আসছে। সারাটা জঙ্গল চষে কোন দল খরগোশের দেখা পেলো না। সব দল হতাশ। আবার কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করছেন, এই জঙ্গলে আদৌ কোন খরগোশ ছিলনা। কিন্তু দেখা গেল সবার আগে বেরিয়ে আসছে টিম বাংলাদেশ, মস্ত এক ভাল্লুক কে তুমুল পেটাতে পেটাতে নিয়ে আসছেন, আর ভাল্লুক বলছে…….ok..ok, আমিই খরগোশ, আমিই খরগোশ………. ”