ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমরা গণতন্ত্রমনা জাতি। গনতন্ত্র সমুন্নত রাখতে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল পরবর্তীতে এসে অপরিহার্যতা উপলব্ধি করে তাকে সাংবিধানিক বাধ্যতায় রূপ দেয়া হয়। সারা বিশ্ব জানলো, পরস্পর অবাধ্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো, আমাদের মধ্যে বিস্তর অবিশ্বাস আর অনাস্থা। রাজনৈতিক এই সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই নেতৃত্ব খুঁজে নিতে আমাদের এক তৃতীয়পক্ষ অভিভাবক দরকার। ১৯৯০ সালে এসে স্বাধীনতার ২০ বছর পর হলেও আমরা নিজেরা নিজেরা সভ্য হওয়ার চেষ্টা করছি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে এবং পরবর্তীতে টিকিয়ে রাখতে আমাদের কয়েকটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল যে গুলো আসলে পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না, ছিল সময়ের প্রয়োজনেঃ

১) ১৯৯০ সালে রাজনৈতিক দল গুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল।
২) ১৯৯১ সালে একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানকে উপ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে সাংবিধানিক বৈধতা দেয়া হয়।
৩) ১৯৯৬ সালে ক্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গৃহীত হয়।

ধাপে ধাপে এই বিবর্তনকে আসলে “ গণতন্ত্র চর্চা ” না বলে “ গণতন্ত্র পোষা ” র চেষ্টা বলা ভালো। তত্ত্বাবধায়ক নামক অভিভাবকের চোখ রাঙ্গানির ভয়ে বাধ্য হয়ে শুধুমাত্র ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার এই চেষ্টা এক প্রকার গায়ের জোরে গণতন্ত্র জিইয়ে রাখার শামিল। তবে মন্দের ভালো এই ব্যবস্থা লজ্জা- বিপন্নতার ধাপ পেরিয়ে কি বিলুপ্তির পথে ?

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই এক প্রকার বিলুপ্তপ্রায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায় ছিল অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখল কিংবা বৈধ-অবৈধ উপায়ে হস্তগত ক্ষমতা যেকোনো উপায়ে আঁকড়ে থাকা যার প্রেক্ষিতে জন্ম নেয় অবিশ্বাস-অনাস্থা। এই প্রতিকূলতা জয়ের হাতিয়ার হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এক ‘অব্যর্থ দাওয়াই’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তত্ত্বাবধায়ক ব্যাবস্থায় কয়েকটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় জনগণ আরও নিশ্চিত হল গণতন্ত্র চর্চায় আমরা গণতন্ত্র বিবর্জিত দেশগুলোর জন্য আবারো ব্যতিক্রমী এবং অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম। আমরা গর্ব ভরে সারা বিশ্বকে ইংগিতে বোঝাতে লাগলাম, দেখ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কত রাস্তা আছে। সাধারণ বুদ্ধির মানুষ আমরা নিশ্চিত ছিলাম আর যাই হোক স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতায় টিকে থাকার দিন শেষ।

সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলগুলোর ক্ষমতা আঁকড়ে পড়ে থাকার নির্লজ্জ মানসিকতায় আহত হই আমরা। সহজ ভাবে পেছন ফিরে দেখা যায়, স্বৈরাচার অব্যবহিত পরবর্তী ১৯৯১ সালের ‘তত্ত্বাবধায়ক’ অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবার প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে চরম অনাস্থার জন্ম দেয় যার ফলশ্রুতিতে তাদের তখনকার মিত্র জামায়ত পর্যন্ত আওয়ামীলীগের সাথে তাদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে মাঠে নামে। ক্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক ভিত্তি সমেত ভোটাধিকার পুষিয়ে রাখার আপাত উপায় বের হয়।

সাংবিধানিক ব্যবস্থারও যে কত দুর্বলতা থাকতে পারে তার এক নজির দেখাল ২০০১ সালে আবার নির্বাচিত বিএনপি সরকার। প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ( কাগজে কলমে দ্বিতীয় দফায় ) নাকে খত দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক রূপ দেয়ার বাহবা নিজেদের ঝুলিতে নেয়ার পাশাপাশি বৈধ-অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা আঁকড়ে পড়ে থাকার এক মহানির্লজ্জ খেলা শুরু করে তারা। প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশন নিয়ে একের পর বেহায়া কীর্তি চলতে থাকে। পরিণতি সবার জানা। আর এখন সংবিধানের প্রশ্রয়ে নির্লজ্জতাকে বৈধতা দিতেই সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের আগেই তড়িঘড়ি করে পঞ্চদশ সংশোধনীর আয়োজন করলো বর্তমান সরকার।

