ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

ব্যস্ত সময়ের ফাঁক গলে ক্ষণিকের অবসর যখন মেলে যায়, মন জুড়ে বহু দিনের হাহাকার তখন তুঙ্গে উঠে নতুন কোন বইয়ের গন্ধ নেবার। টু বি অনেস্ট, চোখ তখন চেনা কোন লেখকই খোঁজে বেড়ায়। “সাদাত হোসাইন”কে তেমন করে চেনা ছিলনা। কিন্তু বইয়ের মলাটে “আরশিনগর” শব্দটি আমাকে বাধ্য করে পাতা উল্টাবার। লেখক, আমাকে হতাশ করেনি। এতোটা শক্ত, অথচ কত সহজ করে বলে চলছে বইয়ের প্রতিটি চরিত্রের কথা, সংগ্রাম। চরিত্রগুলো খুব সাধারণ একেকজন, অথচ তাদের জীবনবোধ, দর্শন তাদের করে তোলে হাজারের মাঝে একজন।

ভূমিকাতে লেখক এর নিজস্ব চিন্তার আকর্ষণকে অস্বীকার করতে পারিনি…. “অারশিনগর” এর দ্বারা অনুভব করি এক শক্ত লেখকের উপস্থিতি।

“…..প্রতিটি মানুষের মনের ভেতর অজস্র জগত থাকে, সেই প্রতিটি জগতের নিয়ন্তা সে নিজে। সেখানে তার অবাধ স্বাধীনতা, অসীম শক্তি, অপার অনুভূতি। “আরশিনগর” আমার বুকের ভেতরের তেমনি একটি জগতের ‘কেরছা’। যেই জগতের নিয়ন্তা আমি নিজেই। অপার ক্ষমতা শুধুই আমার! কিন্তু আসলেই কি তাই!! আসলেই কি একজন লেখক হয়ে উঠতে পারেন তার গল্পের মহা্পরাক্রমশালী নিয়ন্ত্রক! আসলেই কি তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে, গল্পগুলোকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করার পরিপূর্ণ ক্ষমতা তার থাকে? নাকি কখনো কখনো কিছু চরিত্র, কিছু ঘটনা হয়ে ওঠে স্বাধীন। নিয়ন্ত্রণহীন। অবাধ্য। সদম্ভে চলে যায় লেখকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। হয়ে ওঠে স্বাধীন এক সত্তা। আমার কিন্তু তাই মনে হয়।”

ম্যাচিউরড শব্দটি এই লেখকের কলমের বেলায় খাটেই। কোন কঠিন শব্দের খেলা নয়…অথচ দৃশ্যগুলো খুব স্পষ্ট চোখের সামনে। সাধারণের মধ্যে অসাধারণত্ব। যদিও ড্রামাটিক কিছু মুভমেন্ট আছে যেটা অবশ্য দরকারও। ওদিক ঘাঁটবনা। কারণ, গল্পই হচ্ছে ড্রামা।

“আরশি মাথা তুলে তাকাল। ভোলানাথের বন্ধ সেলুনের সামনে কাঁঠের খুটি। সেই খুটির গায়ে হাতের তালুর সমান ছোট্ট এক চিলতে আয়না। ঝাপসা হয়ে যাওয়া সেই আয়নার দিকে তাকিয়ে খানিক স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আরশি। তারপর ধীর পায়ে আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার ভেতরে আবছা একটা মানুষ। গতকাল অবধি দেখে আসা সেই একই চোখ, সেই একই নাক, সেই একই মুখ, একই চেহারা। কিন্তু গতকালের সেই আরশি আর এই মানুষটি কি এক? এই মানুষটাকে কি সে চেনে? আরশির হঠাৎ মনে হল, এই জগতে কেউ কাউকে চেনে না। এই জগত আয়নার মতন। উল্টোজগত। এখানে সবকিছু উল্টো।
এই উল্টোজগতের নাম আসলে আরশিনগর।”

গল্প “আরশি”কে ঘিরেই চলছে… হয়তবা তাই মনে হয়, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে প্রতিটি চরিত্র তার নিজ নিজ গল্পে স্বকীয়। সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে নিলুফা বানুর মৃত্যু, আর এরপর পুরোটাই পাল্টে যায় চেনা জানা সেই মজিবর। মানসিকভাবে ভেঙে পরা মজিবরের আবেগ যেন কোথাও হারিয়ে যায়…ছোট্ট শিশুটি আগলে থাকে শুধুই আম্বরি বেগমের মায়ার ছায়ায়। মজিবরের ভেতরে কতটা ভালবাসা ছিল নিলুফা বানুর জন্যে তার ছোট্ট একটা দৃশ্য…

