ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

আমি আমার জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই, যারা হতাশ তাদের জন্য। তরুন/তরুনী, কিশোর/কিশোরী ভাই, বোনদের জন্য। এমন না যে আমি অনেক বড় একজন ব্যক্তি। নাহ্। তবে হ্যাঁ, আমি আজকে যা, হয়তবা তাও হওয়াটা আমার দ্বারা সম্ভব হতোনা। যা হয়েছে, এখন তা একান্তই আমার শ্রমের কারনে। এই কথাগুলো শেয়ার করছি, এইভেবে যে, হয়তবা আমার মত অনেকেই এমনটা জীবনে ফেস করেছেন, অথবা করছেন। আর এক্ষেত্রে আমার এই শেয়ার করা কথাগুলো যদি তাদের কিছুটা হলেও উপকারে আসে তো সার্থক হবো। কখনো কখনো অন্য কারোর দু:খ, বেদনা বা সুখ শেয়ার করার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে নাহ্। আমি একা নই।

১.
ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড ফাঁকিবাজ ধরনের ছিলাম। পড়াশোনাটাকে কখনোই আপন করে নিতে পারিনি। তবে প্রচুর আউটসাইটের বই পড়তাম। বই পড়ার নেশা ব্যপক ছিল। যা পরবর্তীতে আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবার ক্ষেত্রে ব্যপক ভূমিকা রাখে। পরীক্ষার রেজাল্ট ভাল হতোনা। যার দরুন কোন প্রশংসার পাবার তো প্রশ্নই উঠতনা। “আর তুমি ভাল করতে পারো” এমন কথাটা না আসত কোন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কাছ থেকে আর না পরিবারের কাছ থেকে। কাজেই দেখা গেল আমার সেলফ কনফিডেন্স ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে। যা একটা শিশুর জন্য কোন অবস্থাতেই ভাল ফল রাখতে পারেনা।

আর পারিবারিক ভাবে এদিকটাতে কোন সহায়তাও পাওয়া যায়নি। বেশির ভাগ মা-বাবারা যে ভুলটা করেন, সেই একই ভুল আমার ক্ষেত্রেও হয়। দোষ এখানে তাদেরকেও দেয়া যায়না। কারন সংসার কোন সহজ জায়াগা নয়। পুরো নজর না দেয়া উপরন্তু আবার খারাপ রেজাল্টের জন্য পানিশমেন্ট। দিন দিন তা অবনতির দিকে ধাবিত করা ছাড়া আর কিছুই করেনি। আমার ভিতরে থাকত,শুধু ভয় আর ভয়। আর এসময়ে কারো সাথে কিছু শেয়ারও করতে পারতামনা। উল্লেখ, এমন সময়ে শিশুটি কিন্তু অসৎ সঙ্গের সাথে অবলীলায় জড়িয়ে পরে। আর তখন এই অসৎ সঙ্গ এড়ানো টা সহজ হয় শুধুমাত্র একজন সত্যিকারের বন্ধু পাশে থাকার কারনে। আর তা হচ্ছে আমার বই। কাজেই আজ স্বীকার করতে একটুও কষ্ট হয়না, যে, আমি আমার জীবনে অনেক বড় কিছুকে ছেড়ে দিতে পারব, এই বইযের জন্য । কেননা, একটা নি:সঙ্গ শিশু, কিশোরীর যখন খুব কাছের কারোর সঙ্গ দরকার ছিল তখন কেউই তার পাশে ছিলনা। শুধুমাত্র এই বই ব্যতিত। যার দরুন কোন খারাপ সঙ্গও আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

২.
এভাবে চলতে চলতে এক সময় গিয়ে একটা চরম ধাক্কা খাই। এসএসসি র সামনে। দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ বিষয়ের সর্ম্পকেই আমার কোন ধারনাই নেই । বিশেষ করে অংকে। উল্লেখ্য, আমার অংক স্যার আমার আর কোন উপকার নাই হোক, এই উপকারটা করছিলেন, অংক সম্পর্কে চিরতরে একটা ভীতি আমার ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া। যা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি তা পেরিয়ে বের হয়ে আসা, আমার পক্ষে।

আমার বড় আপু তখন হটাৎ করেই আবিস্কার করেন, আমার এই ভয়ংকর অবস্থার। প্রশ্ন বিজ্ঞানের না সমাজের এটাতেই আমার কনফিউশেন!! বড় আপুর ধাক্কাতে, লেগে গেলাম নিজেকে ফেল করার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য…অবশেষে তিন মাস পড়ার পর একটা রেজাল্ট আসল। যা আমার নিজের কাছেও আশাতীত ছিলনা। আর আমার পরিবার তো আমি পাশ করলেই তারা খুশী । আর এখানেই শুরু হলো আমার টার্নিং পয়েন্ট। এই সাকসেস, এই প্রশংসাটুকু আমার দরকার ছিল নিজের আত্মবিশ্বাসটাকে ফিরিয়ে আনতে। অতএব, বুঝতেই পারছেন, আত্মবিশ্বাস চলে গেলে, একটা মানুষ কিভাবে ডুবে যেতে পারে!! শুরু হলো আমার কলেজ জীবন, যেখানে সাপ্তাহিক পরীক্ষাগুলোতে ফার্ষ্ট হবার দরুন, কোচিং এ প্রায় বেশির ভাগ সময়ই আমি ফ্রিতে পড়েছি। ধীরে ধীরে কনফিডেন্স বাড়তে থাকে.. আর আমিও নিজেকে প্রকাশ করা শুরু করতে থাকি। চাপা আর নার্ভাস স্বভাবের কারনে, কারোর সামনে কথা বলতে পারতামনা। সমবয়সীদের কাছ থেকেও লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেই আমিই এখন একজন সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। মন থেকে একটা কথাকে আত্মস্থ করতে পারলামযে, যা তোমার দূর্বলতা তাই তোমার চরম শক্তি। নিজের দূর্বলতাটাকে নিয়ে হীনমন্যতাতে ভোগা চরম বোকামীর পরিচয়। নিজের দূর্বল পয়েন্টকে নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী পয়েন্ট হিসাবে ভাবতে হবে। আর সবসময়ে পজিটিভ চিন্তা করতে হবে।

৩.
আমি আমার জীবনে ক্লাস ৯ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই পড়ে শেষ করি। এক সিরিয়ালে পড়া শুরু করতে থাকি। গর্ভধারিনী, উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ, শরৎসমগ্র, ইস্পাত, মা, ওয়ার এন্ড পিস… আরোও অনেক কিছু, যা আমাকে ভিন্ন ভাবে ভাবতে অনেক সাহায্য করে।

অতএব, কিশোর, কিশোরী ভাইবোনদের আমার অনুরোধ রইল, বইকে আপন করে নেবার জন্য। এটা যে কি করতে পারে, কতটা আপন হতে পারে, তা একবার এর কাছে না গিয়ে.. বোঝার কোন উপায় নেই।