কোন রকম বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়েনা, একটুখানি সহজ পর্যবেক্ষণেই দেখা যায়, ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের সবগুলো কিন্তু ছিল ‘ বিপক্ষে ’ ভোট দেয়ার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস, আর স্বৈরাচারী আচরণে অতিষ্ঠ দেশবাসী বিএনপির বিরুদ্ধে অর্থাৎ আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়ে অনেক আশা নিয়ে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। এই প্রযুক্তির পুনরাবৃত্তি হতে থাকে ২০০১ আর ২০০৮ এর নির্বাচন গুলোতে। “ আওয়ামীলীগ- বিএনপি- আওয়ামীলীগ ” এক ভয়ংকর দুষ্টচক্রে আবর্তিত হতে থাকে বাংলাদেশের নিয়তি। প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক প্রতারণার স্বীকার জাতির সামনে এখন বড় উদ্বেগ “ কার বিরুদ্ধে কাকে ভোট দেয়া যায় ”।

মুক্তমনা এই জাতি উদারতা, প্রশ্বস্ততায় বিশ্বাসী। স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগের বিপক্ষ দ্বিতীয় রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি’র উত্থান হতে সময় লেগেছে মাত্র ৭ বছর ( বিতর্কিত, অগণতান্ত্রিক উপায়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের নিয়ে জন্ম হলেও, জনসমর্থনের বিচারে আওয়ামীলীগএর সাথে ব্যবধান মাত্র ২-৩ শতাংশ )। যেখানে ভারতে কংগ্রেসের পর দ্বিতীয় শক্তি বিজেপি’র জন্ম হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৪০ বছর। তার মানে দাঁড়ায় আপাত শ্রেয়তর বিকল্প পন্থার স্বীকৃতি দিতে এদেশের মানুষ কার্পণ্য করেনা। কিন্তু বারবার ভোট দিয়ে ঘুরেফিরে দুটি দলকে “ স্বৈরাচার ” সরকার প্রতিষ্ঠা করার সমর্থন দিতে দিতে ক্লান্ত নাগরিক আজ আর বিকল্প কোন ত্রাতা খুঁজে পাচ্ছেনা।

আমাদের ভোটাধিকার চর্চিত হয়েছে হয় স্বৈরতন্ত্রের অধীনে না হয় তত্ত্বাবধায়কের কর্তৃত্ব ছায়ায়। গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে সত্যিকার ‘ভোটচর্চা’ করার সফলতা স্বাধীনতার ৪০ আমরা দেখাতে পারি না। আর বর্তমান সরকার এই ‘কলঙ্ক’ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে কতগুলো কলঙ্কের জন্ম দেয় সেটাই এখন বড় আতঙ্ক। মনে প্রাণে সকল স্তরের নাগরিকদের সত্য-সরল উপলব্ধি, আমরা এখনও নিরপেক্ষ অভিভাবকহীন নির্বাচন আয়োজনে পরিপক্ক এবং যোগ্য হয়ে উঠতে পারিনি।

আমাদের গণতন্ত্র পোষার চলমানত্বের দোহাই দিয়ে আমরা এর সাফল্য-ব্যর্থতা ’র চূড়ান্ত হিসাব আপাতত নাই কষলাম। তবে আমাদের এই বহুমুখী চর্চার একটি প্রাপ্তি হল আমরা গণতান্ত্রিক ভাবে স্বাধীনতা বিরোধীদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করি, তাদের গাড়ীটা স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা শোভিত করে দেই। জাতির জনকের কন্যা স্বাধীনতাবিরোধীদের সর্বাধিনায়ককে জাতির পিতার ভাই ( চাচা ) সম্বোধন করে ১৯৯১ সালে তার কদমবুসি করে নিজের মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর জন্য ভোট ভিক্ষা করে চেয়েছিলেন। সেটা তো এই গণতন্ত্রেরই দোহাই !! এবার তর্কের খাতিরে আরেকটি নিরপেক্ষ ভোটের সম্ভাবনা ধরে নিলে, বিরুদ্ধ-ভোটের অতীত সংস্কৃতির পরিণতিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের নামে আবার রাজাকারমন্ত্রী জাতীয় পতাকা শোভিত গাড়িতে করে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবেন ফুল দিতে……………………..।

পরিণতিতে দেখা গেল, আমাদের গণতন্ত্রের সাকুল্য অর্জন শুধুমাত্র ভোটাধিকার, যাও এখন হুমকির মুখে। আবার এই ভোটাধিকার চর্চার ( অপচর্চা বলা ভালো) প্রাপ্তি যদি কিছু থেকে থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি মুল্য আমরা ইতিমধ্যে দিয়ে ফেলেছি কিছু রাজাকার- আলবদর ’দের জনপ্রতিনিধি- মন্ত্রী বানিয়ে।

একটু ভাবতে বসি, অতীতে গণতন্ত্র অপচর্চার প্রাপ্তি এই যে ‘লজ্জা’, তা প্রশমিত করতে বর্তমানে বিপন্নপ্রায় গণতন্ত্রের সদ্ব্যবহার করে আমাদের মহান কিছু কিভাবে, কতটুকু অর্জন করা সম্ভব। তবে বর্তমান-বিপন্ন গণতন্ত্রকে ভবিষ্যৎ-বিলুপ্তি থেকে রক্ষার উদ্যোগটাই হয়তো আগে নিতে হবে।