“এই নির্জন তারাভরা রাতে, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মজিবর মিয়া কাঁদল। তার বুকের ভেতরে কবুতরের পালকের ওমের মতোন স্পর্শ লেগে থাকা সেই অনুভূতিটুকুর জন্য কাঁদল।…কেউ দেখল না, কেউ শুনল না। কিন্তু যিনি এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেছেন তিনি জানেন, এই কান্না জগতের শুদ্ধতম কান্না।”

একাত্তরের সব পরিবার যখন বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে যায় শুকরঞ্জন ডাক্তার ছাড়তে পারেন নি দেশের মায়া…

“বাপের দেশের মাটি, দপদপাইয় হাঁটি।”

এই ছিল তার অনুভূতি। এই চরিত্রটিকে যেমন কাহিনির শুরুতে পাই ঠিক তেমনি কাহিনির শেষেও থাকে এর এক বিশেষ ভূমিকা। ডাক্তার শুকরঞ্জন ও তার স্ত্রী সুজাতা রানী সংসারে কি ভাবে ভান করে চলতে হয় তার এক নিপুন পাঠ দিয়ে যান। তাদের ছেলে আশিষ ও তার জীবনের বোধটাও এক অন্যরকম গল্প। কোন এক অজানা অভিমানে চলতে থাকা আশিষ ও তার জীবনের ঝড়ে আক্রান্ত হয় পাঠকও।

মজিবর মিয়ার উন্নতি তাকে নিয়ে ফেলে ভীষন এক চোরবালিতে…আমরা যাকে বলি “ভিলেজ পলিটিকস্”। যেখানে “লতু হায়দার” এক বিষাক্ত সাপ। কাহিনীর প্রয়োজনে চলে আসে ইমাম হোসেন,তার স্ত্রী কামরুন্নাহার, ছেলে যায়েদ, আতাহার তালুকদার ও তার ছেলের বউ রুবিনা, আরশির সৎমা লাইলি, এককালীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা যশোদা স্যার, লোকামান গ্রুপ, গালকাটা বশিরের গ্রুপ যারা এখন চরমপন্থী কম্যিউনিস্ট এর বিচ্ছিন্ন দল। এক কালে যাদের স্বপ্ন ছিল সুস্থ উন্নত জাতি ও দেশ গড়বার, তাদেরই নীতি এখন হত্যার, অরাযকতার। যযাতিপুরের রঙ্গমঞ্চ পাঠককে ধরে রাখে প্রচন্ড এক আকর্ষণে।

লেখককে একসময় মনে হয়…অ্যাগনস্টিক আবার তার লেখায় স্পিরিচুয়্যালিজম এর এতোটা ছোঁয়া!! আসলে এক ঐশ্বরিক শক্তির খেলার বিবরণ এই “আরশিনগর”। অসীম সত্তার সাথে সীমাবদ্ধ এই মানবজীবনের সম্পর্ক নিয়ে কখনো কখনো ছোঁড়া প্রশ্নগুলো বড্ড ভাবিয়ে তোলে।

“মৃত্যুর পর এই জগতের কোনো কিছুরই কি আর কোনো মূ্ল্য থাকে না? সবকিছুই কি ঢেকে যায় শ্রেফ শূণ্যতায়? যদি তাই হবে, তাহলে এই রাতজাগা তীব্র কষ্ট, এই দিনমান বয়ে বেড়ানো সুদীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস, এই মায়া এই এত এত মমতা, এদের মূ্ল্য কী?”

“আসলে জগতে বিচ্ছিন্ন ভুল বা শুদ্ধ বলতে কি কিছু আছে? না কি সকল কিছু আগে থেকেই নির্ধারিত? পুরো জীবনের এই যে গল্প, এই যে সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না এ সবই কি পূর্বনির্ধারিত! আমরা কি কেবল পূর্বনির্ধারিত সেই হাসি কান্না সুখ দুঃখের সাজানো পান্ডুলিপিতে অভিনয় করে যাই!”

“…তালুকদার সাব, আল্লাহপাক মানুষের ভালো কাজের প্রতিদান দেন।”

“অারশিনগর” এর ব্যাপ্তি বিশাল, প্রতিটি চরিত্রের গল্পই এক দীর্ঘ আখ্যান। একে পড়তে হয় জানতে হয়, নিজের মত করে….অনুভব করতে হয় একান্তই নিজের মত করে।

ভালো লাগা কিছু কথাগুলো….

এই জগতে মানুষের জন্ম, বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকা সবই মরে যাওয়ার জন্য। মানুষ আসলে মৃত্যুর প্রয়োজনে জন্মায়, বেঁচে থাকে।

“সময় অপেক্ষায় থাকে সময়ের এই ভীষণ অাঁচড়ের দাগ নিয়ে। কোন একদিন তা নিভৃত রাতের কান্না হবে। হাসি হবে। সুখ-দু:খ হবে। মানব জীবন কি অদ্ভুত খেয়ালে বাঁধা থাকে সময়ের অমিত অাঁচড়ে।”

গ্রামের একজন অশিক্ষিত মহিলা আম্বরি বেগম, অথচ জীবনবোধ থেকে নেয়া শিক্ষার কি প্রচন্ড সত্যবাণী…যা শিখিয়ে যান শেষবেলায় আরশিকে…

“কাইল কী হইব, সেইটা যদি মানুষ আইজ জানত, তাইলে মানুষ বাঁচতে পারত না। এইটা একটা সুবিধা।…..মানুষের জীবনে এই জন্যেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হইল সময়। আর এই সময়ের খারাপ-ভালো বইলা কিছু নাই। হয় সবই খারাপ, না হয় সবই ভালো।…..সময়ের খারাপ-ভালো কিছু নাই। সময়টাই আসল। যেই সময়টা চইলা যায়, সেই সময়টা আর ফিরা আসে না। কোন চেষ্টায়ই না। সেইটা ভালো হোউক আর মন্দ হোউক।”

জীবনের এক সত্য কঠিন পাঠ রেখে যায় আরশির জন্যে শেষবেলায়….

“জীবন এবং অভিজ্ঞতা এমন এক জিনিষ, যা মানুষকে বয়সের অনেক আগেই বড় করে ফেলে। আবার এই অভিজ্ঞতাই শরীরে যথেষ্ট বেড়ে ওঠার পরও মানুষকে বয়সের চেয়ে অনেক ছোট করে রাখে। “

“জীবন। সে যতটা শেখায়, আর কে পারে তার মতো শেখাতে?”

“জগৎ জুড়ে কী অপার ভালোবাসা ছড়ানো ছিটানো। তার কতটুকুইবা নিতে পারি আমরা! আমরা খুঁজে খুঁজে কেবল ঘৃণা আর দুঃখ নেই। ভালোবাসারা পরে থাকে আড়ালে-আবডালে। “

“মানুষ যতক্ষণ না অবধি অন্য মানুষকে বুঝে উঠতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ কাউকে ছুঁয়ে দিতে পারে না। মানুষ বেশিরভাগ সময়ই মোহগ্রস্থতাকে ছুঁয়ে যাওয়া ভেবে ভুল করে।”

“জগতের রীতি এক অদ্ভুত চক্র। এই চক্র চলতেই থাকে। …কেবল মানুষগুলো ভিন্ন। এই চক্রের চালক হচ্ছে সময়। সময় তোমাকে বীজ করবে, চারা করবে, গাছ করবে, বিশাল ছায়াদায়ী বটবৃক্ষ করবে। তারপর ধীরে ধীরে বিস্তৃত শেকড় জুড়ে ঘুণপোকা ধরবে। …..তারপর একসময় মৃত্যু। এই গল্প চলতেই থাকে। অসীম মহাকালের গল্প।”

“মনে হচ্ছে একটা মানব জনমে কিছু মানুষের জন্য রয়েছে অনেকগুলো জগৎ। সেই অনেকগুলো জগতের মধ্যে একটামাত্র জগৎ সত্যি, আর বাদবাকি জগৎগুলো সব মিথ্যে, সব বিভ্রম, সব মায়া।”

“জীবন রোজ খানিকটা করে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর মতন। আমরা তাতে শুধু শরীরটাই দেখতে পাই। বুকের ভেতরটা না। অথচ আমাদের দেখার কথা ছিল চোখে। সে দুটোই দেখে, শরীর ও মন।”

জীবনটাকে “যাপন” করে পার করবার মধ্যেই থাকে সার্থকতা। আমরা প্রায়ই “জীবন”কে অস্বীকার করে বসি। ব্যর্থতার গ্লানি ঠিক তখনই জুড়ে বসে। জীবনের সাথে “সখ্যতা” গড়ে তোলা এক চমৎকার গুণ। একে অর্জন করতে হয় “জীবন”এর হাত ধরেই।
শেষ করছি বইয়ের শেষের কিছু লাইন দিয়েই…আর অনুরোধ থাকবে “আরশিনগর”কে নিজের মত করে ঘেঁটে দেখবার জন্যে। আর তার সাথে অনেক ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা রইল লেখকের প্রতি…..

“কী উল্টো নিয়ম এই জগতের! সে জানে তাকে এই হাঁটা শেষে ঠিক ঠিক ফিরে আসতে হবে পেছনের ওই জায়গাটুকুতেই। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও ওই জায়গাটুকুই শুধু শেষ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকে। অপেক্ষায় থাকে একটা মানবজীবনের সবটা সময় জুড়ে। তবুও মানুষ কত কত অপেক্ষায় নির্ঘুম রাত কাটায়। কত কত অপেক্ষার তৃষ্ণায় দিন কাটায়। কী অদ্ভুত এই মানবজনম। কী অদ্ভুত! এ যেন আয়নার মত এক উল্টো জগৎ। এই উল্টো জগতের নাম আসলে আরশিনগর!”